দুই রাজাকারের ফাঁসি, তিনজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচ রাজাকারের মধ্যে দুজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ, বাকি তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ১০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্যে নেছার আলী ও ওজায়ের আহমেদ চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আর শামসুল আলম চৌধুরী, মোবারক ও ইউনুছকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ইউনুস আহমেদ ও ওজায়ের আহমেদ চৌধুরী কারাগারে আছেন। বাকিরা পলাতক। দণ্ডিত পাঁচ রাজাকারের সবাই মোটামুটি বয়স্ক। তাদেরকে দণ্ড প্রদানের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, বৃদ্ধ বয়স দণ্ড কমানোর ক্ষেত্রে কোনো কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। রায় ঘোষণার পর আদালতের পর্যবেক্ষণ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ। তিনি বলেন, ‘রায় ঘোষণার সময় আদালত দুটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধীদের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাত্তরের ইতিহাস জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে উঠে আসে। দ্বিতীয়ত, দুটি ট্রাইব্যুনালে যখন মানবতাবিরোধীদের বিচার চলত তখন আসামিদের বয়স বিবেচনা নিয়ে কিছু মতভেদ ছিল। তবে মানবতাবিরোধীদের অপরাধ এতটাই ঘৃণ্য যে বিচারের ক্ষেত্রে আসামির বৃদ্ধ বয়স দণ্ড কমানোর কারণ হতে পারে না।’ এই পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে এক নম্বর অভিযোগে পাঁচজনকেই আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দুই নম্বর অভিযোগে নেসার, ইউনুস ও উজেরকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিন নম্বর অভিযোগে উজের ও নেছারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ইউনুসকে খালাস দেওয়া হয়েছে। চার নম্বর অভিযোগে পাঁচজনকেই আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাঁচ নম্বর অভিযোগে উজের ও নেছারকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার শামসুল হোসেন তরফদারসহ পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১৬ সালের ২৬ মে এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। গত বছরের ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে ওই দিন বিকেলেই রাজনগর উপজেলার গয়াসপুর গ্রামের ওজায়ের আহমেদ চৌধুরীকে মৌলভীবাজার শহরের চৌমোহনা থেকে ও সোনাটিকি গ্রামের মৌলভি ইউনুস আহমেদকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ২০ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আজহার-কায়সার-সুবহানের আপিল তালিকায়: মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আনা এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সৈয়দ মো. কায়সার ও মাওলানা আবদুস সুবহানের আপিল মামলা শুনানির জন্য ১০ জানুয়ারি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ বেঞ্চে ওই দিন শুনানির জন্য মামলার কার্যকালিকায় জামায়াত নেতা আজহারের আপিল মামলা ৩৪ নম্বর ক্রমিকে ও সুবহানের মামলা ৩৬ নম্বর এবং জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী কায়সারের আপিল মামলা ৩৫ নম্বর ক্রমিকে রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদেরকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে এ টি এম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণা করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাজাকার কমান্ডার ও শান্তি কমিটির সদস্য সৈয়দ মো. কায়সারকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ এবং ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পাবনা জেলায় শান্তি কমিটির নেতা সুবহানকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন ট্রাইব্যুনাল। আইন অনুযায়ী, সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত এই তিন আসামিই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালে এর পর্যন্ত ৩১ মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আনা আপিল ও আপিল রায়ের রিভিউতে সাতটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি রায়ের পর জামায়াতের প্রাক্তন আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, প্রাক্তন দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, জামায়াতের প্রাক্তন নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিল ও আপিল রায়ের রিভিউতেও জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর আগে ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দিয়েছিলেন। আরো বেশকটি মামলা আপিলে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..