পাবলিক পরীক্ষা সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাবনা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শ্যামল কুমার সরকার : দেশের পাবলিক পরীক্ষাসমূহ বিশেষ করে এসএসসি, এইচএসসি, এইচএসসি (বিএম) ও সমমানের পরীক্ষা নিয়ে প্রতিবছর শিক্ষাবোর্ড সমূহকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। অবশ্য এসব তাদের রুটিন দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। পাবলিক পরীক্ষাসমূহ ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত হলেও এসব পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও পরীক্ষক/প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রীতিমতো তুঘলকী কাণ্ড ঘটে চলেছে। বিষয়টি বোর্ড কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। তবুও কেন এসব ঘটছে সেটিই রহস্য। বোর্ডসমূহের পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একসময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক ফলাফল বিবেচনা করা হতো। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কাগুজে নিয়ম থাকলেও বাস্তবায়ন তেমন নেই। দেখা যায়, আজ শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে কালই বোর্ডের পরীক্ষক হওয়া যাচ্ছে। আর বোর্ডের পরীক্ষক হওয়া মানেই উক্ত শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক বাজার দর বেড়ে যাওয়া। এ কারণেই নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে অনেককে নিজস্ব সাইনবোর্ডে বোর্ডের পরীক্ষক/প্রধান পরীক্ষকের পরিচিতি ব্যবহার করতে দেখা যায়। অনেকটা বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ডের মতো। যদিও বিধি মোতাবেক পরীক্ষক/প্রধান পরীক্ষকের পরিচিতি সম্পূর্ণ গোপন রাখার কথা। কিন্তু কে শোনে ধর্মের কাহিনি! চারপাশের প্রায় সবাই ‘টু পাইস’ কামাতে মরিয়া। সেখানে বাড়তি তকমা লাগিয়ে শিক্ষকরা কিছু বাড়তি রোজগারের সুযোগ পেলে দোষের কী! এতে অনেক শিক্ষার্থী-অভিভাবক আলোর পাশের পোকার মতো আকৃষ্ট হন। গৃহ শিক্ষকের রেট দেড়গুণ বা দ্বিগুণ হয়ে যায়! এসবের পেছনে বোর্ডের কোনো দায় আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। আবার উত্তরপত্র মূল্যায়নের যে সময় বেঁধে দেয়া হয় তা রীতিমতো আতঙ্কজনক ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীর জন্য মৃত্যুফাঁদ! কলেজ পর্যায়ের আবশ্যিক বিষয় বাংলা ও ইংরেজির ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে ৪৫০-৫০০টি উত্তরপত্র প্রদান করা হয় এবং জমাদানের সময় দেয়া হয় মাত্র ২১/২২ দিন। অন্যান্য বিষয়ের অবস্থা প্রায় একই। কী করে সম্ভব যথাযথভাবে এতো অল্প সময়ে এতোগুলো উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা? বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও ডেপুটেশনে থাকা বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক। তবুও কেমন করে এমন আজব ঘটনা ঘটে তা বোধোগম্য নয়। ভাগ্যদেবী কৃপা করলে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে ১০০/২০০ টি উত্তরপত্র বেশিও পাওয়া যায়। ফলে কী হয়? অভিজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দের অনেকেই পুত্র-কন্যা-বউ-ভাবি-শ্যাকল-শ্যালিকা হতে শুরু করে নিজের শিক্ষার্থীদেরও উত্তরপত্র মূল্যায়নের সহকারী হিসেবে নিয়োগ করেন। ব্যতিক্রম নগন্য এবং অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। এরা মূলত মূল্যায়িত উত্তরপত্রের নম্বর যোগ, কভার পেজে নম্বর বসানো ও বৃত্ত ভরাট করে থাকেন। এসব অদক্ষ কর্মীর কাজের ফল হিসেবে উত্তরপত্রের কভার পেজে প্রচুর ভুল থেকে যায়। আর দুর্ভোগে পড়তে হয় ফলাফল প্রকাশের পর হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে। এর প্রমাণ প্রতি বছর শিক্ষাবোর্ডসমূহে হাজার হাজার উত্তরপত্রের পুনঃনিরীক্ষার আবেদন। বিষয়টি কি মোটেও কাম্য? পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট বোর্ডসমূহেই কি এর জন্য দায়ী করা যায় না? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি এ ব্যাপারে দায় নেই? কেন এতো তড়িঘড়ি করে রেজাল্ট দিতে হবে? আর একটু সময় নিলে সমস্যাটা কোথায়? ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের সাথে পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ণকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। দেশের প্রান্তিক জনপদ থেকে শুরু করে বড়-ছোট শহর ও বিভিন্ন নগরের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর দীর্ঘ দিনের সাধনার দলিল তাদের উত্তরপত্র। এর সাথে জড়িয়ে আছে স্বচ্ছল-অস্বচ্ছল অভিভাবকদের স্বপ্ন! কাজেই উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে কোনোভাবেই ছেলেখেলা মেনে নেয়া যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, অনেক মহাঅভিজ্ঞ শিক্ষক স্টাফ রুমে কলিগদের সাথে রসালো গল্প করতে করতে এবং টিভি দেখতে দেখতেও পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন! এর চেয়ে অন্যায় ও সর্বনাশা কাজ আর কী হতে পারে? এ জন্য বোর্ডের বেঁধে দেয়া সময়কে দায়ী করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অনৈতিকতার দণ্ড হতে মুক্তি পেতে পারেন না। এটা নিঃসন্দেহে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ! এ ব্যাপারে পরীক্ষকদের নিজস্ব বিবেকের কোর্ট চালু রাখা দরকার। উত্তরপত্র মূল্যায়নের পারিশ্রমিকের গল্প আরো বেদনার। প্রতি বছরের উত্তরপত্র মূল্যায়নের অপ্রতুল ও অমর্যাদাকর পারিশ্রমিক শিক্ষকরা পেয়ে থাকেন পরবর্তী বছরের পাবলিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরে। ফলে প্রতি বছরই অনেক পরীক্ষক পারিশ্রমিক না পেয়েই না ফেরার দেশে চলে যান! ডেথ ও ওয়ারিশান সনদ নিয়ে বোর্ডের বারান্দায় ঘুরতে হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের স্ত্রী-সন্তানদের। এ কেমন অমানবিকতা? এ ব্যাপারে বোর্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো- হিসাব-নিকাশ করতে এতটুকু সময় লেগেই যায়। এই কি শিক্ষাবোর্ডসমূহের ডিজিটালাইজেশনের নমুনা? নাকি শিক্ষকদের সঙ্গে নিছক তামাশা? অথচ অনেকবার বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- ৩ মাসের মধ্যেই শিক্ষকরা পারিশ্রমিক পেয়ে যাবেন। বোর্ড কর্তৃপক্ষ বরাবরই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে যাচ্ছে। তবুও শিক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হয়। এটি তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব ও শিক্ষকতা পেশার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষকরা তাঁদের দায়িত্ব পালনও করে যাচ্ছেন। তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের রোগে আক্রান্ত শিক্ষকবৃন্দ ছাড়াও ক্ষোভে-দুঃখে ও নীরব প্রতিবাদে এক শ্রেণির শিক্ষক শিক্ষাবোর্ডসমূহকে গুডবাই জানিয়েছেন। যা মোটেও কাম্য নয়। চলমান এ বাস্তবতার কথা সচেতন দেশবাসীর মোটামুটি জানাই। কিন্তু এভাবেই কি চলবে? দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীদের প্রতি সুবিচার করতে এবং শিক্ষার মান বাড়াতে পরীক্ষক নিয়োগ, উত্তরপত্র প্রদান, উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময়সীমা ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে নতুনভাবে ভাবা দরকার। এক্ষেত্রে শিক্ষকতার নির্ধারিত অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া পরীক্ষক নিয়োগের বিরাজমান অবস্থা এখনই বন্ধ করা দরকার। উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময়সীমা যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করাসহ মূল্যায়ন ফি অবিলম্বে বৃদ্ধি করাও সময়ের দাবি। পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার আগেই উত্তরপত্র মূল্যায়নের পারিশ্রমিক প্রদান ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের উপর নির্বাচিত পরীক্ষকদের কমপক্ষে তিন দিনের প্রশিক্ষণের (জীবনে একবার হলেও) ব্যবস্থা করলে সুফল পাওয়া যাবে। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকবৃন্দকে পরীক্ষক/প্রধান পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। পরীক্ষকদের ডেপুটেশন নিয়ে জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভবনে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। কারণ এতে শিক্ষকরা রকমারি চিন্তা ও কাজের বাইরে থেকে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচারের হার কমবে। মূল্যায়নের যথার্থতা বাড়বে। যে কোনো মূল্যে পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিরাজমান দুরাবস্থা থেকে অবিলম্বে বেড়িয়ে আসা দরকার। শিক্ষায় বাজেট বরাদ্ধ বৃদ্ধি এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলেই শিক্ষা সংশ্লিষ্টজনদের ধারণা। শিক্ষা ও শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মহান স্বাধীনতা অর্জনের ৪৪ বছরেও আমরা তা বুঝেছি বলে মনে হয় না। আবার শিক্ষকদেরও শিক্ষাদানকে কেবল পেশা হিসেবে বিবেচনা না করে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, ঝিটকা খাজা রহমত আলী ডিগ্রী কলেজ, মানিকগঞ্জ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..