ভুয়া নির্বাচন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শেষ পর্যন্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। নির্বাচন কেমন হয়েছে? ঠিক এই প্রশ্নটিই নির্বাচনের দিন নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদারকে করেছিলেন গণমাধ্যমের কর্মীরা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘কেমন ভোট হচ্ছে, এটা আপনারা ভালোভাবেই জানেন। আপনারা নিজেদেরই প্রশ্ন করুন। তাহলেই বুঝতে পারবেন, কেমন ভোট হচ্ছে। তা ছাড়া এখানে নির্বাচনের দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাদেরও জিজ্ঞেস করুন।’ এ দিয়ে আন্দাজ করা যায়, নির্বাচনটা প্রকৃতপক্ষে কেমন হয়েছে। নির্বাচনে সহিংসতা হয়েছে। অন্তত ১৭ ব্যক্তি নিহত হওয়াসহ হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সেটাও একটি নির্বাচনকে বোঝার মানদণ্ড। এবারের নির্বাচন নিশ্চয়ই গতবারের নির্বাচনের চেয়ে আলাদা ছিল। এবারের নির্বাচনে সবগুলো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। তারা আশা করেছিলেন, ভোটের মাঠে ন্যূনতম একটা পরিবশে থাকবে যেখানে জনগণ তাদের রায় দেওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেটি হয়নি। ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা, নিরাপত্তার নামে নজিরবিহীন ভয়ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও ন্যাক্কারজনক ভূমিকা, বাম জোটের একাধিক প্রার্থীসহ বিরোধীদলগুলোর প্রার্থী ও এজেন্টদের আটক, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দেওয়ায় মতো ঘটনা ঘটেছে। নিবাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও, সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কে জয়লাভ করবে সে ফলাফল আগেই নির্ধারিত ও অবধারিত হয়ে থাকে। এবারের নির্বাচনে সুদক্ষ ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ মাধ্যমে আগেভাগেই ‘নৌকার’ নিশ্চিত বিজয়ের আয়োজন করে রাখা হয়েছিল। ভোটের আগেই ভোটযুদ্ধের ফলাফল স্থির করে রাখা হয়েছিল। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে বলা হয়েছে, ফল অনুসারে দেশব্যাপী ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮৭টিতেই মহাজোট জয়ী হয়। বিরোধী পক্ষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পায় ছয়টি আসন। জাতীয় পার্টি পেয়েছে ২২টি আসন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে তিনটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত আছে। সেখানে এগিয়ে আছেন ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী উকিল আবদুস সাত্তার। এ ছাড়া গাইবান্ধা-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে আগামী ২৭ জানুয়ারি ভোটের দিন ঠিক করা হয়েছে। ভোটগ্রহণের পর পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, নির্বাচনের নামে যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণভাবে একটি ‘ভুয়া নির্বাচন’। যাদেরকে এভাবে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করার আয়োজন করা হয়েছে তারা নিজেদেরকে কোনোমতেই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি বলে দাবি করতে পারে না। জনগণ তাদেরকে ‘ভুয়া প্রতিনিধি’ বলেই বিবেচনা করবে। ‘ভুয়া প্রতিনিধি’দের নিয়ে গঠিত সংসদও ‘জনপ্রতিনিধিদের সংসদে’র মর্যাদা দাবি করতে পারবে না। সেটিকে জনগণ ‘ভুয়া সংসদ’ হিসেবেই গণ্য করবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ন্যূনতম ভিত্তিকে এর দ্বারা বলি দেওয়া হবে। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা তৃপ্ত। সারা দিন আপনাদের মাধ্যমেই, টেলিভিশনের মাধ্যমে নির্বাচনের অবস্থা দেখেছি। ব্যাপকভাবে অনিয়ম হয়েছে এমন কিছু আমরা পাইনি। তবে আমরা যেখানে অনিয়ম পেয়েছি, সেখানে নির্বাচনই বন্ধ করে দিয়েছি। দেশি-বিদেশি কোনো গণমাধ্যমে অনিয়ম দেখতে পাইনি।’ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের দাবি, মানুষ উন্নয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দিয়েছে। জামাত, যুদ্ধাপরাধীর যে অপশক্তি, তাদের হাত গুঁড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে এই নির্বাচন এ দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত সৃষ্টি করেছে। ফলে এর থেকে উত্তোরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। ক্ষমতাসীনরা এবারের নির্বাচনে গণমানুষকে যেভাবে চরম অবমাননা করেছে, তার প্রতিকারের পথ জনগণই রচনা করে নিবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..