যেন অহর্নিশ থাকে একুশের চেতনা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
‘বায়ান্নতে মুখের ভাষা কিনছি বুকের খুনে রে/ বরকতেরা রক্ত দিল, বিশ্ব অবাক শোনে রে।’ হ্যাঁ। কবি এতটুকুও মিথ্যে বলেননি। বাঙালি বুকের রক্ত দিয়েই মুখের ভাষা কিনেছে। আর এই দাম দিয়ে কেনা ভাষার গল্প শুনে বিশ্ব সত্যি অবাক হয়েছে। আর যে কারণেই বিশ্ববাসী ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যদা দিয়েছে। তবে অপ্রিয় হলেও এ-ও সত্যি, যে জাতি মুখের ভাষার জন্য রাজপথ রঞ্জিত করেছে, সেই জাতিই কিনা রক্তদানের ৬৫ বছর পরেও শুদ্ধভাবে মায়ের ভাষাকে পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে পারেনি। এমনকি সেই চেষ্টাও করেনি। অনেক শিক্ষিত বাঙালি আজো শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষা লিখতে ও পড়তে পারে না। এ নিয়ে তাদের কোনো লজ্জাবোধ নেই। বরং ইংরেজি ভাষা বা অন্যান্য ভাষার কয়েকটি স্তবক জেনে ফেলার কারণে তারা এক ধরনের আত্মশ্লাঘায়ও ভোগে। আর বাংলা ভাষার মতো একটি বিজ্ঞানসম্মত ভাষাকে জটিল, কুটিল বলে অবজ্ঞা করে থাকে। স্বাধীনতার এত বছর পরও বাংলাদেশের কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত একটি ভাষানীতি জাতিকে উপহার দিতে পারেনি। আমরা কখনোই ‘একুশের চেতনা’র তাৎপর্য নিয়ে ভাষার গুরুত্ব অনুধাবনের চেষ্টা করি না। আমরা সচেতন ও অবচেতন দুইভাবেই প্রতিনিয়ত আমাদের মাতৃভাষার ব্যবহারের বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছি। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিভূমি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ক্ষতিসাধন করে চলেছি। জাতীয় ভাষা বাংলা আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়ের ভিত্তিমূল। বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি রচনায় মাতৃভাষা বাংলার অবদানের স্বীকৃতি রয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতিতে। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতিতে আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষার অবস্থান কী, কিংবা জাতীয় পর্যায়ে আমাদের ভাষানীতি কী হবে, সে সম্পর্কে তেমন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি অর্থনৈতিকভাবে সামর্থবান মা-বাবা তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানে যতটা আগ্রহী, বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাদানে ততটা আগ্রহী নয়। অবশ্য বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এটা দোষের কিছু নয়। তবে রবীন্দ্রনাথের সেই কথা আমাদের মানতেই হবে ‘সবার আগে চাই মাতৃৃভাষার গাঁথুনি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে সেই গাঁথুনিটি না হওয়ার কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিপথগামী হচ্ছে। এর কুপ্রভাব আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা গালভরা অহংকার করি। কিন্তু বুক টান করে শির উন্নত করতে পারি না। আমাদের হীনমন্যতাই আমাদের তা করতে দেয় না। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, দামি দামি শপিংমলগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়- নেমপ্লেট, সাইনবোর্ডগুলোতে বাংলা ভাষার নামগন্ধও নেই। দেশীয় পুঁজিপতিরা বিদেশ থেকে আগত অতিথিদের তুষ্ট করার জন্য ইংরেজি, চাইনিজসহ নানা ভাষায় নেমপ্লেট, সাইনবোর্ড করেছে। আর যেসব সাইনবোর্ড বাংলাতে আছে- সে সরকারি-বেসরকারি যাই হোক তাও ভুলে ভরা। যে ভাষা আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, সেই ভাষাকে উপেক্ষা করার শিক্ষা দেয়ার মধ্য দিয়েই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এ দেশে প্রথম বীজ বুনেছে সামাজিক প্রকৌশলের। আমাদের নতুন প্রজন্ম এখন মেতে উঠেছে বিশ্বায়নের মাতাল হাওয়ায়, যে হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর অনুকূলে। আসুন সবাই মিলে নব প্রজন্মের এ উন্মাদনাকে সামাল দিই, নতুবা একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া আর খালি পায়ে প্রভাতফেরি করা আমাদের ভণ্ডামিরই নামান্তর হবে। প্রকৃতপক্ষে ভাষানীতির প্রশ্নে আমাদের অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারস্থ হতে হবে, কারণ তাঁর প্রজ্ঞাপ্রসূত উচ্চারণ-‘যদি অরণ্যে-রোদনও হয় তবু বলিতে হইবে যে, ইংরাজি ফলাইয়া কোনো ফল নাই, স্বভাষায় শিক্ষার মূলভিত্তি স্থাপন করিয়াই দেশের স্থায়ী উন্নতি; ইংরাজের কাছে আদর কুড়াইয়া কোনো ফল নাই, আপনাদের মনুষ্যত্বকে সচেতন করিয়া তোলাতেই যথার্থ গৌরব; অন্যের নিকট হইতে ফাঁকি দিয়া আদায় করিয়া কিছু পাওয়া যায় না, প্রাণপণ নিষ্ঠার সহিত ত্যাগ-স্বীকারেই প্রকৃত কার্যসিদ্ধি’।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..