অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্য, শাসক বুর্জোয়াদেরই সংকটের পরিচায়ক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রাজনৈতিক ভাষ্যকার : একটি বছর পেরিয়ে গেলো। সামনে রয়েছে নতুন বছর। কেমন যাবে এই নতুন বছর? এটি একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। ফেলে আসা বছরটি কিন্তু ভালো যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের অনেক ফিরিস্তি শোনানো হলেও সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া পায়নি। আমাদের আয় বেড়েছে, একথা সত্য। জিডিপি’র আকারও বড় হচ্ছে। প্রতিবছর আরও বড় হচ্ছে জাতীয় বাজেটের আকার। কিন্তু বাজেটে বর্ধিত রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দায় পড়েছে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা গরিব-মধ্যবিত্তের ঘাড়ে গিয়েই পড়ে, পড়ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সেবা, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা, পানি সরবরাহের বিষয়টি ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। কারণ সরকার যে মুক্তবাজার অর্থনীতির দর্শনে বিশ্বাস করে, তাতে শিক্ষা, চিকিৎসা পানীয় জলের সরবরাহ ইত্যাদি বাজারি দ্রব্যে (বা সেবায়) পরিণত হয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে তার আগের বছরের তুলনায় মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছ ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। দুই কোটি অতি দরিদ্র মানুষের জীনবযাত্রার মান দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে। ৩ জানুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “চালসহ বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে ২০১৭ সালে। দেশে মাথাপিছু আয় বাড়লেও গত বছর তার কোনো সুফল পায়নি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ১২ কোটি মানুষ।” মাথাপিছু জাতীয় আয় কথাটির দ্বারা দেশের সার্বিক চিত্র পাওয়া যায় না। এটি একটি গড় হিসাব। ফলে উপরতলার কিছু লোকের আয় বৃদ্ধি পেলে জাতীয় গড় আয় বৃদ্ধি পাবে, এমনকি নিচেরতলার মানুষের আয় কমে গেলেও। জাতীয় আয় বৃদ্ধির তিনটি প্রধান উৎস। প্রতিটি উৎস আলাদা করে বিচার করলে দেখা যাবে যে, জাতীয় আয় বৃদ্ধি করছে যারা, তারাই রয়েছে সবচেয়ে দুঃখ, কষ্ট ও অভাবে। আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির বাজার বেশ পজেটিভ। এই সেক্টরই সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এখানে বেশি পুঁজি লাগে না। উন্নত প্রযুক্তিও লাগে না। পোশাক শিল্পের ক্রেতারাই কাঁচামাল অর্থাৎ কাপড়, বোতাম ইত্যাদি সরবরাহ করে। আমরা শুধু শ্রম যোগ দিই। কিন্তু শ্রম দেয় যারা, তারা সবচেয়ে বেশি অভাবী ও নির্যাতিত। অথচ গার্মেন্ট শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠছে মালিকরা। গত বৎসর একাধিক গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকরা লড়াই করেছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে, যার পুরোভাগে ছিল গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। এ বছর গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বড় ধরনের আন্দোলন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতীয় আয়ের আরেকটি প্রধান উৎস হল বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স। বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন খুবই কষ্টকর। সবসময় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অথচ তাদের পাঠানো রেমিটেন্সের দ্বারাই আমাদের জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমরা গর্ব করে বলি ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ হতে চলেছি। বিদেশে আমাদের যে দূতাবাসগুলি আছে, তারা সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে। জাতীয় আয়ের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হল কৃষিখাত। গত কয়েক বছর ধরে কৃষিখাতে যে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে তা বিস্ময়কর। আর বিস্ময়কর এই কারণে যে, শ্রমজীবী কৃষক সরকারের কোনোরকম সহায়তা ছাড়াই নিজেদের শ্রম ও মেধা দিয়ে উৎপাদন বাড়িয়েছে। গত বৎসরে অবশ্য হাওর অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি এই ব্যাপারে সরকারকে অভিযুক্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পক্ষে কিছু দাবিনামা নিয়ে ঢাকায় ও হাওরাঞ্চলে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালিয়েছে। তার সাড়া পড়েছে খুবই। দলমত নির্বিশেষে ঐ অঞ্চলের কৃষকরা এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। সাধারণভাবে যে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে তার সুফল কিন্তু উৎপাদনকারী কৃষক এবং ক্রেতা সাধারণ কেউই পায়নি। গত বৎসরসহ বিগত কয়েক বৎসর ধরে কৃষক কৃষি পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। চালের দামে উর্ধ্বগতি সত্ত্বেও কৃষক তার উৎপাদন খরচটুকুও উঠাতে পারেনি। অন্যদিকে চাল, সবজি ইত্যাদি কিনে যে সাধারণ মানুষ তারা কিনছে বেশি দামে। তাহলে লাভ করছে কারা? লাভ করছে মধ্যস্বত্ব শ্রেণি। এরাই অধিকাংশ সরকারি দলের লোক। এই ধরনের পরগাছা শ্রেণিই অবস্থান করছে অর্থনীতির প্রতিটি জায়গায়। আমরা যখন বলি যে দেশে লুটেরা ধনিক শ্রেণির আধিপত্য রয়েছে, তখন প্রকৃত উৎপাদন শ্রেণি, এমন উৎপাদনমুখী বুর্জোয়া শ্রেণির চেয়ে বেশি লাভ করবে পরগাছা শ্রেণির ধনিকরা। পরগাছা শ্রেণির লুটেরা ধরনের চরিত্র সর্বক্ষেত্রে দেখতে পাওয়া যাবে। ব্যবসায় টেণ্ডারবাজি ও দলবাজি কেবল জিনিসপত্তরের দামই বাড়াচ্ছে না, অর্থনীতিতেও নৈরাজ্য ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। আর এই টেন্ডারবাজি নিয়ে সরকারি দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সশস্ত্র সংঘর্ষ ও প্রাণহানি সমাজজীবনেও নৈরাজ্যের উপাদান বৃদ্ধি করে চলেছে। গত বছর সামাজিক অবক্ষয় ও নৈরাজ্য ভয়াবহ আকারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা “আইন ও সালিশ কেন্দ্র” গত বছরের শুরুর দিকে ২০১৬ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছিল। এবার ২০১৭ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে “চরম উদ্বেগজনক” বলেছে। ‘চরম’ শব্দটি যোগ হওয়াটি বেশ অর্থবহ। এই সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেছেন, ‘গুমের শঙ্কা আর উদ্বেগ এখন অরাজনৈতিক সাধারণ মানুষের মনেও ঢুকে গেছে। এই সভা থেকে বের হওয়ার পর কী হবে, এরপর আর কোনো সভায় অংশ নিতে পারব কিনা, তারই কোনো নিশ্চয়তা নেই।’ এই সংস্থার প্রতিবেদনে আরও যা বলা হয়েছে তা সংক্ষেপে হল এই রকম – ২০১৭ “৯১ জন নিখোঁজ। ২ জনের লাশ মিলেছে। ১৬ জন ফিরে এসেছে। ১৫ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ১২৬ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত। রাজনৈতিক গুম আর তার পাশাপাশি টাকার জন্য গুম– দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া নারী ধর্ষণ, নারী হত্যা ও শিশু হত্যার যে পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, তাও ভয়াবহ। গত বছর ৩৩৯টি শিশু খুন হয়েছে। ৮১৮ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে ৪৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।” কোনো কোনো গুম ও হত্যার সঙ্গে যে র্যা বের কোনো কোনো অসৎ সদস্য জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহও জনমনে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সাতখুনের রহস্য উদঘাটিত হবার পর। অবশ্যই দুই সাবেক র্যা ব সদস্য এখন খুনের মামলার আসামি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গুম, খুন, ধর্ষণের কোনো বিচার পাওয়া যায় না। সামাজিক অবক্ষয় ও নৈরাজ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক গণতন্ত্রও কর্তৃত্ববাদী শাসনের তলায় পিষ্ট হচ্ছে। সাধারণভাবে দুর্নীতি ও ব্যাংক দুর্নীতি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বেশ অরাজকতা চলছে। তার উপর সুদের হার কমিয়ে দেয়ায় মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের প্রবণতাও কমে গেছে। ব্যাংক দুর্নীতি তো প্রকাশ্য ঘটনা। অথচ সিপিবিসহ বামদলগুলো যখন ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য, দুর্নীতি ও বিদ্যুসহ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন করে অথবা শান্তিপূর্ণ হরতাল ডাকে তখন পুলিশ চড়াও হয় শান্তিপূর্ণ পথে প্রতিবাদকারী মানুষের ওপর। গত বৎসরে রংপুর, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন স্থানে সিপিবি নেতারা গ্রেফতার হয়েছেন, পুলিশের হামলার মুখে পড়েছেন। বামদলগুলোর আহুত হরতালের ভোরবেলাতেই সিপিবি অফিসে হামলা চালানো হয়েছে। সরকার রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবেই। গত বছর এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। কিন্তু সরকার তার অবস্থান থেকে নড়বে না। সুন্দরবেনর ক্ষতি করে হলেও ওখানেই ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে মিলে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতেই হবে। বর্তমান সরকার খুবই কর্তৃত্ব পরায়ন। গত বছরেও তার অনেক প্রমাণ মিলেছে। কথাবার্তাতেও কোনো লাগাম নেই। ব্যাংক দুর্নীতির কথা উঠলে, অর্থমন্ত্রী তার প্রিয় শব্দ “রাবিশ” উচ্চারণ করেন। দুই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি তার কাছে সামান্য বিষয়। বারংবার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্যের কথা উঠলে শিক্ষামন্ত্রী রাগান্বিত হন। তবে দুর্নীতির প্রশ্নে তিনি বেশ নরম। নসিবৎ করেন, ‘সহনীয় মাত্রায় দুর্নীতি গ্রহণে’। তাই বলছিলাম, গত বৎসরটি ভালো যায়নি। এ বছর নির্বাচনের বছর। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় দলগুলোর মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিএনপি মামলা ও হামলায় এমন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত যে তারা সহজে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। উপরন্তু তারা এখনও জামাতকে সঙ্গী করে রেখেছে। মাঝেমধ্যে কিছু সভা করলেও জনগণের দাবি নিয়ে কোনো কথা বলে না। জনমত সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু মন থেকে বিএনপিকেও মেনে নিতে পারছে না। তবু অন্য কোনো বিকল্প (বাম ছাড়া আর কোনো বিকল্পও নেই) রাজনৈতিক শক্তি দৃশ্যমান না হলে হয়তো তারা বিএনপিকে বেছে নিতে পারে। কারণ এখনও পর্যন্ত দেশ দ্বিদলীয় ব্যবস্থার মধ্যে ঘোরপাক খাচ্ছে। জনগণের মানসিকতাও সেইভাবে তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই মানসিকতাকে বদলাতে হবে। সেজন্য কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম শক্তির সামনে এই বৎসরটি একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। নির্বাচনের বছর ঠিকই। কিন্তু এখনও জনমনে প্রশ্ন– নির্বাচন হবে কি? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি হবে নাকি? যতদূর দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এবার নির্বাচনে যাবে। সম্ভবত: বাম দলসমূহ নির্বাচনকে কাজে লাগাবে বিকল্প কর্মসূচি তুলে ধরার জন্য এবং পার্লামেন্টে সত্যিকারের বিরোধীদলের ভূমিকা নেবার জন্য। তারপরও প্রশ্ন থাকছে। আওয়ামী লীগ সরকার কি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দেবে? জনমনে প্রশ্ন- বিগত বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যা হয়েছে জাতীয় নির্বাচনেও তেমনটি হবে নাকি? বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু নিরপেক্ষ ও দক্ষ হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। আশা করি, তারা রকিব কমিশনের মতো হবেন না। তবু নির্বাচনকে ঘিরে এখনও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এমন অনিশ্চয়তা শাসক বুর্জোয়া শ্রেণিরই দুর্বলতার পরিচায়ক। এটা কেবল আওয়ামী লীগ-বিএনপির ব্যাপার নয়, শ্রেণি হিসেবে লুটেরা বুর্জায়ার স্থায়ী সংকটের বহিঃপ্রকাশও। এই শ্রেণিকে পরিবর্তিত না করা পর্যন্ত একটা ভালো নির্বাচন ও কিছুটা হলেও বুর্জোয়া গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের কিছু কল্যাণকর আর্থ ব্যবস্থা আশা করা যায় না। এজন্য এখনই বিকল্প হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে কমিউনিস্ট ও বামশক্তিগুলোকে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..