শিক্ষার একি হাল?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তৌহিদ টিপু : প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে শুরু করে প্রাথমিক সমাপনী, জুনিয়র সার্টিফিকেট, এসএসসি, এইচএসসি, মেডিকেল-বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগ, ব্যাংকিং ডিপ্লোমা এমন কোনো পরীক্ষা বাদ নেই যে প্রশ্ন ফাঁস হবার বাকী আছে। প্রশ্ন ফাঁসের বাজার এতোই রমরমা যে অন্য সব ক্ষেত্রের মতো সেখানেও জাল কারবার শুরু হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্ন ফাঁসেও ভেজাল! প্রশ্ন ফাঁসের পুরো বিষয়টি এমন এক উচ্চতায় উঠেছে যে এটিকে রীতিমতো শিল্পের মর্যাদা দেয়া যায়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এর আগে নকল নামক এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিতে ভুগেছে। সেটির অবশেষ এখনও রয়ে গেছে। বছরের পর বছর এমন একেকটা নতুন রোগের সংক্রমণ ঘটছে পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বরাবরই পরীক্ষা কেন্দ্রিক। এখানে একজন শিক্ষার্থীর জীবনমান নির্ধারিত হয় ফলাফল ও সার্টিফিকেট অর্জনে। কে কী শিক্ষা অর্জন করলো, নিজেকে উন্মোচনে কার মেধা শিক্ষার কোন শাখায়, মা মাটির প্রয়োজনে কোন শিক্ষার বিস্তার দরকার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিকে থাকার জন্য কেমন শিক্ষা দরকার এসবের পরিকল্পনার কোনো চিহ্ন আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় পাওয়া যায় না। শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারগুলো নিজেদের সাফল্য প্রদর্শনের হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে। কার আমলে কত শিক্ষার্থী পাস করেছে ও এ+ পেয়েছে এই প্রতিযোগিতার বলি হচ্ছে আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীরা। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের চাকুরি খেয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে নাম্বার বাড়িয়ে দিতে বাধ্য করছে। এসব পরীক্ষার ধারে কত যে শিশু-কিশোরের রক্তক্ষরণ হচ্ছে, আত্মার অপমৃত্যু ঘটছে তা ভাবার সময় কই আমাদের বিজ্ঞ শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগ্রহণ করে আত্মস্থ করার চাইতে কতটুকু পড়লে পরে পাস করা যায়, এ+ পাওয়া যায়, কতটুকু বাদ দিলেও চলে, এ ছাঁচে পড়া সাজিয়ে নেয়। শিক্ষকরাও পাস করানোর দায়িত্বটা সেরে নিচ্ছেন শুধু। অভিভাবকও চোখ রাখছেন পরীক্ষার ফলাফলে। ফলাফল ভালো না হলে সমাজে মুখ দেখানোর উপায় নেই। ফলাফল ভালো না হলে যে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে! একজন শিক্ষার্থীকে যাচাই করতে হলে পরীক্ষার বিকল্প যৌক্তিক কোনো উপায় এখনো আবিষ্কার হয় নি। তবে যাচাইয়ের নামে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিটি শিশু-কিশোরদের যেভাবে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয় তাতে পরীক্ষা সম্পর্কে তাদের মনোজগতে ভয় এবং চাপের সৃষ্টি হয়। এ চাপ পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে আরো বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রশ্নপত্রের ধরনটা আমাদের এখানে এমন যে মুখস্থ নির্ভরতা না থাকলে ভালো ফলাফল করা যায় না। যে সকল শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করার উপায় আয়ত্তে আনতে পারে না তাদের জীবনে ভালো ফলাফল ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলতঃ খারাপ ফলাফল; এবং তার প্রেক্ষিতে পরিবার ও সমাজ তাকে একজন ব্যর্থ ও অথর্ব মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে। পরিবার, সমাজ সবখানে সে নিজের অবস্থান হারায়। সে মনে করতে থাকে তাকে দিয়ে কিছু হবে না। অথচ প্রতিটি শিশু কিশোরেরই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও গুণ থাকে। কাজেই পরীক্ষা পদ্ধতি আমাদের কচি মনের শিশু-কিশোরদের বিকশিত হবার সুযোগ দেয় না। উল্টো মৃত্যু ঘটায়। এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। মুখস্থ করা একটি গুণ, শিক্ষাকে আত্মস্থ করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে এটি সহায়কও বটে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু মুখস্থ বিদ্যারই কদর করতে জানে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সমাজতান্ত্রিক নয়, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্ট রুপটি আমাদের এখানে দেখা যায়। কেউ একে মিশ্র অর্থনীতি আবার কেউ মুক্তবাজার অর্থনীতি বিভিন্ন নামে ডাকেন। তবে একে লুটপাটের অর্থনীতি বললে ভুল হয় না। কারণ একদিকে সীমাহীন দুর্নীতি, বিদেশি অর্থ নির্ভরতা, ব্যাংক লুট, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ’র খবরদারি সব মিলিয়ে এটাকে কোনো সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। আমাদের অর্থনীতিতে উৎপাদনের কদর নেই। কৃষিতে ফসলের দাম না দেয়া, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ট্যাক্সের মারপ্যাঁচ এবং সরকারের অসহযোগিতা, দেশীয় শিল্প বিকাশে বিভিন্ন অন্তরায় তৈরি করা সব মিলিয়ে এদেশের জনগণ উৎপাদনের অংশীদার না হয়ে মূলত বিদেশি পণ্যের ভোক্তা হয়ে উঠেছে। এবং এখানে চাকুরির বাজারে মূলত এ ভোক্তা শ্রেণিকে ব্যবস্থাপনা করার ধরনটাই বেশি। তাই সরকারি চাকুরি, ব্যাংকার, সেলস্?-মার্কেটিং এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে লোকবল সবচেয়ে বেশি নিয়োগ পায়। এর বাইরে ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে সিট সংকট। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ার সামর্থ কয়জনেরই বা আছে। চাকুরির বাজারের কথা মাথায় রেখে আমাদের অভিভাবকেরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্য করেন। হয়তো সে বিষয়ে শিক্ষার্থীর কোনো আগ্রহ নেই। আবার হয়তো নিজের ভালো লাগার সাবজেক্টে পড়লে সে আরো ভালো কিছু করতে পারতো। কিন্তু এমন রাষ্ট্রীয় আর সামাজিক বাস্তবতায় অভিভাবকেরা বিকল্প কিছু ভাবার সাহসই বা পাবেন কী করে। দেখা যাচ্ছে গণিতে, পদার্থ বিজ্ঞানে, জীব বিজ্ঞানে পাস করেও সেলস্ ম্যানের চাকুরি করতে হচ্ছে। নিশ্চিতভাবেই পরিকল্পিত অর্থনীতির অভাবে মেধার এ অপচয় হচ্ছে। শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ তৈরির কারিগর। অথচ শিক্ষকদের জীবন অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে দুর্বিষহ। শিক্ষকদের বেতন স্কেল এতোই কম যে সামাজিক মর্যাদা নেই বললেই চলে। এ কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট নয়। এমনকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট ভয়াবহ। বাংলায় পাস করে অংক করাচ্ছেন এমনটা অহরহ দেখা যায়। শিক্ষকতা পেশাটির বৈশিষ্ট্য আর দশটা পেশার সাথে মেলে না। একজন শিক্ষক টাকা পেলেন আর ছাত্র পড়ালেন বিষয়টা এমন নয়, এর চাইতেও আরো অনেক বেশি কিছু। ছাত্রকে যেমন পড়াতে হয় তেমনি মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বটিও তাঁর। ছাত্রকে সময়ের সাথে টিকে থাকবার জন্য যোগ্য করে তোলা এবং জ্ঞান অন্বেষণে আগ্রহী করে তুলতে হয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা ঘর সামলাতেই বেসামাল। এতোসব দায়িত্ব পালনের সময় বা মানসিকতা কোনোটাই তাদের থাকে না। আরেকটু ভালো থাকার জন্য শিক্ষকরা তাই বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে থাকেন। প্রাইভেট পড়ান। আর যেহেতু প্রাইভেটই তাঁর অন্ন যোগায়, তাই ক্লাস রুমে পড়াতে অনীহা তৈরি হয়, সময় দিতে চান না। আবার এই সময় না দেয়ার সুযোগে এই শূন্যতা পূরণে বছরের পর বছর কোচিং বাণিজ্য ধেই ধেই করে বাড়ছে। কোচিংগুলো যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতার দায় নেয় নি তাই তারা সিলেবাস শেষ করা আর নোট সরবরাহেই মনোযোগী। লক্ষ্য একটাই শিক্ষার্থীদের পাস ও এ+ নিশ্চিত করা এবং বেশি সংখ্যক এ+ বাগিয়ে নিয়ে কোচিং এর নাম করে নেয়া। সাফল্য অর্জনে কোচিংগুলো অসাধু উপায়ের দ্বারস্থ হচ্ছে। শিক্ষা বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করিয়ে নিচ্ছে। কোচিং এর ছাত্রছাত্রীরা সামর্থ থাকলে সে প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা দিচ্ছে। এতে এ+ যেমন শতকরা একশ ভাগে উন্নীত হচ্ছে, পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ টাকা মুনাফা করার সহজ উপায় তৈরি হচ্ছে। এ শিক্ষা আমাদের মানুষ হবার দ্বার রুদ্ধ করে দিচ্ছে। আমাদের বিভাজিত করছে। আমরা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছি। আমাদের বোধ বুদ্ধিতে মুনাফা সেঁটে দেয়া আছে। লাভ না থাকলে আমরা কোনো দিকে পা বাড়াই না। মানবিক মূল্যবোধ শূন্য একটি যান্ত্রিক প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছি আমরা। ভালো খারাপ নিরুপণের ভারটুকুও আমরা অন্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের এ নির্লিপ্ততা, অথর্বতা শাসক দলগুলোর জন্য বড়ই প্রয়োজন। এ শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ও দিনে দিনে পঙ্গু করতে তাই তাদের আয়োজনের কমতি নেই। প্রশ্ন ফাঁস, ফলাফল নির্ভর শিক্ষা, শিক্ষকের দৈন্যদশা, শিক্ষার মান ধ্বংস করা এমন শত শত আয়োজনের যেন শেষ নেই। এমন যখন অবস্থা তখন জানতে ইচ্ছে করে এতো দুর্দশাগ্রস্ত ব্যবস্থা বজায় রেখে কি আদৌ প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব? প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা গেলেও আর সব সমস্যার সমাধান কি আপনা আপনিই হয়ে যাবে? মনে হয় না। প্রশ্ন ফাঁসকে আমি আলাদা করে নতুনভাবে সৃষ্ট কোনো সমস্যা মনে করি না। এটি আমাদের গলদে ভরা শিক্ষা ব্যবস্থার সামান্য সম্প্রসারণ মাত্র। কি শিক্ষা দেয়া হবে, কারা শিক্ষা দেবেন, শিক্ষা দানের পদ্ধতিটা কী হবে, শিক্ষার্থীর শিক্ষার মূল্যায়নের পদ্ধতিটা কী হবে এবং ঠিক কোন কোন জায়গায় শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষা দিতে বাধ্য থাকবে এসবের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ থেকে হয়তো নিস্তার পাওয়া যাবে। তখন হয়তো ফাঁস করা প্রশ্নের গ্রাহকই থাকবে না। প্রশ্ন ফাঁস তো অনেক পরের ব্যাপার। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..