গণতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষি প্রশ্ন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মনোজ দাশ : গণতান্ত্রিক বিপ্লব পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মাঝামাঝি কোনো নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে না, এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন গতিশীল পর্যায়। এ প্রক্রিয়া সনাতন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গণ্ডিকে অতিক্রম করার মাধ্যমে একাধারে বুর্জোয়া বিকাশের অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পাদন করে, সাথে সাথে কৃষিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের পূর্বশর্ত সৃষ্টি করে। তাই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষি ও কৃষক প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘যেসব দেশে কৃষকদের সংখ্যা বেশি, সেসব দেশে ক্ষমতা কী করে দখল করা যায়-এ রাজনৈতিক উৎকণ্ঠা থেকেই ঊনিশ শতকের শেষের দিকের মার্কসীয় তাত্ত্বিক ও নীতিকুশলীরা কৃষি প্রশ্নের অবতারণা করেছিলেন।’ মার্কসবাদ গণতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষক ও কৃষি সমস্যাকে দুটি দিক থেকে বিবেচনা করে। প্রথমত, একটি সমাজে আমূল রূপান্তর সাধনের সংগ্রামে কৃষকরা কী ভূমিকা নেবে, সেটাই হচ্ছে কৃষি প্রশ্নের মূল কথা। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষকের কোন অংশ কতখানি অংশগ্রহণ করতে পারে, শ্রমিক শ্রেণির সাথে কৃষকদের কোন অংশের ঐক্য গড়ে ওঠার ফলে তারা বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হবে, এসবই হচ্ছে কৃষি প্রশ্নের মূল বিবেচ্য বিষয়। অন্য কথায় ‘গ্রামীণ সমাজে কৃষকদের কোন অংশকে সম্ভাব্য বিপ্লবী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, অথবা আরো সাদামাটা ভাষায় বলা যায়, বিপ্লবে সহজাতভাবে সাড়া দেবে কোন অংশ, গ্রামীণ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করবে কারা, গ্রামীণ বিক্ষোভ কিভাবে সংঘঠিত করতে হবে’... এসব বিষয় নিয়েই কৃষি প্রশ্ন আবর্তিত হয়। আর দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মৌলিক ধারণার ভিত্তিতে কোন ধরনের কৃষি কর্মসূচি প্রণয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজে কৃষকদের বিভিন্ন অংশকে সচেতন সংগঠিত করে বিপ্লবের বস্তুগত শক্তিতে পরিণত করতে হবে, এটি হচ্ছে কৃষক ও কৃষি প্রশ্নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের অন্যান্য বিষয়ের মতো কৃষি কর্মসূচিও পরিবর্তনশীল, বাস্তব বিষয়গত অবস্থা ও বিষয়ীগত শক্তির ভারসাম্যের আলোকে এটি ক্রমেই আরো সুনির্দিষ্ট রূপ ধারণ করে। কৃষি কর্মসূচির সেই সুনির্দিষ্ট রূপের মাধ্যমে কৃষির আমূল সংস্কার সাধন কীভাবে করা যায়, এটাই হচ্ছে কৃষি কর্মসূচির প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এসব বিবেচনায় এটা বলা যায়, কৃষি প্রশ্ন একটি জটিল বিষয়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট কোনো পথে এ প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গেলেও সচেতন থাকতে হবে এর সাথে সম্পর্কিত আরও নানা বিষয়ে। আমাদের অবশ্যই অনুসন্ধান চালাতে হবে কৃষক সমাজের বিন্যাসের ওপর। এ বিন্যাস কিভাবে বদলাচ্ছে অর্থাৎ কৃষকদের শ্রেণি বিভাজনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিচার করতে হবে। এঙ্গেলস বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের বিভিন্ন অংশের সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি ও গঠন প্রক্রিয়ার ওপর সবচেয়ে সতর্ক অনুসন্ধানে জোর দিয়েছেন। তিনি কৃষি প্রশ্নকে দৃশ্যত রাজনৈতিক এক প্রস্তাবনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বড়ো ও মাঝারি কৃষককে একদিকে, ক্ষুদে ও নিঃস্ব কৃষককে অন্যদিকে ফেলে এঙ্গেলস কৃষিতে বিভাজনের ছক এঁকেছেন। লেনিন পরবর্তীতে সৃষ্টিশীলভাবে এঙ্গেলসের সে ছককেই আরও বিস্তৃত করেছেন, বিকশিত করেছেন। তিনিও রাজনৈতিক নীতিকৌশলের পটভূমিকায় কৃষি প্রশ্নকে দেখেছেন। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষক ও কৃষি প্রশ্নের সমাধান খোঁজার জন্য আমাদের গ্রহণ করতে হবে লেনিনীয় দূরদৃষ্টি এবং অতীতের অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপ। আমাদের দেশের কৃষিতে পুঁজির প্রবেশের ফলে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন স্তরের অধিবাসীদের মধ্যেকার সম্পর্ক নানা ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামীণ সমাজে অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন ধাঁচের অধিবাসীদের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে গ্রামীণ সমাজের শ্রেণি বিভাজনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল ক্ষেতমজুর জনগোষ্ঠী, যারা মূলত গ্রামীণ সর্বহারা। নির্মমভাবে শোষিত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি ও মধ্যকৃষক। এরা মূলত মেহনতি কৃষক। এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে জোতদার-মহাজনের মতো সামন্ত অবশেষ ও কিছু কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী। গণতান্ত্রিক বিপ্লব গ্রামে উৎখাত করবে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, জোতদার-মহাজনের মতো সামন্ত অবশেষ হিসেবে বিদ্যমান সকল ক্ষয়িষ্ণু শক্তি, গ্রামাঞ্চলে গজিয়ে ওঠা নব্য কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীসহ সকল প্রতিক্রিয়াশীল শাসন-শোষণ। এজন্য এ প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়নে গ্রামের ব্যাপক শ্রেণি ও স্তরের স্বার্থ ও ভূমিকা একই রকম হবে না। এই বিপ্লব যেহেতু ক্ষেতমজুর-প্রান্তিক কৃষক-বর্গাচাষি ও মধ্যকৃষকের স্বার্থ রক্ষা করবে সেজন্য এই বিপ্লবে সহজাত শক্তি হিসেবে পাওয়া যাবে গ্রামাঞ্চলের বিশাল ক্ষেতমজুর জনগোষ্ঠীকে। এরা আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণির সহোদর। গ্রামের ক্ষেতমজুর শ্রেণিকে সচেতন ও সংগঠিত করতে পারলে, বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে এরা শ্রমিক শ্রেণির সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অগ্রবাহিনীর ভূমিকা পালন করবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্মমভাবে শোষিত প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি ও মধ্যকৃষক তথা মেহনতি কৃষক হয়ে উঠতে পারে এই বিপ্লবী প্রক্রিয়ার অপর এক বলিষ্ঠ উপাদান। শ্রমিক শ্রেণির পাশাপাশি ক্ষেতমজুর ও মেহনতি কৃষকের মধ্যে ঐক্য-সংগঠন ও বিপ্লবী জাগরণ সৃষ্টি করতে পারলে তারা গণতান্ত্রিক বিপ্লবে চালিকা শক্তিতে পরিণত হবে। কিন্তু গ্রামীণ সমাজের কৃষকদের ব্যাপক অংশের, অর্থাৎ ক্ষেতমজুর-বর্গাচাষি-প্রান্তিক কৃষক ও মধ্য কৃষকদের বিপ্লবের পক্ষে পাওয়ার জন্য কৃষি স্বার্থ রক্ষাকারী গণমুখী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, প্রগতিশীল বিকল্প কৃষি কর্মসূচি উত্থাপন ও তাকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। কৃষি ও শিল্পের সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা করে গ্রামীণ সমাজের ব্যাপক অংশের স্বার্থ-উৎসাহ-মর্যাদা পরিপূর্ণভাবে বজায় রেখে বৃহত্তর একটি সামাজিক অঙ্গিকারের ক্যানভাসে কৃষি প্রশ্নের বাস্তব সমাধান পেতে হবে। যে উন্নয়ন বেশিরভাগ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারে, বেশি করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা অধিকসংখ্যক মানুষের হাতে দিতে পারে, তার চৌহদ্দিতেই কেবল আমাদের দেশের গ্রামীণ মানুষদের সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের আমূল বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের কর্মসূচির মূল নীতি হবে-‘খোদ কৃষকের হাতে জমি ও সমবায়ের ভিত্তিতে আমূল ভূমি সংস্কার।’ ভূমি সংস্কার ও সমবায় একই জিনিসের দুটি দিক। সমবায় কর্মসূচি ছাড়া ভূমি সংস্কার ফলপ্রসূ হতে পারে না। প্রথমত ভূমি মালিকানার এবং ভূমির ভোগ দখলিস্বত্ব ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য। ভোগ-দখলিস্বত্ব ব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি ভূমি মালিকানার সংস্কার এবং চাষ ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়টিও বিবেচনা করার প্রয়োজন হবে। জমির সর্বোচ্চ সিলিং আইন প্রণয়ন করে যাদের কাছে উদ্বৃত্ত জমি রয়েছে তা তাদের কাছ থেকে নিয়ে নিতে হবে; এবং যাদের কাছে জমি নেই বা কম জমি আছে তাদের কাছে তা হস্তান্তর করতে হবে। সিলিং নির্ধারণের মাধ্যমে যতটুকু উদ্বৃত্ত জমি পাওয়া যাবে তা আমাদের ভূমি সমস্যা সমাধানে অবদান রাখবে, কিন্তু সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে না। ‘একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমি সংস্কার করতে হলে প্রয়োজনে জমির সিলিং অনেক কমাতে হবে।’ বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের প্রশ্নে সব সময়ই চেষ্টা করতে হবে যেন অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ ‘উৎপাদনের একক’ বিপর্যস্ত না হয় এবং পাশাপাশি গরিব কৃষক পরিবারগুলোর জন্যও যেন সর্বাধিক মঙ্গল বিধান সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত সাধারণ ভূমি পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে গ্রামীণ গরিব পরিবারের হয়তো এক তৃতীয়াংশকে ভূমি-মালিকানা ও চাষবাসের সুবিধা প্রদান করা সম্ভব। অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশ পরিবার ভূমি পুনর্বণ্টন থেকে কোনো প্রত্যক্ষ সহায়তা পাবে না। সুতরাং এদের জন্য কোনো না কোনো ধরনের পরিকল্পিত সমবায় পদ্ধতি চালু করার প্রশ্নটিও এসে পড়ে। বাধ্যতামূলক ও স্বেচ্ছাসম্মতির ভিত্তিতে সমবায়, এ দুটি পদ্ধতিকেই সৃষ্টিশীলভাবে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। বাধ্যতামূলক সমবায় কর্মসূচির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সম্পত্তির অধিকারের সামাজিকীকরণ ছাড়াই উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার উভয়ের সামাজিকীকরণ। ভূমির ওপর মালিক-চাষির অধিকার ক্ষুণ্ন না করেই সংস্কার সাধনের সুবিধা এই কর্মসূচিতে থাকে। যারা ভূমি পুনর্গঠনের মাধ্যমে জমি পাবে তাদের অবশ্যই বাধ্যতামূলক সমবায়ের মধ্যে আসতে হবে। যাদের জমি নির্ধারিত সিলিং এর নিচে তাদের বাধ্যতামূলক সমবায়ের মধ্যে আনার জন্য সৃষ্টিশীল উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আর ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে যাদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত জমি নিয়ে নেওয়া হবে তাদের ক্ষেত্রে লেনিনীয় দূরদৃষ্টি, সহনশীলতা ও মানবিকতাসম্পন্ন ও দীর্ঘমেয়াদে পর্যায়ক্রমে উদ্বৃদ্ধ করে স্বেচ্ছাসম্মতির ভিত্তিতে সমবায়ে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সমবায় পরিচালনার মূলনীতি হবে- ‘উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ উৎপাদকের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার।’ আর মূল লক্ষ্য হবে, উদ্বৃত্তের সামাজিকীকরণ। এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত ফল হবে ‘শ্রম অনুযায়ী আয়ের নীতি’ প্রবর্তন। সমবায়ই হবে ভূমি সংস্কারকে ফলপ্রসূ করার হাতিয়ার। তৃতীয়ত ভূমি সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হবে খাস জমি-হাওর-বিল-জলমহাল ইত্যাদি উৎপাদনশীল ব্যবহারে আনার জন্য এসবের মালিকানা দরিদ্র-দুস্থ-ভূমিহীন উৎপাদকদের সমবায়ের হাতে ন্যস্ত করা। চতুর্থত ভূমি সংস্কারের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে অনুপস্থিত ভূমি মালিকানা ও বেনামি জমির মালিকানা বাতিল করা। ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দূর করে নতুন, উন্নত, স্বচ্ছ, সহজ ও দক্ষ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা। পঞ্চমত আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হওয়া রোধ করার জন্য ভূমি সংস্কারের মধ্যে পরিবেশবান্ধব ভূমি নীতিমালা থাকবে। ষষ্ঠত গ্রামাঞ্চলে কৃষিবহির্ভূত নানা খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্প, কুটির শিল্প, সেবামূলক কার্যক্রমসহ বহুমুখী উদ্যোগ প্রসারিত করা হবে গ্রামীণ জীবন পুনর্গঠনের অন্যতম দিক। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে এসব মৌলিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বন্যা-খরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষক যাতে ক্ষতিপূরণ পায় সেজন্য শস্য বীমা চালু করা, গরিবদের জন্য পল্লি-রেশনিং ব্যবস্থা চালুসহ নানা ধরনের সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি কার্যকর থাকবে। বাজার ব্যবস্থার কারসাজিতে গ্রাম থেকে ঢালাওভাবে উদ্বৃত্ত উঠিয়ে আনার নীতি পরিবর্তন করা এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে তার সিংহ ভাগ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে কৃষি উপকরণাদি নিজেদের দেশে তৈরি করা সম্ভব হবে, কৃষি উপকরণসমূহ সস্তায় যথাসময়ে খোদ উৎপাদকের কাছে সরবরাহের ব্যবস্থা করা যাবে। ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ন্যায্য দামে ফসল ক্রয়, বাফার স্টক গড়ে তোলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য দূর করার জন্য বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার যৌথ উদ্যোগ প্রবর্তন করা হবে। কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের মূল্য এবং অকৃষিজাত পণ্যের মূল্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। এর ফলে খোদ কৃষক জমিহারা হবে না। বর্তমানে গ্রামের ধনিক শ্রেণি তাদের ক্ষমতা ও সম্পত্তির একচেটিয়া অধিকারের কারণে গ্রামের অধিকাংশ দরিদ্র জনগণের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য বিপ্লবে প্রধান প্রতিবন্ধকতা আসবে গ্রামের ধনী কৃষকদের কাছ থেকে। ‘দুই কারণে তাঁরা এই কর্মসূচির তীব্র বিরোধিতা করবেন। প্রথমত, উৎপাদনের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ অন্যের কাছে সমর্পণের ফলে তাঁরা স্বীয় উদ্বৃত্তের ওপরও নিয়ন্ত্রণ হারাবেন এবং এই কারণে তাঁরা বিক্ষুদ্ধ হবেন। দ্বিতীয়ত, তাঁদের উদ্বৃত্ত জমি আগে তাঁরা যে অনুকূল শর্তে গরিব চাষিদের ভাগচাষে দিতেন তা পরিবর্তিত হয়ে যাবে এই কারণেও তাঁরা বিক্ষুদ্ধ হবেন। তাঁরা এ কথা ভালভাবেই অনুধাবনে সক্ষম যে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি সাফল্যের সঙ্গে কার্যকরী হলে গ্রামে তাদের সামাজিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ তাদের এই ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জমি এবং জমি থেকে আহরিত উদ্বৃত্তের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানা।’ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মৌলিক ধারণার ভিত্তিতে প্রণীত কর্মসূচি হবে পরিবর্তনশীল। বিষয়গত ও বিষয়ীগত বাস্তবতার আলোকে ক্রমেই তা আরো সুনির্দিষ্ট রূপ ধারণ করবে। শ্রমিক শ্রেণির পাশাপাশি ক্ষেতমজুর ও মেহনতি কৃষকদের এ কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত করার মধ্য দিয়েই তারা অবশেষে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হবে। তাই কমিউনিস্ট-বামপন্থি-প্রগতিশীল কর্মীদের দায়িত্ব হচ্ছে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচির ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণির পাশাপাশি ক্ষেতমজুর ও মেহনতি কৃষকের মধ্যে ঐক্য-সংগঠন ও বিপ্লবী জাগরণ সৃষ্টি করা, যাতে তারা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের চালিকা শক্তিতে পরিণত হতে পারে। লেখক: সভাপতি, সিপিবি, খুলনা জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..