অরণ্য জনপদ : কুরঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জিতে একদিন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আহমদ সিরাজ : বিশেষজ্ঞদের বার্তা থেকে আমাদের জলবায়ুর পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাব মানবজাতির জন্য শঙ্কা ও আশঙ্কা দুটোই তৈরি করছে। এর বাইরে যে বাংলাদেশও নয়, তা মাথায় রেখেও আমাদের বলতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশে ষড়ঋতুর স্বভাব-প্রভাব নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এখনও গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত আস্বাদনে কিশোর-কিশোরী যুবা-তরুণ, নারী-পুরুষ ও দেশের এলিট বিদ্বানদের একটি অংশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ এলাকায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো কমেনি। উপজেলা হিসেবে কমলগঞ্জ প্রায় তিন দিক ভারত সীমান্ত ঘেঁষা, অনেকটা কৌণিক দূরত্বে অবস্থিত। সমতল, অসমতল, বাঙালি জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত, অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠি বেষ্টিত ভাষা ও সংস্কৃতির এক অপরূপ জায়গা হিসেবে এই এলাকার খবর দেশের ভেতর ও বাইরের মানুষ বেশ জানে। ব্যাখ্যা নিঃপ্রয়োজন। অনেকটা নিজ ঘরে নিখোঁজের মত পড়ে থাকলেও একজন আহমদ সিরাজ, আদমপুরের আলতাফ মাহমুদ, বাবুল মাস্টার, ইসলামপুরের গোলের হাওরের কলেজছাত্র নাজমুল হোসেন, কুরমাবাজারের রূপক দাসদের নিশানা করেছি ঘুরে বেড়ানোর হিসাবে কমলগঞ্জের সীমানা ঘেঁষা দূরবর্তী অঞ্চল কুরমা খাসিয়া কুরঞ্জি পুঞ্জিতে। যথারীতি ২০১৭ এর ৮ ডিসেম্বর, সকাল নয়টার দিকে কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে সিএনজিতে চড়ে তিলকপুর গ্রামের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বাসভবনের পাশ দিয়ে আদমপুর, নৈনারপাড়বাজার হয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ এসে মধ্যভাগে বাবুল মাস্টারের মটর সাইকেলে চড়ে ইসলামপুরের গোলের হাওরের দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি- ডানে ও বামে সারি সারি ধানি মাঠ যেন ধানেশ্রী রাগিণীর সুর তুলেছে। গোলেরহাওর বাজার থেকে নাজমুল সঙ্গী হয়েছে, তখন প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পার হয়ে এসেছি। পথে পথে শীতার্ত গ্রামীণ বাজারগুলোতে বিশেষত: চায়ের স্টলগুলোতে গ্রামের মানুষের চা পানের আসরে জমজমাট আড্ডায় কত কত কথার যেন ডালা খুলেছে, তা বুঝে নেয়া যায়। তখন আমরা দুটি মটর সাইকেল নিয়ে গোলেরহাওর থেকে পূব দিকে ৩ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে কুরমাবাজারে গিয়ে একজন যুবক রূপক দাসকে সঙ্গী করেছি। বলা চলে আমাদের কাক্সিক্ষত অভিযান খাসিয়াদের কুরঞ্জি পুঞ্জির দিকে। আঁকাবাঁকা পথে আমাদের দু’টি মোটর সাইকেল পাহাড়ি কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে চলছে। এখানে আবার কুরমা বাগানের ফাড়ি অংশে চা শ্রকিদের অবস্থান, এই অংশের রাস্তা ভাল নয়। চালক দক্ষ না হলে গন্তব্যে পৌঁছা সহজ নয়। কুরমার দিকে নিশানা ঠিক করার পথে কালের সাক্ষীর মত একটা বিরাট বটবৃক্ষ পাওয়া যায়। সাইকেল চলেও চলেও না- উঁচু নিচু রাস্তা খানাখন্দকে ভরা- রাস্তা থেকে কখনো হেঁটে, কখনো সাইকেলে চড়ে প্রায় ১ কিলোমিটার রাস্তা এভাবেই পেরুতে হয়। কুরুঞ্জি খাসি টিলায় প্রবেশের মুখে ছোট একটা ভাঙা বাঁশের কালভার্ট পাওয়া যায়। ওখানেই রাস্তায় সাইকলে রেখে একটু এগুতেই আরেকটি ২৫/৩০ ফুট লম্বা বাঁশের সাঁকো পাওয়া যায়। নড়বড়ে এই সাঁকোর নিচ দিয়ে প্রবাহিত ছড়াটির নাম ‘‘গরমছড়া’’। আমরা সাঁকো পেরুতে পেরুতে দেখি কিছু খাসিয়া নারী ঘরের বাসনাদি নিয়ে ছড়ার কিনারে বসে ধোয়ামোছা করছে। আমরা পায়ে পায়ে খাসিয়া পুঞ্জির সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে তাদের অস্থানার কাছকাছি গিয়ে উপস্থিত হই। বয়স্ক লোকদের পক্ষে এইসব কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠা সম্ভব নয়। এখানে আমরা অনেকটা অচেনা আগুন্তুক হলেও সহজেই পরিচিত হয়ে নিই নিজ নিজ পরিচয় জানানোর মধ্য দিয়ে। আমাদের দেখে বেশ কিছু খাসিয়া নারী-পুরুষ এসে জড়ো হয়েছেন। খাসিয়ারা এই কুরুঞ্জি পুঞ্জিতে কিভাবে কখন এসেছেন সঠিক তথ্য জানা না গেলেও পুঞ্জি হিসাবে পুরোনো পানপুঞ্জি। সেই পাকিস্তান আমল থেকে কিংবা তারও আগে থেকেই তাদের বসতি এখানে। খাসিয়ারা মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের আদলে গড়ে উঠা পরিবার ব্যবস্থা এখনও অটুট রেখেছে। কুরুঞ্জি পানপুঞ্জিতে ৫০ থেকে ৫৫টি পরিবার বসবাস করে। তন্মেধ্যে ৫টির মতো গারো পরিবার। তারাও মাতৃতান্ত্রিক। জনসংখ্যার হিসাবে তিনশ’র মত। এখানে জীবন ও জীবিকার উপায় হিসাবে পান পেশাই তাদের মূল পেশা। প্রতিটি পরিবারের লোকজনই পান পেশায় যুক্ত। প্রতিটি পরিবারের আওতায় তিনশত থেকে হাজারের উপরে পান গাছ আছে। পানের হিসাব কিভাবে হয় জানতে গিয়ে জানলাম, এখানে ১২টি পানে ‘১ ছলি’ হয়। ১২ ছলিতে ১ কান্তা। ২০ কান্তায় ১ কুড়ি। সিজনের সময় ১ কান্তা পানের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত হয়। ১ কুড়ি পান বিক্রি করে ১ হাজার টাকার মত পাওয়া যায়। পানের পরিচর্যা নিয়মিত করতে হয়। তাতে বেশ খরচও পড়ে। আমরা বাইরের বিবেচিত হলেও কথায় কথায় সহজ ও একাত্ম্য হয়ে উঠি। তখন আমাদের সামনে উপস্থিত হন খাসি নারী অঞ্জলী পথমি, সনি সুচিয়াং, লিলি পথমি, প্রিয়াঙ্কা সুচিয়াং, পারবিনা পালং, সবিতা সুজ্ঞ, জ্যোতি সুচিয়াং, দিলারা সুচিয়াং ও চালস সুমু প্রমুখ। তারা কথায় কথায় বেশ কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। এখানে চলাচলের ক্ষেত্রে পুঞ্জি থেকে চেরাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তা খুব খারাপ। বৃষ্টি হলে পুঞ্জি থেকে বের হওয়া যায় না। চিকিৎসায় কোনো ডাক্তার দেখানোর সুযোগ নেই। চিকিৎসার জন্য কমলগঞ্জ উপজলা সদর, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার যেতে হয়। যাতায়াতে কমলগঞ্জ সদরই কেবল দুই আড়াইশ টাকা খরচ হয়ে যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় মিশনে পড়ালেখা করতে হয় খাসিয়া ছেলেমেয়েদের। দুর্গম পাহাড়ি পথ পারি দিয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে হলে পদ্মা মেমোরিয়েল উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এখানে পল্লী বিদুৎ নেই। নিজ খরচে মাসিক হাজার টাকা কিস্তিতে সৌর বিদুৎ ব্যবহার করতে হয়। বিশুদ্ধ পানীয় জলের সমস্যা, কুয়োর পানি তুলে খাওয়াদাওয়াসহ যাবতীয় কাজ করতে হয়। এজন্য কুয়োর পানি পেতে হলে পানি কাঁধে বহনের জন্য মজুরের দাম ১০ টাকা হারে দিতে হয়। এভাবে খাসিয়াদের ঘরে ঘরে পানি নিয়ে যাওয়া হয়। উচ্চশিক্ষায় কলেজে অনার্স পড়ে একজন। দুই তিনজন স্থানীয় ছেলেমেয়ে কলেজে পড়ালেখা করে। তবে দূরত্বের কারণে ও যোগাযোগ ভালো না হওয়ায় কলেজে নিয়মিত যাতায়াত হয় না তাদের। খাসিয়া মেয়ে লিলি পথমি, সরকারি সাইকেল পেয়ে পদ্মা মেমোরিয়েল স্কুলে পড়তে যায়। তবে সাঁকোগুলো ও রাস্তা খারাপ থাকায় খুবই ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে হয়। এখানে প্রায় সবাই ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করায় নিজ ভাষা, ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। বয়স্কজন ছাড়া খাসিয়াদের ঐতিহ্য সংস্কৃতির পুরোন কাহিনি জানেনা এখনকার অনেকেই। তারা নিজেদের মধ্যে নিজ ভাষাতে ঠিকই কথা বলে। কিন্তু এখানে খ্রিষ্টান ‘ফাদার’ নিয়মিত আসেন নিশানা ঠিক রাখতে। আমরা দ্বিধা সংশয় থেকে তাদের ভাষায় তাদের কথায় তাদের সমস্যা শুনে যখন আগ্রহ দেখাই তখন তারা বলে উঠেন: অং গজই রে ইলিং থি ইসরে ইং কেং দেশীয় ইয়েং ই এম সলার কি রে ইম হা সিঙ্গ ই এম ডাক্তর কি রে অর্থাৎ আমরা খুব ভাল নেই আমাদের রাস্তা নেই আমাদের পুলগুলি নষ্ট আমাদের বিদুৎ নেই আমাদের পুঞ্জিতে ডাক্তার নেই মূল স্রোত থেকে দূরে পড়ে থাকা দুর্গম কুরুঞ্জির খাসিয়ারা জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে বসবাস করলেও তারা যেন প্রকৃতির কূলে, প্রকৃতির স্বভাব নিয়ে বেঁচে আছে। প্রকৃতিরও যে একটা হৃদয় আছে কুরুঞ্জির খাসিয়া নর-নারীর সান্নিধ্যে এসেই যেন সে বার্তা জানা গেছে। লেখক : সদস্য, সিপিবি, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..