চট্টগ্রাম শ্রম আদালত ও প্রাসঙ্গিক কথা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ফজলুল কবির মিন্টু : চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগে প্রায় ৮০ লক্ষাধিক শ্রমিক রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকদের জন্য চট্টগ্রামে স্থাপন করা হয়েছে ২টি শ্রম আদালত। বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রামে অবস্থিত হওয়ায় এখানে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, কর্ণফুলি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ আরো অনেক শিল্প অঞ্চল। এই সকল শিল্পাঞ্চলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সেক্টর তথা তৈরি পোশাক, হোটেল অ্যান্ড রেষ্টুরেন্ট, স্বাস্থ্য, নির্মাণ, চা, সিমেন্ট, রিরোলিং, জাহাজ ভাঙা শিল্প প্রভৃতি সেক্টরে কর্মরত শ্রমিকদের, শ্রম আইনে স্বীকৃত অধিকার আদায়ের জন্য শ্রম আদালত স্থাপন করা হয়েছে। ভুক্তভোগী শ্রমিকরা ব্যক্তিগতভাবে কিংবা তাদের ফেডারেশন, বেসিক ইউনিয়ন (যদি থাকে) অথবা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ ভরসাস্থল হিসাবে শ্রম আদালতের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু বাস্তবে শ্রম আদালত শ্রমিকের শেষ ভরসাস্থলের পরিবর্তে আতঙ্কের স্থলে পরিণত হয়েছে। আদালতে বিচারক শূন্যতা, নিয়মিত আদালত না বসা অথবা বসলেও সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে আদালতের কার্যক্রম শেষ করা ইত্যাদি কারণে বিচার প্রক্রিয়া শম্বুক গতি লাভ করেছে। ফলে অধিকাংশ শ্রমিক হতাশাগ্রস্ত হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে অনীহা প্রকাশ করছে। ফলশ্রুতিতে মালিকপক্ষ বেপরোয়াভাবে শ্রম আইন লঙ্ঘন করেই চলছে। অথচ শ্রম আইন লংঘনের শিকার ভুক্তভোগী শ্রমিকদের এক দশমাংশ শ্রমিকও শ্রম আদালতে মামলা করতে আগ্রহী নয়। তারপরও মামলার জটের একমাত্র কারণ ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া, যা বস্তুত শ্রম আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াকে অকার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। শ্রম আদালতকে বলা হয় সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত আদালত। শ্রম আইনের ২১৬(১২) ধারা মতে, মামলা শুরু হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা থাকলেও শ্রমিকের দায়ের করা কোনো মামলা ৬০ দিনে শেষ হয়েছে এমন নজির নিকট অতীতে নেই। ৬০ দিনের মধ্যে মামলার রায় তো দূরের কথা বেশির ভাগ মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণ হয় ৬০ দিন পরে। শ্রম আদালতে বর্তমানে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা প্রায় ২০০০ এবং ৭/৮ বৎসর আগে মামলা করা হয়েছে কিন্তু নিষ্পত্তি হয় নাই এমন মামলার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। উপরোক্ত চিত্রসমগ্র বাংলাদেশের জন্য একই চিত্র হলেও চট্টগ্রাম শ্রম আদালত ভবনের অবস্থান যেন শ্রমিকদের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা রূপে দেখা দিয়েছে। বিগত কিছুদিন পূর্বেও চট্টগ্রামের সবচেয়ে নিম্ন অঞ্চল কাতালগঞ্জে শ্রম আদালত অবস্থিত ছিল। অল্প বৃষ্টিতে এখানে কোমড় সমান পানি ওঠে। ফলে বর্ষাকাল এবং অন্য সময়েও সামান্য বৃষ্টি হলে আদালত বসে না। অথচ চট্টগ্রাম আদালত ভবনে প্রচুর এজলাস খালি পড়ে আছে। সুতরাং চট্টগ্রাম শ্রম আদালত, আদালত ভবনে স্থানান্তর করলে একদিকে আদালতের স্থান সংক্রান্ত ব্যাপারে স্থায়ী সমাধান হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থার মূলধারার সাথে যুক্ত হয়ে বর্তমান ধীরগতির শ্রম আদালতে একটা গতি আসবে বলে সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের মত। শ্রম আদালত, মূল আদালত ভবন থেকে থেকে পৃথক জায়গায় অবস্থিত হওয়ায় অনেক অভিজ্ঞ আইনজীবী শ্রম আদালতে প্র্যাকটিস করেন না। এমন কি অনেক প্রতিশ্রুতিশীল সম্ভাবনাময় তরুণ আইনজীবীও শ্রম আদালতের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। ফলে বর্তমান শ্রম আদালত মুষ্টিমেয় কিছু আইনজীবীর নিয়ন্ত্রিত আদালতে পরিণত হয়েছে - যারা ভাগাভাগি করে মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের মামলা পরিচালনা করে। এই সমস্ত আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের অলিখিত বোঝাপড়া। শ্রম আইনের ২১৬(৩) ধারায় উল্লেখ আছে, মামলা দায়েরের ১০ দিনের মধ্যে প্রতিপক্ষ জবাব দেবে এবং ২১৬(৪) ধারা মতে, আদালত যুক্তি লিপিবদ্ধ করে উক্ত সময় সর্বোচ্চ ৭ দিন বৃদ্ধি করতে পারবে। অর্থাৎ সর্বমোট ১৭ দিনের মধ্যে বিবাদীপক্ষ জবাব প্রদানে ব্যর্থ হলে একতরফা শুনানি হবে। শ্রম আইনের উপরোক্ত ধারাগুলোও চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে। কোনো মামলার প্রতিপক্ষ ১৭ দিনের মধ্যে জবাব না দেওয়ার কারণে একতরফা শুনানি হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। এই ব্যাপারে যেমন বিচারকদের উদাসীনতা রয়েছে তেমনি শ্রম আদালত ভিত্তিক কিছু আইনজীবীদের নিজেদের মধ্যে অলিখিত বোঝাপড়াও এর জন্য দায়ী। কেননা আইনের ধারা লংঘন হলে তা আদালতের নজরে আনা বাদীপক্ষের আইনজীবীর দায়িত্ব হলেও নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার কারণে শ্রম আদালতে প্র্যাক্টিসরত অধিকাংশ আইনজীবী এই ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করেন। চট্টগ্রামে দুটি শ্রম আদালত থাকলেও অধিকাংশ সময় ২য় শ্রম আদালত বিচারক শূন্য থাকে। বর্তমানেও ২য় শ্রম আদালতে কোনো বিচারক নেই। ১ম শ্রম আদালতে যে সকল সম্মানিত বিচারকদের পাঠানো হয় তারা সকলেই চাকুরি জীবনের শেষ প্রান্তে চলে আসেন। অবসরের জন্য দিন গুণতে থাকা এই সকল বিচারকেরা মানসিকভাবে অবসরে চলে যান। ফলে পাঁচ দিনের আদালত চলে মাত্র ২ থেকে ৩ দিন। শ্রম আদালত, আদালত ভবনে স্থানান্তরিত হলে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতি এই বিষয়টি তদাররি করার সুযোগ পেতো। আর তাতে শ্রম আদালতের জবাবদিহিতার প্রশ্নটা নিশ্চিত হতো এবং শ্রম আদালতেও একটা গতি আসতো বলে সংশ্লিষ্ট সকল মহল মনে করে। চট্টগ্রাম শহরের পাঁচলাইশ থানার নিকটে শ্রম আদালতের বিচারকদের জন্য একটি আবাসিক ভবন অবস্থিত। শ্রম মন্ত্রণালয় বিচারকদের জন্য সংরক্ষিত উক্ত আবাসিক ভবনে শ্রম আদালত স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট মহল ইহা আরেকটি অবিবেচনা প্রসূত এবং বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্ত। এমনিতেই শ্রম আদালতে বিচারকেরা আসতে অনীহা প্রকাশ করে, তার উপর এমনটি হলে ভবিষ্যতে আবাসিক স্থান নাই এমন অজুহাতে বিচারকেরা আসতে না চাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই বিচারকদের আবাসিক ভবনে শ্রম আদালত স্থানান্তর না করে চট্টগ্রামের মূল আদালত ভবনে স্থানান্তরের জন্য শ্রমিক আইনজীবীসহ জোর দাবি জানিয়ে আসছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা জরুরি। লেখক : সাবেক সভাপতি, ছাত্র ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..