সিপিবি না মুহিত সাহেব ‘ননসেন্স’!

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাবীব ইমন: আমাদের একজন অর্থমন্ত্রী আছেন তিনি আবুল মাল আবদুল মুহিত। কাজে বড় না হয়ে, কথায় বড় হন তিনি। মুহিত সাহেব একখান নতুন কৌতুক পয়দা করেছেন। ‘সিপিবি ননসেন্স’। অনেকদিন তিনি এ জাতীয় কৌতুক তৈরি করেন নাই। ম্যালাদিন পর তার অভিধান থেকে এইরকম শব্দ বের করে মানুষকে দিচ্ছেন বিনোদনের খোরাক। প্রশ্ন হলো, ‘ননসেন্স’ অর্থ কি? আমি গ্রামের ছেলে। অতসব বুঝি কী! মুখ্য-সুখ্য মনে করতে পারে যে কেউ। মনে করলে ভুল হবে না। মন্ত্রীদের এতো এতো জ্ঞানের কথা শুনতে শুনতে, তাদের স্বগোত্রীয় নেতাদের দাপটে আজকাল নিজেকে মনেই হয় না কোনোকালে পড়ালেখা করেছি। কোনো স্কুল-কলেজের চৌহদ্দি পার করেছি বা কিছু শিখেছি। যা শিখেছি বেমালুম ভুলে গেছি। তবে এটা বুঝি ‘ননসেন্স’ একটা ইংরেজি শব্দ। যার সেন্স নাই, তাকে ননসেন্স বলে। নাকি! আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর মুহিত সাহেব অর্থমন্ত্রী হয়েছেন। এর আগে এরশাদ শাহীর আমলে তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। তখন তিনি কী করেছেন, তা বোঝার মতোন বয়স ছিল না। তবে এটা বুঝেছি তিনি এরশাদের পদলেহন করেছেন। তিনি ছিলেন লে. জে. এরশাদের ‘মাল’। পরে আবুল যোগে হয়ে গেলেন ‘আবুল মাল’। শেখ হাসিনা তাকে আশ্রয় দিয়েছেন মন্ত্রিসভায়। সেই থেকে বেশ আছেন। কখন কি বলেন, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। এবার তিনি অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর একের পর এক ঘটনা তৈরি করেছেন। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক তথা সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিসহ দেশে বড় বড় কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে তার আমলে। দশম জাতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনে ‘বাংলাদেশ কয়েন সংশোধন বিল-২০১৫’ পাস করার আগে কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিলে সংশোধনী প্রস্তাবের জবাব দিচ্ছিলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাজারে যে পাঁচ টাকার কয়েন আছে, সেটা আমি জানতাম না, আজই প্রথম দেখলাম। সেই কয়েনে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগোও আছে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘এটা বাংলাদেশ ব্যাংক করতে পারে না। এই পাঁচ টাকা ইললিগ্যাল।’ অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকেও বাংলাদেশ ব্যাংক কবে কিভাবে পাঁচ টাকার কয়েন বাজারে ছাড়লো, সেটা জানা নেই তার। এইরকম অনেক কাণ্ড আছে তার। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ বাজেট পেশের পর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অর্থমন্ত্রীর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এখন তার বয়স ৮৪। ... হয়তো উনার বিবেচনায় আসেনি।’ ২০১০ সালে শেয়ারাবাজারে কেলেঙ্কারিতে ক্ষত তৈরি হয় দেশের অর্থনীতিতে। সে ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে বিনিয়োগকারীরা। ওই সময় লাখো বিনিয়োগকারী সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব, অনেকেই আত্মহত্যা করছেন। তখন শেয়ারবাজার নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য–‘শেয়ার মার্কেটে কোনো ইনভেস্টর নেই, সব জুয়াড়ি, ফটকাবাজ’, ‘অ্যাই অ্যাম একদম ফেডাপ...।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমি শেয়ারবাজার বুঝি না।’ আর গণমাধ্যমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে অর্থমন্ত্রী তো এমনও বলেছিলেন, ‘অল আর রাবিশ’। কিছুকাল আগে আবুল মালের এক সহমন্ত্রী তাকে এক ধরনের উচ্ছিষ্টভোগী বলে গাল দিয়েছেন। তাতে আবুল মাল বেশ মনোক্ষুণ্ন হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এই প্রথমবার ঐ মন্ত্রীকে ‘রাবিশ, স্টুপিড বা ননসেন্স’ বলে গাল দেননি। বরং বলেছেন যে, মন্ত্রীদের শিষ্টাচার জানা উচিত। হাসির কথা বটে। আবুল মালের শিক্ষাদীক্ষা মনে হয় বেশ অসম্পূর্ণ। কারণ আমরা তো বাল্যশিক্ষায় পড়েছিলাম, ‘আপনি আচরি ধর্ম, অপরে শিখাও’। মুহিত সাহেব নিজে যদি আগে শিষ্টাচারী হতেন, তাহলে তার সহমন্ত্রীকে শিষ্টাচারী হওয়ার পরামর্শ তাকে মানাতো। কিন্তু এ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময়ে যা বলেছেন তাতে শিষ্টাচার পাওয়া গেছে কমই। এমনকি শিক্ষকদের নিয়ে তিনি কথা বলতেও এতটুকু ছাড় দেননি। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মন্ত্রীরা ক্ষমতায় গেলেই কী এক অদৃশ্য কারণে যেন রাতারাতি এলোমেলো, অবান্তর কথা বলা শুরু করে দেন। নব্বই এর দশকের পর থেকে মূলত মন্ত্রীদের এ ধরনের অসংলগ্ন কথার রেওয়াজটা স্বীকৃতি পেয়েছে। মন্ত্রিসভার সবাইকে যে এ ধরনের কথা বলতে হবে তার দরকার নেই একজন বা দুজন কথা বলার মন্ত্রী থাকলেই ল্যাঠা চুকে গেল। ওই একজন বা দুজন মন্ত্রীই নিষ্ঠার সঙ্গে, দায়িত্বের সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িতটুকু পালন করেন। এরা কেউ কখনো বলেন ‘আল্লার মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন’, ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’, ‘ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার সময় ঘরে ভালো করে তালা মেরে যাবেন’, ‘একটি জীবনের জন্য একটি ছাগল’ ‘যারা আমার...বাঁশ ঢোকাতে চায়, আমি চাইলে যে কোনো বাঁশে তাদের খাঁড়া করতে পারি’, ‘ভাত খাওয়ার দরকার কি, ভাতের বদলে ফুলকপি কিংবা আলু খান’, ‘বিএনপি ধাক্কা দিয়ে রানা প্লাজা ধসিয়ে দিয়েছে’ এ জাতীয় হাস্যকর যুক্তিছাড়া কথাবার্তা বলে এরা নিজেদের তো হাস্যোস্পদ করছেনই, সেই সঙ্গে সরকারেরও বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছেন। নব্বই পরবর্তী বিএনপি-আওয়ামী লীগ আমলের মন্ত্রীদের কেউ না কেউ এই মহান (!) দায়িত্বটি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘ঘুষ খান সহনীয় মাত্রায়’। এই অতিকথনে দুষ্ট মন্ত্রীদের নিয়ে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। সরকারপ্রধানকেও কখনো কখনো বিড়ম্বনার মধ্যে পতিত হতে হয়। একথা ঠিক, আবুল মাল আবদুল মুহিত বয়সের ভারে ন্যুব্জ। অতিরিক্ত পরিশ্রম কিংবা দায়িত্বভার তাকে কখনো কখনো বেকায়দা পরিস্থিতিতে যে ফেলে দিচ্ছে বেশ কয়েকটি বক্তব্যে তা প্রকাশমান হয়ে পড়েছে। কথায় কথায় তিনি যাকে-তাকে ‘রাবিশ’ ‘বোগাস’ ‘ফালতু’ ‘স্টুপিড’ বলে ফেলেন। এখন নতুন সংযোজন ‘ননসেন্স’। আর সব সময়ই তাকে ‘হট চেম্পারড’ দেখায়। বয়সজনিত কারণে হয়তো তার এ ধরনের আচরণ বলেও মন্তব্য করেছেন মনোরোগ বিশ্লেষকরা। যে বয়সে মানুষের একাকী নিভৃতে থাকা উচিত, সেই বয়সে কোটি কোটি টাকার মারপ্যাঁচ মাথায় নিতে গিয়েই এমন উদ্ভট কাণ্ডকলাপ ঘটাচ্ছেন ‘মাল মহায়শ’। সম্প্রতি এক ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সিপিবি-কে মুহিত সাহেব ‘ননসেন্স’ বলেছেন। ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে সিপিবি-বাসদ ও বামমোর্চার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচির বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে এ কথা বলেন তিনি। সিপিবি-কে গাল দেয়াটা আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র মতো বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের নতুন কিছু নয়। তাদের রাজনৈতিক যে চরিত্র, সেটির প্রধানতম প্রতিবন্ধক হচ্ছে সিপিবি। সিপিবি, মানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের বৃহত্তম একটি বাম রাজনৈতিক দল। মুক্তিযুদ্ধের ধারায় গরিব-মেহনতি মানুষের লড়াই-সংগ্রামের একটি দল। অধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সিপিবি সম্পর্কে বলতে পারবেন। আর মুহিত সাহেব সিপিবি-র অস্তিত্ব খুঁজে পান না! হয়তো তার নিজের অস্তিত্ব হারানোর ভয়ে সন্দিহান আছেন তিনি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দশটি প্রকৃত গণআন্দোলনের হিসাব নিন, দেখবেন সাড়ে নয়টাতেই বামপন্থিদের ভূমিকা সর্বাগ্রে। ভোটের রাজনীতিতে সিপিবি বা এদেশের বামশক্তি-রা পিছিয়ে আছে এটা সত্য। আবার পিছিয়ে আছে বলাটা হয়তো একদম ঠিকও হবে না, বুর্জোয়া রাজনৈতিক চরিত্রে বামশক্তি পিছিয়ে থাকবে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কেননা আমাদের চলমান বিতর্কিত রাজনীতিতে ভোটের হিসাব আলাদা এবং বিতর্কিত এক ব্যাপার। নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধনিক শ্রেণির দলগুলো কালো টাকা, পেশি শক্তি এবং ধর্মের অপব্যবহারে এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছে, সেখানে প্রকৃত প্রগতিশীল এবং গণমানুষের রাজনীতি উচ্চকণ্ঠ হতে পারছে না। এর সঙ্গে ধনিক শ্রেণি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এমন একটা দ্বিদলীয় মেরুকরণের ধারণাও মানুষের চিন্তায় গেঁথে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষও সেই চিন্তা থেকে বের হতে পারছে না। আর ভোটে না জিততে পারার রেকর্ড কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরও আছে। ’৯১-এ ঢাকায় দুই আসনে এবং ’৯৬-এ রংপুরে এক আসনে তিনিও তুলনামূলক অনেক অখ্যাত প্রার্থীদের সাথে জিততে পারেননি। কিন্তু ভোটে না জিততে পারলেও, তাদের অনেককেই এদেশের মানুষ যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে, তাদের কথা গুরুত্বসহকারে শুনে, মূল্যায়ন করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়। ক্ষমতার বাইরে তাদের অনেককেই, অনেক নেতানেত্রীর চেয়ে অনেক উচ্চমানের মনে করে এবং অনেক উচ্চাসনে স্থান দেয়। যখন গরিব-মেহনতি মানুষের দলকে মুহিত সাহেব ননসেন্স বলেন, তখন এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার নয়, তিনি তাকেই ‘ননসেন্স’ বলছেন। সিপিবি ননসেন্স, কারণ সিপিবি ক্ষমতার রাজনীতি করে না। সিপিবি গণমানুষের রাজনীতি করে। কানসাট, শনির আখড়া, ফুলবাড়ি, রামপাল, মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড, নারী নির্যাতন, যৌন অপরাধ, আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে এ দলটির ভূমিকা অগ্রগণ্য। সিপিবি বিদ্যুতের দাম বাড়লে প্রতিবাদ করে। গ্যাসের দাম বাড়লে প্রতিবাদ করে। সিপিবি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হলে প্রতিবাদ করে। সিপিবি ব্যাংক লুটেরা-কালো টাকার মালিকদের পক্ষপাতিত্ব করে না। কৃষকের পক্ষে সিপিবি, ক্ষেতমজুরদের পক্ষে সিপিবি পোশাক শ্রমিকদের পক্ষে সিপিবি–‘মাল সাহেবের’ চোখে এ কারণে হয়তো সিপিবি ননসেন্স। একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতো। কেউ যদি এমন কিছু করে বা বলে, যা বর্তমান সরকার এবং সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিপক্ষে গেল বা যুৎসই হলো না, তা যত সঠিক ও বাস্তবভিত্তিকই হোক না কেন, তাহলেই আর যায় কোথায়! অমনি এই সরকার এবং আওয়ামী লীগের কিছু অতি-উৎসাহী অন্ধ ভক্ত বা আওয়ামী নামধারী একদল স্বার্থান্বেষী লুটেরা, যাদেরকে হাইব্রিড বলা হয়, ত্যাগের মুখোশধারী ওইসব হাইব্রিডরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সেইসব মানুষদের উপর বলতে গেলে একরকম ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা যত বড় মাপের ও সম্মানের মানুষই হোক না কেন, এমন কি যত বড় আওয়ামী লীগার /বঙ্গবন্ধু ভক্ত/ চিরজীবন আওয়ামী ঘরানার ইত্যাদি যাই হোন না কেন, তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী ধরে টানাটানি শুরু করে, হেনস্থা করে ছাড়ে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ সেই মানুষগুলি সমন্ধে এমন সব কটুক্তি বা নিম্নরুচির অশালীন ও অশোভন মন্তব্য করে যে, ভাবতে কষ্ট হয় আওয়ামী লীগের মত এমন একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নেতাকর্মীদের এমনতর অধঃপতন হল কী করে!! প্রশ্ন জাগে, এভাবে আওয়ামী লীগ যদি সকলকেই তাদের শত্রু মনে করে বা জোর করে শত্রু বানিয়ে ফেলে বা জোর করে শত্রুর দলে ঠেলে দেয়, তাহলে তাদের (আ.লীগের) বন্ধু কারা? মুহিত সাহেব টানা আট বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকেও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারার বিষয়টি স্বীকার করছেন। তাহলে ‘ননসেন্স’ প্রশ্নটির সমাধান? আমি নিশ্চিত, মুহিত সাহেব আওয়ামী লীগ ছাড়লে তখন এ দলটিকেও এরকম গালি দেবেন। অবশ্য মুহিত সাহেব এরশাদ সাহেবকে কখনো গালি দেন না। বাঁশির শব্দ শুনলেই তিনি মাথা তুলে দৌড় দেন। লেখক : প্রকাশনা ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..