অস্থিতিশীল মালদ্বীপ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে চলছে চরম রাজনৈতিক সংকট। সর্বশেষ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মালদ্বীপের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে। বৈঠকের পর কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া না হলেও সেখানে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানায়, মালদ্বীপে এখনও সংঘাতের খবর পাওয়া না গেলেও জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেঙ্কা সেখানকার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ দিকে মোড় নিতে পারে’ বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর আগে পার্লামেন্ট ভবনের দখলে নিয়ে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে দেশটির সেনাবাহিনী। পার্লামেন্ট ভবন সিলগালা করার পর একই সঙ্গে দেশটির বিরোধীদলীয় দুই সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। আর আদালত অবমাননার দায়ে অভিশংসন হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিন প্রতি। বিরোধী দলীয় নেতার বিরুদ্ধে সরকারের আনা সন্ত্রাসের অভিযোগ নাকচ করে সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রত্যাখ্যান করায় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট। মূলত সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে কেন্দ্র করে দেশটিতে গভীর রাজনৈতিক সংকট চলছে। ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের দেয়া এক আদেশ বাস্তবায়নে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ এনে তার পদত্যাগের দাবিতে সংসদ সচিবালয়ে পিটিশন দিয়েছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। সর্বোচ্চ আদালত প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের অভিশংসনে প্রচেষ্টা নিয়েছে বলে আশঙ্কা করে রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনিল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে মালদ্বীপ। সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দেশটির সেনাবাহিনী ও পুলিশের প্রধান। অনিল জানান, সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের আদেশ জারি করতে পারেন বলে আমরা খবর পেয়েছি। আমি সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানিয়েছি, এ ধরনের একটি অবৈধ আদেশ মানা উচিত হবে না তাদের।’ ঘটনার তিন দিন আগে সুপ্রিম কোর্ট বিরোধীদলীয় ওই ৯ নেতার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তাদের মুক্তির নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। বিরোধীদলীয় ওই নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মালদ্বীপে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহামেদ নাশিদ। মুক্তির নির্দেশ দেয়া আরো একজন বিরোধী নেতা এখন নির্বাসনে রয়েছেন। বাকি সাতজনকে রাখা হয়েছে মালদ্বীপের সবচেয়ে বড় জেলখানায়। সেনাবাহিনীর প্রধান আহমেদ শিয়াম বলেছেন, মালদ্বীপ সংকটে পড়বে আর তা দেখে বসে থাকবে না নিরাপত্তা বাহিনী। তিনি বলেন, ‘আমরা অ্যাটর্নি জেনারেলের বৈধ আদেশ অনুসরণ করব এবং বেআইনি কোনো নির্দেশ মানতে বাধ্য হব না।’ পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় নেতা ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ এমপিদের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি অতিদ্রুত তাদেরকে মুক্তি দেয়ার জন্য পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আর সুপ্রিম কোর্টের আদেশ মেনে বিরোধীদলের নেতাদের মুক্তি না দেওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ পদত্যাগ করেছেন মালদ্বীপের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুসাইন রশিদ। ইয়ামিন প্রশাসনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী রশিদই প্রথম যিনি সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানালেন। রশিদ তার পদত্যাগপত্রে লেখেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ সরকার যেভাবে অমান্য করছে সেটি মুখ বুঝে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।’ প্রতিক্রিয়া হিসেবে উত্তেজনার মধ্যে মালদ্বীপে ১৫ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিন। ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এই জরুরি অবস্থা কার্যকর হয়। জরুরি অবস্থা জারির পর দেশটির প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ সাঈদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আর এই ঘটনার পর পরই নিজের অভিশংসন ঠেকাতে বিশ্বের দেশে দেশে দ্বারস্থ হতে থাকেন বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম। বিভিন্ন দেশে শুরু করেন দুতিয়ালি। শুধু মাত্র ভারত ছাড়া চীন, সৌদি আরব ও পাকিস্তান ও বিভিন্ন বন্ধুদেশে দূত পাঠাচ্ছেন তিনি। শ্রীলঙ্কায় নির্বাসিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চাওয়ার পর ভারত দৃশ্যত প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের বিরুদ্ধে পরোক্ষ অবস্থান নেয়। যার ফলে ভারত বাদে সম্ভাব্য সব দেশেই নিজের মসনদ বাঁচাতে দুতিয়ালি করছেন ইয়ামিন। মালদ্বীপের এই সংকটময় মুহূর্তে নাশিদের মত বিশ্ববাসী তাকিয়ে ছিল ভারতের পদক্ষেপের দিকে। কারণ এর আগেও ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও অভ্যুত্থান রুখে দিয়েছিল ভারত। কোনোরকমে উদ্ধার করা হয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা গাইয়ুমকে। তাই আশাবাদী হয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে ভারতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মহম্মদ নাশিদ। আর মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত ভারত সেখানে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের বিষয়ে উদ্বিগ্ন বার্তা প্রেরণ করেছেন। যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রুখতে দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠানো হতে পারে মালদ্বীপে। সেই জন্য আর্মি-নেভি ও এয়ারফোর্সকে তৈরি থাকতে বলা হয়েছে। মালদ্বীপ সংলগ্ন ভারত মহাসাগরে অবস্থানকারী নৌ সেনার যুদ্ধ জাহাজেও পাঠানো হয়েছে বার্তা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে আলোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে। মালদ্বীপ বিষয়ে ফোনালাপে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুজনই। যা নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউজের বিবৃতি। এদিকে ভারতে শম্ভুকগতি পদক্ষেপের বিপরীতে খোলাখুলি কঠোর হয়ে মাঠে নেমেছে চীন। সেনা পাঠালে মালদ্বীপের পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে বলে জানিয়েছে তারা। ভারতের নাম না নিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন ‘এটা ওদের ঘরোয়া সঙ্কট। তাই সেনা পাঠিয়ে জটিলতা বাড়ানো অর্থহীন। বরং মালদ্বীপের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করাটাই এখন সব চেয়ে জরুরি।’ চীন মালদ্বীপের সমস্যা বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় ওরা নিজেরাই সমস্যা মিটিয়ে ফেলবে বলে আশাবাদী। বাইরের কারও এতে নাক গলানোর দরকার নেই। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন ক্ষমতা গ্রহণের পরই চীনের সাথে যোগাযোগ তৈরি করেন। চীনা প্রকল্প বাস্তবায়নসহ চীনের ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’তেও সম্মত হন তিনি। এদিকে আভ্যন্তরীণ সংকট আর চীন-ভারতের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যেই সেখানে পৌঁছেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল। যদিও মূলত প্রতিনিধিরা বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করে মালদ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা শুনেছেন। আর ৮ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের ক্ষমতাসীন দল ‘প্রগ্রেসিভ পার্টি অব মালদ্বীপস’ নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে তাদের। বিস্তারিত জানা যায়নি কোনো বৈঠকেরই। ৭ তারিখে দেশটির জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার আহ্বানের পরদিনই এই সফর করল ইইউ। ইইউ তাদের বিবৃতিতে বলে ‘জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণে মালদ্বীপের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং দেশটিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে।’ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার জেইদ রাদ আল হুসেইনও মালদ্বীপে জরুরি অবস্থাকে ‘গণতন্ত্রের ওপর পুরোদস্তুর আক্রমণ’ বলে বর্ণনা করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস এরই মধ্যে মালদ্বীপ সরকারের কাছে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..