নীলিমা ইব্রাহিম : এক অনন্য দেশপ্রেমিক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সিক্তা কর : নীলিমা ইব্রাহিম বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তিনি অনন্য হয়ে উঠেছেন ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ নামক স্মৃতিচারণমূলক অমর গ্রন্থ নির্মাণের জন্য। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বুক ফুলিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন দেশের আস্বাদ নিতে পারলেও নির্যাতিত বীরমাতাদের ঠাঁই হয়নি রক্ষণশীল সমাজে। যুদ্ধের সময় শারীরিক অত্যাচার আর যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে মানসিক অত্যাচার নিয়ে লড়াই করে যেতে হয়েছে তাদের। যুদ্ধপরবর্তী সেই সময়ে বীরমাতাদের পুনর্বাসনে শক্ত হাতে এগিয়ে আসেন সমাজসেবী নীলিমা ইব্রাহিম। নারী পুনর্বাসন বোর্ডের সদস্য হিসাবে বিভিন্ন নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে ঘুরে বেরিয়েছেন। বেঁচে থাকার উৎসাহ দিতে কথা বলেছেন নির্যাতিত নারীদের সঙ্গে। সেই নির্যাতনের ইতিহাসের সংকলন ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। বইটির ভূমিকাতে অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম লিখেছিলেন- ‘চরিত্রগুলি ও তাঁদের মন-মানসিকতা, নিপীড়ন, নির্যাতন সবই বস্তুনিষ্ঠ’। ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’- এমন একটা প্রামান্য গ্রন্থ যেটা একাধারে কয়েক পৃষ্ঠার বেশি পড়া কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের পাঠকের পক্ষে সম্ভব নয়। মাত্র সাতজন নারীর আত্মবচন আর ১৬০ পৃষ্ঠার ছোট্ট এই বইটিতে রয়েছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামধারী খুনিদের বর্বর নির্যাতনের ইতিহাস। যুদ্ধ পরবর্তী দেশ নির্মাণে ব্রতী নীলিমা ইব্রাহিমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নির্মিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান গড়ার কাজেও তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। জন্ম: মহিয়সী এই নারী ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রফুল্লকুমার রায় চৌধুরী এবং মাতা কুসুমকুমারী দেবী। পূর্বে তাঁর নাম ছিল নীলিমা রায় চৌধুরী। বিয়ের পর তিনি নীলিমা ইব্রাহিম নামটি গ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন: দারুণ মেধাবী এই নারীর শিক্ষাজীবন ছিল গৌরবময়। ১৯৩৫ সালে তিনি খুলনা করোনেশন গার্লস্ স্কুল হতে প্রথম বিভাগে মেট্রিক এবং ১৯৩৭ সালে কলকাতার বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং পরে অর্থনীতিতে অনার্স সম্পন্ন করেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে বি.টি. সম্পন্ন করেন। ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. সম্পন্ন করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম ‘বিহারীলাল মিত্র গবেষণা’ বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নীলিমা ইব্রাহিম ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের পাঁচ কন্যা সন্তান রয়েছে, এরা হলেন খুকু, ডলি, পলি, বাবলি ও ইতি। ১৯৫৯ সালে তিনি সম্মানসূচক পিএইচডি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটক’। কর্মজীবন: কর্মজীবনের শুরুতে নীলিমা ইব্রাহিম কলকাতার লরেটো হাউসে লেকচারার (১৯৪৩-৪৪) হিসেবে চাকরি করেন। তারপর দুই বছর (১৯৪৪-৪৫) তিনি ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনের লেকচারার ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে যোগদান করেন এবং ১৯৭২ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। তিনি বাংলা বিভাগের প্রধান (১৯৭১-৭৫), বাংলা একাডেমীর অবৈতনিক মহাপরিচালক (১৯৭৪-৭৫) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ (১৯৭১-৭৭)-এর দায়িত্বও পালন করেন। মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও উদার মানবিকতার অধিকারী নীলিমা ইব্রাহিম আমৃত্যু মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্র নেতৃবৃন্দকে সংগঠিত করার কাজে নীলিমা ইব্রাহিমের অবদান সর্বজনবিদিত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ক্যাম্পাসেই ছিলেন, প্রত্যক্ষ করেছিলেন নরঘাতক পাকিস্তানী সেনাদের তা-ব। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ, প্রচারপত্র বিলিসহ ছাত্র-ছাত্রীদের সংঘবদ্ধ করে মুক্তিসংগ্রামে প্রেরণের জন্য কাজ করে গেছেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি বিএলএফের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। অর্থ ও উপকরণ সংগ্রহ, প্রচারপত্র বিলি, তরুণ-তরুণীদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ইত্যাদির সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য তাকে ডেকে নিয়ে সতর্ক করেন এবং সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খান তাকে দোষারোপ করে কঠোর ভাষায় সতর্কপত্র দেন। সতর্কপত্রটি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বিজয়ের দু’দিন পর ১৮ ডিসেম্বর সকালে মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশাদের উদ্ধারের কথা বলে মিরপুর বদ্ধভূমিতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো পাকিস্তানিদের দোসররা। শুধু বেঁচে যান আত্মীয় ড. মুজিবুল হকের কারণে। সমাজ সংস্কারক নীলিমা ইব্রাহিম বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজকল্যাণ ও নারী উন্নয়ন সংস্থা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলা একাডেমীর ফেলো এবং বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি, বাংলাদেশ রেডক্রস সমিতি ও বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভানেত্রী এবং কনসার্নড উইমেন ফর ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারপারসন হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্যকর্ম: মহিয়সী নীলিমা ইবাহিম বিচরণ করেছেন সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়। যেমন- গবেষণা: শরৎ প্রতিভা (১৯৬০), বাংলার কবি মধুসূদন (১৯৬১), উনবিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালী সমাজ ও বাংলা নাটক (১৯৬৪); নাটক- উৎস ও ধারা (১৯৭২), বেগম রোকেয়া (১৯৭৪), বাঙ্গালী মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৮৭), সাহিত্য সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ (১৯৯১)। ছোটগল্প: রমনা পার্কে (১৯৬৪) উপন্যাস: বিশ শতকের মেয়ে (১৯৫৮), এক পথ দুই বাঁক (১৯৫৮), কেয়াবন সঞ্চারিণী (১৯৬২), বহ্নিবলয় (১৯৮৫)। নাটক: দুয়ে দুয়ে চার (১৯৬৪), যে অরণ্যে আলো নেই (১৯৭৪), রোদ জ্বলা বিকাল (১৯৭৪) কথানাট্য: আমি বীরঙ্গনা বলছি (২ খণ্ড, ১৯৯৬-৯৭) অনুবাদ: এলিনর রুজভেল্ট (১৯৪৫), কথাশিল্পী জেম্স ফেনিমোর কুপার (১৯৬৮) ভ্রমণকাহিনী: বস্টনের পথে (১৯৮৯), শাহী এলাকার পথে পথে (১৯৬৩) আত্মজীবনী: বিন্দু বিসর্গ (১৯৯১) স্বীকৃতি ও সম্মাননা: কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু পদক ও পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে-বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৯), একুশে পদক (২০০০), স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) (২০১১) অন্যতম। মৃত্যু: নীলিমা ইব্রাহিম ২০০২ সালের ১৮ জুন ঢাকায় নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। এই মহিয়সী নারীকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..