কমরেড প্রমথ নন্দী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আজহারুল ইসলাম আরজু : ‘রেড নন্দী’ নামে মানিকগঞ্জে সর্বাধিক পরিচিত কমরেড প্রমথনাথ নন্দী এক অবিস্মরণীয় নাম। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা কমরেড প্রমথ নন্দী মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের বড় কুষ্টিয়া গ্রামে ১৯১১ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা লাল বিহারী নন্দী তার শৈশব অবস্থায়ই পরোলোক গমন করেন। পিতৃহারা অবস্থায় তার লেখাপড়া শুরু হলেও অতি অল্পকালের মধ্যেই তিনি কৃতি ছাত্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তেরশ্রী হাইস্কুল থেকে ১৯২৮ সনে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ হতে আই.এস.সি ও বি.এ এবং বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। এর পর তিনি তুলনামুলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং রাইচাঁদ প্রেমচাঁদ বৃত্তি লাভের গৌরব অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি নিজেকে সমাজ সেবায় উৎসর্গ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই পশ্চিম মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তার জনকল্যাণের যশ ছড়িয়ে পড়ে। নিছক নিজের নাম প্রচারের জন্য নয়, বরং এই এলাকার মেহনতি মানুষের কল্যাণের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু এই পার্টির কর্মধারার সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিভিন্ন সময় জনগণের স্বার্থে কথা বলার দায়ে তাকে কয়েকবার কারাভোগ করতে হয়। জমিদারী ও ইজারাদারী উচ্ছেদকল্পে তিনি অনেকবার সোচ্চার ধ্বনি উচ্চারণ করেন। ১৯৫২ এর ভাষা অন্দোলনে তিনি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ সালেই তাঁর উদ্যোগে তেরশ্রী অঞ্চলে ভাষার দাবিতে সভা সমাবেশ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তেরশ্রী স্কুলের ৮ জন ছাত্র গ্রেফতার বরণ করে কারাভোগ করেন। প্রমথ নন্দীর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হলে তিনি আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। রাজনীতির কারণে তিনি তেরশ্রী হাইস্কুলে শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করেন। তারই উদ্যোগে তেরশ্রী গ্রামে মানিকগঞ্জ জেরার প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় যা পরবর্তিতে মানিকগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়। তিনি মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজেও শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেও তার আসল উদ্দেশ্য ছিল শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি কামনা। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগ বিরোধী ‘প্রতিবাদ’ নামক নিজের লেখা একটি নাটক মঞ্চস্থ করার দায়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। রাজনীতি ছাড়াও তিনি দুঃস্থ জনগণের জন্য সম্ভব সবকিছু করে গেছেন। তার উজ্জল দৃষ্টান্ত আয়নাপুর বাঁধ নির্মাণ। যা এলাকার লক্ষ লক্ষ লোকের জীবন রক্ষার কাজে সাহায্য করছে। দেশে দুর্ভিক্ষ, কলেরা, বসন্ত প্রভৃতি মহামারি দেখা দিলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবং নিজের হাতে স্যালাইন তৈরি করে শত শত লোকের জীবনরক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করতেন। কমরেড জিতেন ঘোষ ‘গারদের আড়াল থেকে’ গ্রন্থে প্রমথ নন্দী সম্পর্কে লিখেছেন: “প্রমথ নন্দী ছিলেন এক তালুকদার বংশ জাত। নিজে ছিলেন বিশ^বিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। গ্রামের হাইস্কুলেই তিনি শিক্ষকতা করতেন। স্কুলের মালিক ছিলেন স্থানীয় এক বড় জমিদার। প্রমথ বাবু কৃষক সংগঠন ও জমিদারী উৎখাতের আন্দোলন করতেন বলে তিনি কর্তাদের সুনজরে ছিলেন না। তবে ইচ্ছে থাকলেও কর্তারা তার চাকুরি নাকচ করতে সাহসী হতেন না। কারণ প্রমথ বাবু যেমন ছিলেন ছাত্রদের তেমনি জনগণের অতি প্রিয় মাস্টার বাবু। তার বিপক্ষে একটা আঙুল তুললেই ছাত্র জনতা ক্ষেপে উঠতেন। প্রতিবাদের ঝড় বইত। প্রমথ বাবু এখন দেশে নেই, তবুও এ অঞ্চলের বয়োবৃদ্ধরা তাদের মাস্টার বাবুকে শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণ করে।” “রোদ নেই, বৃষ্টি নেই, জল নেই, কাঁদা নেই, রাত নেই, দিন নেই একখানা ছাতি হাতে নিয়ে মাস্টার বাবু গ্রামের কৃষকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেরাতেন, বৈঠক, সভা করতেন। তাদের ভাল মন্দের সংবাদ নিতেন। কলেরা লাগলে প্রমথ বাবুকে দেখা যেতো গ্রামে গ্রামে কলেরা প্রতিষেধক ইনজেকশন দিতে। রোগীর বাড়িতে বাড়িতে প্রতিষেধক ওষুধ ছড়াতেন। নদী থেকে প্লাবন এসে জমির ফসল নষ্ট করে দেয় বলে গ্রামের কৃষকদের নিয়ে তিল্লির আয়নাপুরের কাছে এই প্রমথ বাবুই মস্তবড় এক বাঁধ তৈরি করেছিলেন। শিক্ষার অভিমান বা বংশ মর্যাদার অহমিকা কিছুই তার ছিল না।”মানিকগঞ্জের সেরা মানিকদের একজন প্রমথনাথ নন্দী ১৯৮১ সালের ১৫ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় জনগণ প্রতিবছর আজও তার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে। ১৯৫৮ সালে আয়ূব খানের সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর সহকর্মীদের পীড়াপীড়িতে প্রমথ বাবু ভারত চলে যান। ১৯৭৩ সালে পুনরায় তিনি কর্মীদের ডাকে সাড়া দিয়ে আরাম আয়েশের জীবন ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষপদ অলংকৃত করেন। প্রমথ নন্দী তাঁর মাতৃস্বত্বে প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। চিরকুমার প্রমথ নন্দী মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি জনগণের কল্যাণের জন্য উইল করে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন। কিন্তু তাঁর সেই উইল প্রভাইড না হওয়ায় এরশাদের সামরিক শাসনের সময় তাঁর সম্পত্তি খাস ঘোষণা করে বিভিন্ন জনকে লিজ দিয়ে দেন। সারাজীবনের সংগ্রামী অভিজ্ঞতার আলোকে আজীবন তাঁর তিনটি স্বপ্ন ছিল: ক) দুঃস্থ মহিলা ও শিশুদের জন্য মাতৃসদন ও শিশু চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন। খ) নিঃস্ব শিশুদের জন্য হাসপাতাল ও বিদ্যালয় স্থাপন এবং বিনা খরচে থাকা খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করা এবং গ) প্রগতিশীল সমাজকর্মীদের জন্য অধ্যয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। তার সম্পত্তি বেআইনিভাবে খাস ঘোষণা করে লিজ দেওয়ায় তাঁর স্বপ্ন আজো বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর সম্পত্তি বারো ভুতে গ্রাস করে আছে। এমনকি তাঁর বসতবাড়িতে তার সমাধিটিও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। তাঁর বাড়ি যিনি লিজ নিয়ে জবর দখল করে আছেন প্রমথ নন্দীর সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা বোধ নাই।তাঁরই আরেক ভাই ডা. মম্মথ নাথ নন্দীও ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত বামপন্থি, সমাজসেক ও মানবদরদী। কমরেড প্রমথ নন্দী নেই, কিন্তু আছে তাঁর স্বপ্ন আর কীর্তি। নতুন প্রজন্মকে তাঁর অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..