বিপর্যস্ত জাফলংয়ের প্রাণ-প্রকৃতি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রকৃতি ডেস্ক : বল্লাঘাটের প্রবেশমুখেই গোয়াইঘাট উপজেলা প্রশাসনের টানানো সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে লেখা ‘প্রকৃতিকন্যা জাফলং’। কিন্তু সাইনবোর্ড পেরিয়ে ঘাট বেয়ে নামলে প্রকৃতিকন্যার রূপ নয়, চোখে পড়ে লোলুপতা। হাজার মানুষের কর্মযজ্ঞ। পাথর, বালি আর ট্রাকের ভিড়ে মুমূর্ষু পিয়াইন। এককালের স্বচ্ছতোয়া পিয়াইন আর ডাউকি এখন মরণফাঁদ। স্থানীয় সাংবাদিক মিনহাজ মির্জা জানান, পাথর কোয়ারি এলাকায় আগে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করা হতো। সে সময় পানিতে নেমে হাত দিয়ে পাথর উত্তোলন করতেন শ্রমিকরা। এতে জাফলংয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশে তেমন প্রভাব পড়ত না। কিন্তু কম সময়ে বেশি পাথর উত্তোলনের জন্য ২০০৬ সালে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করে। এতে যন্ত্রের বিকট শব্দ ও দূষণের মুখে পড়ে জাফলংয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ। যন্ত্র দিয়ে খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের কারণে পুরো জাফলং অঞ্চলেই সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে ২০১২ সালে পিয়াইন নদীসহ জাফলংয়ের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এ-সংক্রান্ত গেজেট হয়। গেজেটে বলা হয়, অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখানে পাথর উত্তোলন ও নানাবিধ কার্যকলাপের ফলে সিলেটের জাফলং-ডাউকি নদীর প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংকটাপন্ন, যা ভবিষ্যতে আরো সংকটাপন্ন হবে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আরো বলা হয়, ইসিএভুক্ত এলাকায় যান্ত্রিক বা ম্যানুয়াল কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে পাথরসহ অন্য যেকোনো খনিজ সম্পদ উত্তোলন নিষিদ্ধ। এরপর পেরিয়ে গেছে তিন বছর। কিন্তু এখনো কার্যকর হয়নি গেজেট। চলছে পাথর উত্তোলন, পরিবেশের ক্ষয় ও বিপর্যয়। পরিবেশবাদীরা বলছেন, ইসিএ কার্যকর না হওয়ায় জাফলংয়ে অবাধে পাথর উত্তোলন চলছে। পাথর সরে বড় গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। গর্তে চাপা পড়ে প্রায়ই ঘটছে হতাহতের ঘটনা। অনেক শ্রমিক ও পর্যটকের মৃত্যুর কারণ এসব গর্ত। পরিবেশ বিপর্যয় ও প্রাণহানির পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতেও। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জাফলংয়ে পাথর উত্তোলনে সব ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন উচ্চ আদালত। গত বছর সেপ্টেম্বরে জাফলংসহ সিলেটের কয়েকটি কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে এসব কিছুই মানছেন না পাথর ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাফলংয়ে বাঙালি, আদিবাসীসহ বিভিন্ন ধর্ম-সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। রয়েছে টিলা, বাগান ও বন। বাংলাদেশের বৃহত্তম সমতল চা বাগানও জাফলংয়ে। এসব কারণে জাফলং পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। কিন্তু ক্রমাগত পাথর উত্তোলন, স্টোন ক্রাশারের শব্দ, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পর্যটন আর্কষণ হারাতে বসেছে জাফলং। বল্লাঘাট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে জিরো পয়েন্ট এলাকায় এখনো পিয়াইনের সৌন্দর্যের কিছুটা টিকে রয়েছে। সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড়-টিলা, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, নদীর স্বচ্ছ ঠাণ্ডা পানির আকর্ষণে সেখানে যান পর্যটকরা। পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে আসা আসমা বেগম বলেন, বল্লাঘাটে নেমেই মন খারাপ হয়ে গেল। টিভিতে দেখা জাফলংয়ের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। এটা যেন ধ্বংসযজ্ঞ। অসংখ্য ট্রাক আর ধুলোবালি পেরিয়ে ঘাট থেকে এ জায়গাটুকু আসতে হলো। স্থানীয়রা জানান, গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর জাফলং জিরো পয়েন্টের কাছ থেকে কামাল শেখ ও ফয়সাল হোসেন সৌরভ নামে ১৮ বছর বয়সী দুই পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার হয়। পিয়াইনের স্রোতে তলিয়ে গিয়ে তাদের মৃত্যু হয়। এছাড়া সম্প্রতি জাফলং পাথর কোয়ারিতে পাথর উত্তোলনের সময় চাপা পড়ে নিহত হন চার শ্রমিক। এ ঘটনায় আহত হন আরো তিনজন। বেলার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার বলেন, এখন জাফলংয়ে যতজন পর্যটক মারা যাচ্ছেন আগে এত প্রাণহানি হতো না। শ্রমিকদের মৃত্যুর বিষয়টা যতটা সামনে আসছে, পর্যটকের মৃত্যুর বিষয়টা সেভাবে আসছে না। এভাবে চললে মানুষের মধ্যে ভীতি চলে আসবে। ইসিএ কার্যকরের মাধ্যমে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা গেলে পরিবেশ বিপর্যয় কিছুটা হয়তো কাটিয়ে ওঠা যেত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইসিএ কার্যকরে কাজ করে না, কিন্তু পাথর ব্যবসায়ীদের নিয়ে তাদের মাথাব্যথা আছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ইসিএ বাস্তবায়ন কমিটিতে আছে, কিন্তু তারা অভিযানে যাওয়ার বাইরে কিছুই করে না। এ ব্যাপারে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও জাফলংয়ের ইসিএ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ড. নাজমুনারা খানুম বলেন, আমরা গত মাসে জাফলংয়ের ইসিএর এলাকাভুক্ত ভূমি নির্ধারণ করে ওই এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিয়ে আসি। ডাউকি নদীতে অবৈধভাবে পাথর ব্যবসায়ীদের নির্মিত সেতুও অপসারণ করেছিলাম। কিন্তু সম্প্রতি পাথর ব্যবসায়ীরা আদালত থেকে এ নির্দেশনার ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছেন। আদালত কোনোরূপ যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া পাথর উত্তোলন অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা পাথর উত্তোলনের অনুমতি পেয়ে অবৈধ যন্ত্রের ব্যবহারও শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতা না পেলে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় লোকজনই ওই এলাকার পাহাড়-টিলা কেটে ফেলেছে। আমরা আর কী করে ঠেকাব? তবু আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..