স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সময়টা ১৯৮৩। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ছাত্র জমায়েত। মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে এই জমায়েত। সেটাই পরিণত হল বুট ও বুলেটে-দমিত জনতার এক বিরাট প্রতিরোধে। সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ চেতনার দিন। সে থেকে দিনটি পালিত হচ্ছে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। পাকিস্তান পর্বে পূর্ববাংলার ছাত্রদের প্রধান দাবি ছিল একটি সুলভ, সার্বজনীন, বৈষম্যহীন, বৈজ্ঞানিক, উৎপাদনমুখী, জাতীয় ও গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দেশের আপামর জনগণের উদ্দেশ্যে ১১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরপরই তার শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আর শিক্ষা সংকোচনকে ভিত্তি ধরে প্রণীত এ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়। এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই ইসলাম ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলো। শিক্ষানীতিতেও সে প্রতিফলন ঘটে। এ নীতিতে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলার সঙ্গে আরবি ও ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। এ নীতি ছিল শিক্ষা অর্জনের জন্য মাতৃভাষার গুরুত্ব উপেক্ষা এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের দৃষ্টান্ত। সেই সাথে জাতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থি এবং শিশুদের জন্য নিপীড়নমূলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও শিক্ষার ব্যয়ভার যারা ৫০% বহন করতে পারবে তাদের রেজাল্ট খারাপ হলেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়- এই শিক্ষানীতিতে। মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার পঞ্চাশ ভাগ ব্যয় শিক্ষার্থীর পরিবারকে বহন করতে হতো। ফলে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা। ছাত্ররা এ নীতির ব্যাপক বিরোধিতা করেন। ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা দিবসে এ শিক্ষানীতি বাতিল করার পক্ষে ছাত্র সংগঠনগুলো একমত হয়। ১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গণসাক্ষরতা অভিযান চলে। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মজিদ খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়। এ সংগ্রামকে প্রতিরোধ করতে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেপ্তার করলে ছাত্ররা আরো ফুঁসে ওঠেন। তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। এবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি হাতে নেয়। দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। কে জানত বসন্তের আগুনরাঙা রঙের সঙ্গে মিশে যাবে ছাত্রদের রক্ত। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ওই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সচিবালয়ে স্মারকলিপি দেয়ার শিক্ষার্থীদের পূর্বঘোষিত একটি কর্মসূচি। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি ও গণমুখী, বৈজ্ঞানিক, অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে। এদিন সামরিক স্বৈরাচারের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান প্রণীত গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল, ছাত্রবন্দিদের মুক্তি ও দমননীতি বন্ধ এবং গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর গগনবিদারী শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে রাজপথ। আর শান্তিপূর্ণ সে দিনের প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালীসহ অন্তত ১০ জন। সরকারি হিসাবে গ্রেপ্তার হয় ১ হাজার ৩১০ জন। এই হত্যাকাণ্ডের খবর মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। ফাগুনের স্নিগ্ধ প্রকৃতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সেই মিছিলে গুলি, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, রায়ট ভ্যানের গরম জলে উত্তপ্ত হয় আকাশ বাতাস। ’৫২ পর আবারও বসন্তের রক্তপলাশ দ্বিগুণ রক্তাক্ত হল শহীদের তাজা খুনে। মূলত ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’-এর পথ বেয়েই ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতন ঘটে, সুগম হয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বৈষম্য ও অরাজকতা চলছে তা মোকাবিলায় জোরদার আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। আজ তাই, ১৪ ফেব্রুয়ারি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, অনেক বেশি গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। সংগ্রামের জন্য অনুপ্রেরণার কিংবা দৃষ্টান্তের প্রয়োজন হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি তেমনই একটি দৃষ্টান্ত যা আমাদেরকে ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি যোগায়। তাই ছাত্র আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে পুনর্জীবিত করা সময়ের দাবি, ইতিহাসের দায়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..