হাওরের বিপন্নতা : এখনো দৃশ্যমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শরিফুজ্জামান শরিফ : হাওরের মানুষ ইতিহাসের সংকটকাল অতিক্রম করছে। গত বছরে অসময়ে পাহাড়ি ঢল অন্যান্য সময়ের চেয়ে এবার তাদের নিঃস্ব করেছে। এবারে ফসলহানির ভয়াবহতা ও প্রতিক্রিয়া অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সেটা আমরা আগেই জেনেছি। বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের মানুষ জীবিকার জন্য বিশেষত ধান ও মাছের উপর নির্ভর করে। গত বছরের বিপর্যয়ের পরে হাওরবাসীর সেই সংকট মোকাবিলায় তাদের পাশে থাকার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল সেটা রক্ষা করা হয় নি, হাওরবাসী এই সংকট থেকে তাদের বাচাবার জন্য যে সহায়তা চেয়েছিল সেটা তারা পায় নি। তারা ধান ফলায়- সেই ধান তারা যেমন নিজেদের জন্য রাখে আবার আমাদের খাদ্য ভাণ্ডারে যুক্ত করে। আমাদের বার্ষিক চালের চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ টনের একটু কম বা বেশি। এর মধ্যে হাওর থেকে আসে ২৫-৩০ হাজার টন। মোট চাহিদার তুলনায় এটা খুব বেশি না হলেও সংকট সৃষ্টি হলে এই পরিমাণ সরবরাহের ভূমিকা আছে। হাওরের ধান উৎপাদন ও অকাল বন্যা পরস্পরের প্রতিপক্ষ। ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হাওরবাসী প্রায় আট বার বন্যার কারণে ধান ঘরে তুলতে পারেনি। এই বন্যার কারণ পাহাড় থেকে নেমে আসে পানির সৃষ্ট অকাল বন্যা। এই বন্যা প্রতিরোধে দরকার টেকসই বাঁধ কিংবা নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে নদী খনন। দ্বিতীয়টা একটু জটিল ও বিপুল অর্থের বিষয় হলেও প্রথম কাজটি অনেকটা সহজ। প্রতিবছর এটা করতে হয়। কোনো বছর বাঁধ না দিলে বিপর্যয় নেমে আসে। ঠিক যেমনটি গত বছর এসেছিল। এই ধরনের বিপর্যয়ের পরে মানুষ আর্থিক সহায়তা চায়। কিন্তু হাওরবাসী নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে, নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে সঙ্কট মোকাবিলা করতে নীতিগত সহায়তা চাইলেও সেটা করা যায় নি। আমরা দেখেছি, গত বছর অকালে ও অবহেলাজনিত দুর্যোগের শিকার হয়ে হাওরের ধানের পাশাপাশি মাছেও মরক লাগে। বন্যা পরবর্তী মানুষের প্রধান চাহিদা ছিল হাওরে অবাধে মাছ ধরতে দেবার অধিকার, এতে তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেরা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পেতো। নানা হিসেবে দেখা গেছে, হাওরের জলমহালগুলো উন্মুক্ত করে দিলে তার মাধ্যমে তারা তাদের কিছু ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারতো। হাওরের সাধারণ মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সরকারি নীতি কাগজে কলমে বহাল থাকলেও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের অভাবে হাওরে মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার অধিকার দেয়া হয়নি। সরকারি নীতি হাওরের দরিদ্র মৎস্যজীবীদের চেয়ে সেখানের দলীয় নেতা-কর্মীদের পক্ষে গেছে। হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক জেলে হামলা-নিগ্রহের শিকার হয়েছেন- হচ্ছেন। অথচ এই মাছ ধরার অধিকার আইনত তাদেরই। এই মুহূর্তে হাওরের মানুষ নিদারুণ খাদ্য সংকট মোকাবিলা করছে। অনেক অবস্থাপন্ন পরিবারও দিনে দু’বেলা খাবার এর ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে। আবার সম্প্রতি চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তাদের নতুন সংকটে ফেলেছে। আমরা অনেকে জানি, বছরে দু’বার অর্থাৎ কার্ত্তিক ও চৈত্র মাসে হাওরের মানুষ তীব্র খাদ্য সংকট মোকাবিলা করে। আমরা আশঙ্কা করছি, এবারের ব্যাপক ফসলহানি আসছে চৈত্রে সেই সংকট আরো বাড়িয়ে দেবে। হাওরের খাদ্য সংকট নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত সেখানের যে খবর পাচ্ছি তা ভয়াবহ। একদিকে ঘরে খাবার নেই- সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষার বালাই নেই- অন্যদিকে হাওরবাসীর হাতে এখন কোনো কাজ নেই, কী খেয়ে বাঁচবে তার নিশ্চয়তা নেই। অনেকে গ্রাম ছেড়ে কাজের খোঁজে শহরে ছুটছে। গত এপ্রিল মাসে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে কেবল সুনামগঞ্জ এর ১৫৪টি হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জেলার ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০টি কৃষক পরিবার। হাওরের সাত জেলা মিলিয়ে এর সংখ্যা ৬-৭ লাখ পরিবার ছাড়িয়ে যাবে। আমরা জানি, আগেই সরকার থেকে বন্যা পরবর্তী যে প্রতিশ্রুতি ছিল- তাদের জন্য যে বরাদ্দ ছিল তার সবই ছিল প্রয়োজনের চেয়ে কম। আবার খোলা বাজারে চাল বিক্রির যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক কেন্দ্র ছিল না। ওজনে কম দেয়ার মতো ঘটনাও আমরা জানি। সম্প্রতি জানতে পেরেছি, ভিজিএফ কার্যক্রম অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ওএমএস কার্যক্রম গতি হারিয়েছে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ায় তার অনিবার্য প্রভাব পড়ছে হাওরবাসীর জীবনে। হাওরের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। কৃষি ব্যবস্থার সাথে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যুক্ত আর তা হলো হাওরের বাঁধ ব্যবস্থাপনা। বাঁধ ঠিকমতো নির্মিত না হলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় সেটা আমরা কয়েক মাস আগে দেখেছি। গত বছর পর্যন্ত ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ ঠিকাদার এবং পিআইসি দিয়ে করানো হতো। গত বছরের বিপর্যয়ের পরে গত সেপ্টেম্বর মাসে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বাঁধের কাজের নতুন নীতিমালা করে। বাদ দেয়া হয় ঠিকাদারি প্রথা। এবার সব কাজ করবে সুবিধাভোগী ও কৃষকদের নিয়ে গঠিত পিআইসি। এবারই বাঁধের কাজে সরাসরি যুক্ত হয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। গঠন করা হয়েছে জেলা ও উপজেলা কমিটি। জেলা প্রশাসক জেলা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপজেলা কমিটির প্রধান। পিআইসি গঠন করবে উপজেলা কমিটি। তারা জেলা কমিটিতে পাঠিয়ে পিআইসি অনুমোদন করে নেবে। একটি পিআইসি একটি প্রকল্পের কাজ করবে। এই পি আইসি গঠনে আগে সংসদ সদস্যদের দেয়া তালিকা অনুসরণ করতে হতো, এবার সেটা বাদ দেয়া হয়েছে। যেটা নতুন নীতিমালার ভালো দিক। কিন্তু জানা গেছে সংসদ সদস্যরা সেটা মানতে পারছেন না। তারা তাদের লোক কমিটিতে রাখতে চাপ দিচ্ছেন। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা ছিল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সেই ক্ষমতা জেলা প্রশাসনকে দেয়া হয়েছে; যদিও অনেক দেরিতে। মন্ত্রণালয় থেকে গত সপ্তাহে এক চিঠিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তার আগেই হাওরের কয়েকটি জেলা কমিটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সেগুলো এখন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়ে ফিরবে, নাকি অনুমোদনের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আসবে তা স্পষ্ট নয় । অন্যান্য বছর ডিসেম্বরের শুরু থেকেই হাওরে বোরো আবাদ শুরু হয়ে যায়। এবার হাওর থেকে পানি নামছে ধীরে। এখনো অনেক হাওরে পানি থাকায় কৃষকেরা নামতে পারছেন না। বাঁধের কাজ সময়মতো শুরু না হওয়ার বিষয়টিও তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। কষ্ট করে ধান রোপণের পর আবার গত এপ্রিলের মতো সেই ধান হারাতে না হয়, এই শঙ্কা রয়েছে মনে। হাওরের কৃষক সাধারণত নভেম্বর মাসের শেষ দিকে আবাদ শুরু করেন, কিন্তু এবার সেটা পারছেন না। দেরিতে পানি নামার কারণে বোরো আবাদ ২০-২৫ দিন পিছিয়ে গেছে। জানুয়ারির ৫ তারিখ পর্যন্ত কেবল সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের ১৭ টি হাওরের পানি নামেনি। অথচ হাওরের বোরো ধানের জন্য প্রতিটি দিন অনেক মূল্যবান। এবার সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিটি কৃষক পরিবারকে পাঁচ কেজি বীজ ধান দিচ্ছে, সার দিচ্ছে। উদ্যোগ ভাল, তবে এটা দিয়ে হাওরবাসীর বীজের পুরো চাহিদা মিটবে না। আবাদে দেরি হবার প্রধান কারণ হাওরের পানি নামছে না। অনেক হাওরের চেয়ে সংযুক্ত নদীর গভীরতা কমে গেছে। হাওরের জন্য এখন জরুরি হল নদী খনন করা। সরকার দু-একটি প্রকল্প নিয়েছে, কিন্তু তার ফলাফল কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। কেননা এই ধরনের প্রকল্প অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থের নয়- ছয় হয়ে থাকে। দেরি হয়েছে বাঁধ তৈরির কাজ। এবারও হয়তো দ্রুত বাঁধ শেষ করার তাগিদ থাকবে, কিন্তু তাতে টেকসই বাঁধ কি আমরা পাবো? যে বাঁধ উজানের ঢল মোকাবিলা করে হাওরবাসীর সোনালী ধান রক্ষা করবে? আমাদের এখন জোর দাবি জানাতে হবে- গত বছর যাদের কারণে বিপর্যয় ঘটেছে তাদের বিচার নিশ্চিত করা, হাওরের নদী খননে, বাঁধের কাজ যখনই শুরু হোক- টেকসই বাঁধের জন্য, সরকারের যে ভিজিএফ কার্যক্রম চলছে তার যেন ছেদ না পড়ে, খোলা বাজারে চাল বিক্রি হাওরবাসী যতদিন চাইবে ততদিন চালু রাখা, কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ ও হাওরে অবাধে মাছ ধরার অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার। লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..