কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষক আন্দোলন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সাজ্জাদ জহির চন্দন : বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ভূমি বা কৃষি সংস্কারে ব্যর্থ লুটেরা শোষক-শাসক শ্রেণির সীমাহীন লুটপাটের ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান এখন পড়তির দিকে। অথচ, বিশ্বের সর্বত্রই শিল্পখাতের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে বিকাশমান কৃষিখাত। আমাদের জিডিপিতে কৃষির অবদান এখন মাত্র প্রায় ১৭-১৮ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ হলো এক সময়কার কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিনির্ভর মানুষের সংখ্যা ক্রমশঃই হ্রাস পাচ্ছে। ৪৭ বছর আগে কৃষির উপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ছিল ৮০ ভাগ, আজ তা ২৫ ভাগে নেমে এসেছে। একদিকে কৃষক সমাজের ভূমিহীনতা ও নিঃস্বকরণ এবং অন্যদিকে গুটিকতক মানুষের হাতে কৃষি সম্পদের পুঞ্জীভবন এ সময়কালে আরও তীব্র হয়েছে। আমাদের দেশে কৃষি জমির আয়তন এখন ২ কোটি ২৬ লাখ ৮০ হাজার একর। দেশের মাত্র ৬.৩৭ শতাংশ মানুষ মোট ভূ-সম্পত্তির প্রায় অর্ধেকের মালিক। ভূমিহীন, প্রান্তিক ক্ষুদে ও মাঝারি কৃষকরাই চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তারাই দ্রুত জমি হারাচ্ছে। এরা গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের সমস্ত কৃষি-অকৃষি ও জলাধারসহ খাস জমি দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষের প্রাপ্য হলেও সেখানে ক্ষমতাসীনদের দখলদারিত্ব কায়েম হয়েছে। চলছে দলবাজি। বাংলাদেশে মোট ৩৩ লাখ ২০ হাজার একর খাস জমি রয়েছে কিন্তু এ যাবৎ কোনো সরকারই তা প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টনের কার্যক্রম সফল করতে পারে নাই। সম্প্রতি বীজসহ অন্যান্য আধুনিক কৃষি উপকরণের বাজারকে ক্রমেই বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের স্থানীয় এজেন্টের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এর ফলে সমগ্র কৃষক সমাজ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এছাড়াও কৃষিতে ব্যবহৃত বন্ধ্যা, টার্মিনেটর বা সংহারী বীজ কৃষি ও পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনছে। সর্বোপরি গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতিতে আজ ক্ষমতাসীন ও তাদের অনুচর টাউটগোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়েছে। স্থানীয় বাজারে ধনিকশ্রেণির একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম হওয়ার দরিদ্রদের ওপর শোষণ নিপীড়িন আরও তীব্র হচ্ছে। এছাড়া সারাদেশে গরিব কৃষকের ওপর চলছে নানা রকমের নির্যাতন। হাট-বাজারে চলছে মান্দাতা আমলের মজুদদারী জুলুম। সরকারিভাবে ইজারাদারী জুলুমকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে গ্রামীণ টাউট শ্রেণির ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের অর্থ-উপার্জনের সুবিধা দেয়ার স্বার্থে। জমি কেনা-বেচা রেজিস্ট্রি ও ভূমি রেকর্ডের নামে কৃষকদের নাজেহাল করা হচ্ছে। এতে সরকারি নিয়ম-কানুন যেমন দায়ী তেমনিভাবে দায়ী একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ সরকারি আমলা কর্মচারী। অনেক গ্রামে বিদ্যুৎ গিয়েছে কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ এর অনিয়ম ও জুলুম অব্যাহত রয়েছে। আমাদের দেশে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও কৃষি উপকরণ কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার সুষ্ঠু সরকারি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের গৃহীত মুক্তবাজার নীতি এর জন্য দায়ী। মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে কৃষি পণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা লোটার দারুণ সুযোগ হয়ে গেছে। গ্রামের হাট-বাজারের ফড়িয়ারা কৃষিপণ্য কিনছে পানির দামে এবং শহরে বা বিদেশে বিক্রি করছে চরম লাভজনক মূল্যে। মধ্যস্বত্বভোগীরা আজ কৃষকদের রক্তশোষক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া সরকার বিএডিসি কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম সংকুচিত করায় সার বীজ সেচ ব্যবস্থা চলে গেছে ওই মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তিমালিকদের হাতে। এইভাবে গ্রামীণ লুটেরাগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে এবং এরাই হলো ক্ষমতাসীনদের গ্রামীণ ভিত্তি। মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে না পারলে কৃষকরা ক্রমশঃ নিঃস্ব হবে আর মধ্যস্বত্বভোগীরা ফায়দা লুটবে। কৃষক ও কৃষি ব্যবস্থার এই অবস্থা সৃষ্টির মূলে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ধনবাদী বাজারের শোষণ। পরাধীন আমলে সাম্রাজ্যবাদীরা প্রত্যক্ষ শাসন ও শোষণের মাধ্যমে আমাদের দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে নিয়ে যেতো। এখন আমাদের দেশ স্বাধীন, বিদেশি শাসন নেই। কিন্তু অতীতের এই শোষণের ধারা আজও নানাভাবে অব্যাহত রয়েছে। বড় বড় ধনী পুঁজিবাদী দেশ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সহ বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা নানা ছলে ও কায়দায় আমাদের দেশের সম্পদ শোষণ করে নিয়ে যাচ্ছে। কৃষিই হলো আমাদের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান খাত এবং কৃষি থেকেই জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পায়। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদীরা আমাদের অর্থকরী কৃষিপণ্য সস্তায় কিনে নেয় এবং তাদের উৎপাদিত কৃষি উপকরণ অতিরিক্ত চড়া দামে আমাদের কিনতে বাধ্য করে। আসলে কিনি বা বিক্রি করি তার কোনটার দাম আমরা নির্ধারণ করতে পারি না। দর নির্ধারণ করে পুঁজিবাদী ধনী দেশ ও বহুজাতিক সংস্থা। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। আবার তারা সাহায্যের নামে আমাদের দেশকে ঋণের জালে এমনভাবে বেঁধে রাখছে এর খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের কৃষিখাত ও কৃষক সমাজকে। এটাই হল সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী বিশ্বের মুক্তবাজারের শোষণ। এরই সাথে যুগ-যুগের যন্ত্রণাদায়ক সামন্তবাদী শোষণের জেরসমূহ তো আছেই। এছাড়াও সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী দেশের লুটেরা ধনীক শ্রেণির স্বার্থেই সরকারের কৃষি নীতিও ভূমিনীতি প্রণীত ও পরিচালিত। শাসকশ্রেণির এই অপরিণামদর্শী নীতিই কৃষকের সকল দুঃখ-কষ্ট ও সর্বনাশের কারণ। এই অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। আমরা কৃষক সমাজ শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র্য, অন্যায়-অত্যাচার অশিক্ষা-কুশিক্ষার হাত থেকে মুক্ত হতে চাই। আমরা চাই জমি, ফসলের লাভজনক দাম, সস্তায় কৃষি উপকরণ, সরল সুদে ও সুদবিহীন পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ ও ভাত-কাপড় শিক্ষা চিকিৎসার নিশ্চয়তা। এইসব পেতে হলে এই পচাগলা সমাজ ভাঙতে হবে। গড়ে তুলতে হবে গণতন্ত্র ও প্রগতির ধারা শোষণহীন সমাজ। গড়ে তুলতে হবে জঙ্গি, কৃষক আন্দোলন। অতীতের অনেক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়নি সত্য কিন্তু কৃষকের প্রকৃত মুক্তি আসে নি। তাই আবার লড়তে হবে। প্রয়োজন কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও সংগঠন। সংগ্রাম ও সংগঠন গড়ে উঠার সম্ভাবনা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। এদেশের ঐতিহ্যবাহী বহু লড়াই সংগ্রামের কৃষক সংগঠন ‘কৃষক সমিতি’কে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। কৃষক সমিতি শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই কৃষকদের নিয়ে সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। জেলজুলুম নির্যাতন সহ্য করে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রামকে অগ্রসর করে নিতে হবে। স্থানীয় এবং জাতীয় আন্দোলনের সমন্বয় সাধন করেই কৃষক আন্দোলনকে অগ্রসর করতে হবে। শুধু কর্মসূচি পালন নয় কৃষকের স্বার্থে দাবি আদায় করে আনতে হবে। কৃষকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। গ্রামে গ্রামে বৈঠক হাটসভা ও স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করে ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হতে হবে। সামনে নিয়ে আসতে হবে ‘গ্রামীণ কাঠামো ও আমূল ভূমি সংস্কার চাই’ এই শ্লোগানকে। বাধা আসবে। প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। লুটেরা শাসকগোষ্ঠী, প্রশাসন, কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের বাধা আসবে, তা দৃঢ়চিত্তে সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ করতে হবে। এটা সম্ভব হলেই কৃষকের দাবি আদায় হবে। এদেশের কৃষক আন্দোলনের যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে তার উপর দাঁড়িয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করতে হবে। আন্দোলনের নতুন ইতিহাস রচনা করতে অতীতেও পেরেছি ভবিষ্যতেও পারবো। এটা আমাদের অঙ্গীকার। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, কৃষক সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..