চোরাচালানি বীজে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রাজশাহী সংবাদদাতা : রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধপথে আসছে ভারতীয় বীজ। মান যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় এসব বীজের সঙ্গে আসছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর আগাছা, ছত্রাকজনিত রোগবালাই এবং মিলিবাগ, প্লান্টহপারসহ নানা পোকামাকড়। অধিকাংশ বীজ অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় ফলনেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। এতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি। স্থানীয় কৃষি দপ্তর বলছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা আধুনিক উচ্চফলনশীল ফসল আবাদে ঝুঁকছে। এক দশকে বাণিজ্যিক চাষাবাদ বেড়েছে ব্যাপক। কিন্তু সে তুলনায় পর্যাপ্ত উচ্চফলনশীল বীজের জোগান নেই। চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ উচ্চফলনশীল বীজ সরবরাহ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। আর এ সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে অসাধু সিন্ডিকেট। সীমান্ত দিয়ে অবৈধপথে আসছে পাট, ভুট্টা, গম, ধান ও বিভিন্ন হাইব্রিড সবজি বীজ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর টমেটো চাষে প্রসিদ্ধ রাজশাহীর গোদাগাড়ীর চাষীরা ভেজাল বীজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ আদায় করিয়েও দেয়া হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের বোরো ধান বীজে প্রতারিত হয়েছে বরেন্দ্রের কৃষকরা, অধিকাংশ বীজের অঙ্কুরোদগমই হয়নি। আর এসব বীজের পুরোটাই চোরাই পথে এসেছে বলে দাবি করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। গোদাগাড়ীর কৃষকরা জানান, এবার প্রায় ১৫টি হাইব্রিড জাতের টমেটো চাষ করেছিলেন তারা। এর মধ্যে ‘ইউএস নাসিব’ বীজ কিনে প্রতারিত হয়েছেন কয়েক হাজার চাষি। ফলন বিপর্যয় হয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। মাঠ পরিদর্শনে কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তোফিকুর রহমান। তিনি বলেন, উপজেলা সদরের বন্ধু বীজভাণ্ডার ‘বন্ধু বীজ’ লেবেলে ১৫ জন ডিলারের মাধ্যমে এ বীজ বাজারজাত করে। এর আগে আমদানিকৃত এ জাতের বীজ বিক্রি করত কাশেম সিড। বন্ধু বীজভাণ্ডারের মালিক মাহবুব আলম ভেজাল ও নিম্নমানের বীজ ভারত থেকে এনে একই জাতের বলে চালিয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। পরে তিনি কিছু ক্ষতিপূরণও দিয়েছেন। তবে বোরো বীজ কিনে প্রতারিত হওয়া কৃষকরা ‘সাজ্জাদ-হাসান সিড’-এর কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। গোদাগাড়ীর এ প্রতিষ্ঠান ডিলারের মাধ্যমে তানোর ও গোদাগাড়ী এবং পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলায় ভারত থেকে আনা জিরাশাইল বোরো বীজ বিক্রি করে। ১০ কেজি বীজ ৬০০ টাকা করে কিনে কৃষকরা ঠকেছেন। অধিকাংশ বীজ অঙ্কুরিত হয়নি। এমন অভিযোগ আরো কয়েকটি বীজ কোম্পানির বিরুদ্ধে পাওয়া গেছে। এদিকে শুধু ফলন বিপর্যয়ই নয়, বীজের সঙ্গে আসছে ক্ষতিকর আগাছা ও রোগবালাই। তবে এ অঞ্চলের একমাত্র উদ্ভিদ সংগনিরোধ স্টেশন সোনামসজিদ স্থলবন্দরের উপপরিচালক সহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ সীমান্ত দিয়ে এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে দানা, ফল, মসলা, পশুখাদ্য ও সবজিসহ আরো কয়েকটি পণ্য। এর মধ্যে কোনো ধরনের বীজ নেই। আর এসব আমদানি পণ্যে অণুজীবের অস্তিত্বও মেলেনি। অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, এ অঞ্চলে বীজ আসছে চোরাই পথে। এতে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসছে উদ্ভিদের নতুন নতুন রোগ। অবৈধ উপায়ে আসা এসব বীজ পরীক্ষার আওতায় আনাও যাচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি মৌসুমেই কয়েক কোটি টাকার ভেজাল বীজ আসছে সীমান্ত পেরিয়ে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্তত ১০ জন ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করছেন এ সিন্ডিকেট। ভারতের খোলা বাজার থেকে কিনে এনে নানা নামে মোড়কজাত করে বিক্রি করছেন তারা। বিষয়টি স্বীকার করে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ এসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এরইমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত টমেটোচাষিদের ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিয়েছে কৃষি দপ্তর। এছাড়া অসাধু বীজ বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কঠোর নজরদারিও চলছে। এদিকে সম্প্রতি যশোর-মেহেরপুর অঞ্চলে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় গম নিরুৎসাহিত করছে সরকার। বরেন্দ্র অঞ্চলে এ রোগের দেখা না মিললেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ রাজশাহীর সীমান্ত এলাকায় গম চাষ নিষিদ্ধ করেছে বলে জানা গেছে। ছত্রাকজনিত রোগটি বাংলাদেশ থেকেই ছড়িয়েছে বলে তাদের দাবি। তবে কৃষিবিদ এসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গমে ব্লাস্ট রোগ ছড়ায় বীজ এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও। ভারত থেকে চোরাচালানে আনা বীজে এ রোগ ছড়িয়েছে এটি গবেষণা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, এ অঞ্চলে ‘পার্থেনিয়াম’ আগাছা পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও ছিল না। এর মূল উৎপত্তিস্থল মেক্সিকো। সেখান থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। বীজের মাধ্যমে আসা এ বিষাক্ত আগাছা ফসলের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। মানুষ ও প্রাণীর জন্যও এ আগাছা বিপজ্জনক। তিনি আরো বলেন, এক দশকের মধ্যে ভারত থেকে ক্ষতিকর পোকা ‘মিলিবাগ’ ও ‘প্লান্টহপার’ এসেছে বাংলাদেশে। মিলিবাগ আম, কাঁঠাল, পেঁপে ছাড়াও শোভাবর্ধনকারী গাছ এবং শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি করে। অন্যদিকে আমগাছ ও ধানগাছের মারাত্মক ক্ষতিকর ‘প্লান্টহপার’ অনেকটা ঘাসফড়িংয়ের মতো। এ পোকার আক্রমণে ফলন বিপর্যয় হয়। ফসল বাঁচাতে রোগাক্রান্ত বীজের অনুপ্রবেশ বন্ধ ও সীমান্তে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যক্রম আরো জোরদার এবং কৃষকদের বীজ শোধনের পরামর্শ দেন তিনি। একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..