হালকা হচ্ছে সুন্দরবন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : ব্যবহারে ব্যবহারে যেমন ছুরির ফলাও এক সময় ভোঁতা হয়ে আসে, মাটিতে হয় ক্ষয় ঠিক তেমনিভাবে ক্ষয় হচ্ছে সুন্দরবন। শুধু ব্যবহার নয়, মানুষের লোভ ও নির্মমতারও শিকার এই সুন্দরবন। সেই আদি থেকেই এই বন স্থানীয়দের কাছে প্রিয় বাদাবন দুই হাত উজাড় করে দিয়েছে মানুষকে। সুন্দরবন ও এর আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষও এই বনকে নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছে। এখানে অসাধারণদের কথা বলা হচ্ছে না, যারা কাঠসহ বনের বিভিন্ন সম্পদ আক্ষরিক অর্থেই চুরি করেছে, যারা দখল করেছে অন্যের জমি। এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে না, ভূমিখেকো রূপ যাদের আজন্ম ধাঁচ। এখানে সাধারণের কথা বলা হচ্ছে, যারা বনের ওপর নিজের জীবনের মতোই নির্ভরশীল। এখন অবশ্য এই সাধারণের সংখ্যা নিতান্ত কম। বরং রাষ্ট্রের উঁচুতলা থেকে একদম গোড়া অব্দি বন-ব্যবসায়ীর সংখ্যাই বেশি। তাই বন এখন আর জীবনের উৎস নয়, ব্যবসার কাঁচামাল উৎপাদনকারী। আর এই অতিব্যবহারে বনও ওই ছুরির মতোই ক্ষয়প্রাপ্ত আজ। আমরা বলছি হালকা হচ্ছে। হালকা হওয়া মানে বনের মূল যে গাছ, সেই গাছের মৃত্যুনামা। হালকা হচ্ছে মানে বন থেকে চলে যাচ্ছে পাখিরা। হালকা হচ্ছে মানে জীবনচক্রের এক সামষ্টিক ওলটপালট। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনের প্রধান সম্পদ সুন্দরীগাছ কমছে। গত ২৫ বছরে সুন্দরীগাছ যে পরিমাণ কমেছে, তা প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টরের সমান। গাছ কমতে থাকায় সুন্দরবনের ভেতরে ঘন বনের পরিমাণ গত ২৫ বছরে কমেছে ২৫ শতাংশ। ১৯৮৯ সালে সুন্দরীগাছ বনের ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪৫ হেক্টর জুড়ে ছিল। ২০১৪ সালে তা কমে গিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৯৫ হেক্টর হয়। সুন্দরীগাছের পর গেওয়াগাছও দিনে দিনে কমছে। ১৯৮৯ সালে বনের ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জুড়ে এই গাছ ছিল। ২০১৪ সালে তা প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৭৪ হাজার ১৭০ হেক্টরে নেমে আসে। গবেষণাটি করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধানে এবং ইউএসএইড ও জন ডি রকফেলার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এ গবেষণা হয়েছে। সুন্দরবন নিয়ে করা আন্তর্জাতিক এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এ এইচ এম রায়হান সরকার। গবেষণায় বনের ঘনত্ব ও গাছপালার পরিমাণ নির্ধারণে গবেষকেরা ১৯৮৯ সাল থেকে পাওয়া সুন্দরবনের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনে ঘন বনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে ৩৮ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এত দ্রুত গতিতে বনের ঘনত্ব কমার পেছনের কারণ হিসেবে গবেষকেরা ওই প্রতিবেদনে লেখেন, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, অবাধে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের চলাচল, গোলপাতা সংগ্রহসহ বিভিন্ন সম্পদ আহরণের কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামীতে এই ঘনত্ব আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কে না জানে এই আশঙ্কা কতটা জোরালো। কারণ সুন্দরবনের গুরুত্ব বুঝতে আমাদের সরকার ও প্রশাসন এখনো অপারগ। এক রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিয়েই বিষয়টি প্রকাশ হয় পড়েছে। শুধু রামপাল নয়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে যে বিরাট কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তাতে ওই অঞ্চলের জমির দাম বাড়ছে হু হু করে। আর এই মওকায় চুপ থাকবে কেন প্রভাবশালী ভূমিদস্যুর দল। তাদের তো আছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি। ফলে তারা ছুটে যাচ্ছেন সেখানে, সুন্দরবনকে উদোম করে তার জায়গা-জমি দখলে নিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে ভুল বাংলায় ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘এই জমির মালিক...’। এমনকি এই দখলবাজ নয়া ব্যবসায়ীর তালিকায় এক মন্ত্রীর নামও উঠে এসেছিল। উঠে এসেছিল সরকারি দল আওয়ামী লীগের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ নেতার নামও। জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে খবর প্রকাশ হলে পরে যদিও তারা তা অস্বীকার করেন কিংবা পাশ কাটিয়ে গেছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে তৎপর হতে শোনা যায় না। তেমনি তাদের নিয়ে ওই খবরটিও হারিয়ে যায়। অবশ্য খবরের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই কাউকে। কারণ বাংলাদেশের বাস্তবতাই এখন এমন যে, খবর হয়ে পড়ছে হারাধনের দশ ছেলের মতো। মরে-হেজে হারিয়ে যাওয়াটাই যার ভবিতব্য। যে খবর চিৎকারে অনেক কিছু কাঁপিয়ে দিতে পারত, তা হয়তো ছোট্ট একটি হাই তুলেই নেতিয়ে পড়ছে। আর এ কারণেই অবৈধভাবে সুন্দরবনের জমি দখলের কারণে ওইসব প্রভাবশালীর কোনো সংকটে পড়তে হয় না। আর এই সুযোগে ফাঁকা হতে থাকে সুন্দরবন। গবেষণায় উঠে এসেছে, ঘন বনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে হালকা বনের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ঘন বনের ক্ষেত্রে বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ এবং সূর্যের আলো বৃক্ষ আচ্ছাদন ভেদ করে মাটিতে তেমনভাবে আসতে পারে না। কোনো বনের বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এলে সেটি হালকা বনে রূপ নেয়। সুন্দরবনে এখন এই ঘন বনের পরিমাণই কমছে। অথচ এই ঘন বনভূমি ক্ষয় রোধের পাশাপাশি পশু-পাখিকেও নিরাপদে রাখে। এর কারণ হিসেবে বলছেন, চুরিসহ বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের প্রধান গাছ সুন্দরীগাছ কমছে। পাশাপাশি বনের লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ায় মিঠা পানির এই গাছের এলাকাও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমছে। এভাবে চলতে থাকলে সুন্দরবনের মূল বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য বদলে যাবে। আজ থেকে ২০ বছর আগে সুন্দরবনে চিংড়ি ঘের নিষিদ্ধ করা হলেও তা যে মানা হচ্ছে না তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। সুন্দরবন ঘিরেই চারদিকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য চিংড়ি ঘের। এর একটি অংশ আবার জবরদখল করা কিংবা বনের জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এইসব চিংড়ি ঘের একসঙ্গে দুই ধরনের ক্ষতি করছে। প্রথমত এটি সুন্দরবনের এলাকাকে সংকুচিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছে। অথচ আহরিত চিংড়ি পোনার উৎস ওই সুন্দরবন সংলগ্ন জলাধারই। ফলে বনে মানুষের আনাগোনা বেড়ে গিয়ে অন্য প্রাণীদের ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে এসব চিংড়ি ঘেরের কারণে বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। ফলে মিঠাপানির ওপর নির্ভরশীল প্রজাতিগুলোর এলাকা সীমিত হয়ে আসছে। গবেষকেরাই বলছেন, চিংড়ি ঘেরগুলোর কারণে সুন্দরবন-সংলগ্ন নদীতে লবণাক্ততা বাড়ছে। লবণাক্ততার কারণে নদীতে জলজ প্রাণীর পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এই অবস্থায় গবেষকেরা চিংড়ি ঘেরগুলোর জায়গায় ম্যানগ্রোভ করার পরামর্শ দিয়েছেন, যা সবুজ বেষ্টনী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সুন্দরবনের সম্পত্তিও রক্ষা করবে। এ ছাড়া সুন্দরবনের সীমানা থেকে বাইরের দিকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে যেকোনো ধরনের অবকাঠামোগত স্থাপনা, চিংড়ি ঘের প্রকল্প অনুমোদন না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়। আগেও একইভাবে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক, প্রকৃতি ও পরিবেশবিদ, সচেতন নাগরিকসহ বিভিন্ন মহল থেকে এই দাবিগুলোই উঠেছিল। গবেষকেরা যে কথা আজ পরামর্শ হিসেবে দিচ্ছেন, তা-ই কখনো দাবি, কখনো স্মারকলিপি হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা হয়নি। কমেনি কাঠচুরি, চিংড়ি ঘেরের বাস্তবতা। তবু হাল ছাড়েনি মানুষ। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সামনে হাজির করে তারা সতর্ক করছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..