জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমানোই যথেষ্ট নয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন এখন বিশ্বের সামনে বড় সত্য। আর এই সত্যকে স্বীকার করেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করার মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এ জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেওয়া বিভিন্ন দেশের সরকারি ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ভর্তুকি কমানোর মাধ্যমে ধনী দেশগুলোয় কিছু পরিবর্তন দেখা গেলেও দরিদ্র দেশগুলোয় তেমন কিছু দৃশ্যমান হবে না। আর সামগ্রিকভাবে এতে কার্বন নিঃসরণের হারও খুব একটা কমবে না। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর্তুকি কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ভর্তুকি কমানোর মাধ্যমে মূলত তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোয় কিছুটা অগ্রগতি হবে। তবে এর প্রভাব গিয়ে পড়বে বিশ্বের দরিদ্র মানুষের ওপর। জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি হিসেবে প্রতি বছর সারা বিশ্বে লক্ষ কোটি ডলার ব্যয় হয়। এই ভর্তুকি অপসারণ করার অর্থ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অনেকটা এগিয়ে যাওয়া; এই ধারণাটিই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু আইআইএএসএ পরিচালিত গবেষণায় এই শক্ত পোক্ত ধারণাটিকে খুব একটা জোর দেওয়া হয়নি। এতে বিজ্ঞানীরা বলছেন, হ্যাঁ কার্বন নিঃসরণ কমবে, কিন্তু তা প্রত্যাশিত মাত্রায় নয়। অন্যদিকে তেল ও গ্যাসের মতো জ্বালানি থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়ায়, বাজারে যে প্রভাব পড়বে তাতে করে অনকে দরিদ্র দেশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বদলে কয়লার মতো অধিক কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। ফলে প্রস্তুতি ছাড়াই মোটাদাগে এমন উদ্যোগ হিতে বিপরীত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাটি সম্প্রতি ন্যাচার জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। গবেষণার তথ্যমতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি সরিয়ে নিলে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমবে, তবে তা অল্প পরিমাণে। ২০৩০ সাল নাগাদ এই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ১ থেকে ৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমতে পারে। পরিমাণের দিক থেকে যা বছরে আধা থেকে দুই গিগাটনের সমান হতে পারে। অথচ প্যারিস চুক্তিতে ২০৩০ সালে মধ্যে বছরে ৪-৮ গিগাটন কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর কম হলে তা নির্ধারিত লক্ষ্য অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা সম্ভব হবে না। গবেষণা প্রধান আইআইএএসএ’র গবেষক জেসিকা জুয়েলের মতে, ভর্তুকি অপসারণের ফলে দুই ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সাধারণত এইসব ভর্তুকি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ এই ভর্তুকি অপসারণের ফলে কিছু অংশ কয়লাভিত্তিক প্রযুক্তির দিকে উৎসাহিত হবে, যা আরও বেশি কার্বন উদ্গীরণকারী। অন্যদিকে এই ভর্তুকি অপসারণ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এত বেশি পরিবর্তন করবে না যে, বিদ্যুতের চাহিদার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের অবদান রাখবে। বড়জোর ১-৭ শতাংশ চাহিদা হ্রাস পেতে পারে। আবার এই ভর্তুকি অপসারণের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ হবে এমন কথাও বলা যাচ্ছে না। অর্থাৎ সাকুল্যে ভর্তুকি অপসারণের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণে নাটকীয় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু নিঃসরণ বাড়ার একটি আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে বৈশ্বিকভাবে কার্বন নিঃসরণের ওপর এর প্রভাব কম হলেও আঞ্চলিক দিক থেকে একেক দিকে একেক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় একটি অস্থিরতারও জন্ম দিতে পারে এটি। ভর্তুকি অপসারণের সবচেয়ে বড় প্রভাবটি পড়বে তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর। বিশেষত রাশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকার দেশগুলোয় এর প্রভাব হবে সরাসরি। এইসব অঞ্চলের দেশগুলো এই খাতে ভর্তুকি তুলে নিলে, তা প্যারিস চুক্তিতে তাদের করা প্রতিশ্রুতিকে ছাড়িয়ে যাবে, যার আর্থিক মূল্য রয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এর প্রভাব হবে উল্টো। এসব দেশে বরং কার্বন নিঃসরণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই আশঙ্কা সত্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। কারণ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে দেশগুলো তখন সাশ্রয়ী জ্বালানি কয়লার দিকেই ঝুঁকবে, যে বাস্তবতা এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যে কয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ শুরু হয়েছে বা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তার প্রায় সবই কয়লাভিত্তিক। এর মধ্যে কয়লা ছাড়া মাত্র একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প রয়েছে, আর তা হলো রূপপুরের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। একইভাবে ভারতও গত বেশ কয়েক বছর ধরেই কয়লা উৎপাদন, রপ্তানি ও ব্যবহারে সামনের দিকে উঠে এসেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মেক ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানির দিকেও দেশটি অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু তা কয়লার দিকে পশ্চাদধাবনের সঙ্গে এখনো তুলনীয় নয়। দিল্লির ঘোলাটে আকাশ এই কিছুদিন আগেও এই বাস্তবতাই সবার সামনে হাজির করেছির। ঠিক যেমনটা প্রতি শীতেই বেইজিং করে কয়লাভতিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার ও উন্নয়নের দৌড়ে নামা চীনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মারক হয়ে। শুধু এটুকুতে এই ভর্তুকি অপসারণের গল্পটি থামলেও চলত। এটি শুধু এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের ব্যবধানটি গড়ে দেবে না, এটি শুধু তেল-গ্যাস রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক দেশগুলোর জ্বালানি নীতিকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করছে না, এটি একটি মানচিত্রের মধ্যে বসবাসরত মানুষদেরও বিভাজিত করছে। একটি দেশের ধনী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যবধান আরও বাড়বে এই ভর্তুকি অপসারণের মাধ্যমে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি নিত্যকার জীবন যাপনে। কিন্তু জ্বালানি ব্যবহারের চাহিদা কমবে না রাতারাতি। ফলে দরিদ্র মানুষেরা কম কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানি উৎস থেকে সরে বেশি কার্বন নিসরণকারী জ্বালানি উৎসের প্রতি আকৃষ্ট হবে বেঁচে থাকার তাগিদেই। এ ক্ষেত্রে তার কাছে জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্য প্রসঙ্গগুলো তখন অবান্তর হয়ে যাবে। এতে একই সঙ্গে তার স্বাস্থ্যব্যয়ও বাড়বে। ফলে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা আজকে প্যারিস চুক্তির কথা বলে যে ভর্তুকি অপসারণের পরামর্শ দিচ্ছে, তা শুধু ধনী দেশগুলো অনুসরণ করলেই ভালো। কারণ দরিদ্র দেশের দরিদ্র মানুষ এই ভর্তুকিহীন জ্বালানির দায় বহন করতে পারবে না। আর এই দায় বহনে তাকে বাধ্য করলে পৃথিবীর বাতাসই বরং কার্বনে ভরে উঠবে, তপ্ত হয়ে উঠবে, যা কারও জন্যই ভালো নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি অপসারণ করতে হলে, তা হতে হবে ধাপে ধাপে। এর সঙ্গে টেকসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও এর ব্যবহার বৃদ্ধি, সস্তা ও উন্নত জ্বালানির সহজলভ্যতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির ব্যয় হ্রাস, মানুষের মধ্যে বিদ্যমান আয় বৈষম্য সংকোচনসহ অনেক কিছু জড়িত। এ ক্ষেত্রে একমুখীভাবে হাঁটাটা তাই একচোখা হয়ে হাঁটারই শামিল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..