বিসিএস ও ক্যাডার নিয়ে সাম্প্রতিক আন্দোলন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শ্যামল কুমার সরকার : শিরোনামের পক্ষ-বিপক্ষের গ্রুপ গত কয়েকমাস ধরেই আলোচনা সভা, মানববন্ধন ও প্রেস কনফারেন্স করে আসছিলেন। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) সমিতির দাবি, বিসিএস পরীক্ষা পাস ছাড়া কোনোক্রমেই ক্যাডারভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তাঁদের বক্তব্য কলেজ সরকারিকরণে কোনো বাধা নেই, কিন্তু এজন্য জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে আলাদা নীতিমালা করতে হবে। এছাড়া ২৮৩ টি নতুন সরকারি কলেজের প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষককে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী অন্যত্র বদলি না করে স্ব স্ব কলেজেই পদায়ন করতে হবে এবং আগামীতেও তাদের বদলি করা যাবে না। কারণ, বড় বড় কলেজে সরকারিকরণকৃত কলেজের শিক্ষকদের বদলি করলে উচ্চ শিক্ষার মানে ধ্বস নামবে। ১৯৭৮ সাল হতে অত্যন্ত অন্যায়ভাবে সরকারি করা কলেজ শিক্ষকদের শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত করায় পদোন্নতি জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বিসিএস পাস করা অনেক মেধাবী শিক্ষক জ্যেষ্ঠতা হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) শিক্ষক সমিতি। সরকারি কলেজের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষকের সংগঠন বিসিএস শিক্ষক সমিতির সভাপতি বলেছেন তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়াতে বাধ্য হয়েই তারা ২৬ ও ২৭ নভেম্বর পূর্ণ কর্মবিরতি পালন করেছেন এবং ৬,৭ ও ৮ জানুয়ারি ২০১৮ কর্মবিরতি পালন করবেন। এতেও কাজ না হলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে রেখেছে উক্ত শিক্ষক সমিতি। এ ব্যাপারে সরকারি কলেজের একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, তাদের ক্ষোভের কারণ। দেশের জেলা সদরের একটি সরকারি কলেজের একটি বিভাগের প্রধান প্রফেসর পদপর্যাদায় আছেন। তিনি আত্তীকরণকৃত। অথচ তারই অধীনে আছেন ৬/৭ জন বিসিএস করা সহকর্মী। সে বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক জানিয়েছেন এটি কি মেনে নেয়া যায়? শুধু তাই নয়। সে কলেজের স্বয়ং অধ্যক্ষও একজন আত্তীকরণকৃত শিক্ষক। মামলার মাধ্যমে বেসরকারি আমলের শতভাগ সার্ভিস কাউন্টের মাধ্যমে উল্লিখিত দুজন শিক্ষকের আজকের অবস্থান। এছাড়াও উনাদের যুক্তি ক্যাডার তাদের মর্যাদা-অহংকার। যে কোনো মূল্যে মর্র্যাদা তারা অক্ষুণ্ন রাখবেন। অন্যদিকে সরকারিকরণের তালিকাভুক্ত ২৮৩টি কলেজের শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি বলছেন ১৯৭৮ সাল হতেই সরকারি করা কলেজের শিক্ষকরা ক্যাডারভুক্ত হচ্ছেন। তাহলে এখন হবে না কেন। বেসরকারি আমলের শতভাগ সার্ভিস গণনা, স্বপদে বহাল, বদলি ও ক্যাডারভুক্ত করা না হলে আইনের আশ্রয় নেয়ার কথা বলছেন উনারা। সব মিলিয়ে দেশের উচ্চ শিক্ষা স্তরে এক অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আর এজন্য সরকারি নীতিমালাই দায়ী। ২০০০ সালের আত্তীকরণ বিধিমালা অনুযায়ী আত্তীকৃত শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত না করলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। কারণ, ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া মানবের আদিম রুপ। সেখানে যুক্তি প্রায় থাকেই না। আর প্রবাদেও আছে বসতে দিলে খেতে চায়, খেতে দিলে শুতে চায়। চাই চাই খাই খাই ভাবের অবসান কখনই যাবে না। এছাড়া চাইলেই যদি পাওয়া যায় তবে চাইতেই বা দোষ কি? শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই। আমাদের সব চিন্তা নিজেকে নিয়ে- পরিবার পরিজন নিয়ে। আর তাইতো মানুষ গড়ার কারিগরদেরও যুক্তিবুদ্ধি সাময়িক লোপ পেয়েছে। ১৯৭৮ সাল হতে হয়ে আসা অন্যায়কে ন্যায্য দাবি বলে আন্দোলন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অন্যায় ও অযৌক্তিক কাজকে কখনই ন্যায় ও যৌক্তিক বলে দাবি করা যায় না। যেমন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যৌতুক প্রথাকে সরকারি স্বীকৃতি দেয়া যায় না। এতদিন আন্দোলন করেছেন শতভাগ বেতন-ভাতার জন্য। তা নিশ্চিত হতে না হতেই শুরু করেছেন ক্যাডারভুক্তির আন্দোলন। একবারও কি ভেবে দেখেছেন এম এ পাস না করে এম এ পাসের ফল দাবি করা নিছক আহাম্মকি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজ্ঞজনেরা এমন ফলের দাবিদারদের অন্য উপাধিও দিতে পারেন। কাজেই বিবেক দিয়ে আবেগের লাগাম টেনে ধরাই উত্তম। বিসিএস শিক্ষক সমিতি সরকারিকরণকৃত কলেজ শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উনারা বলেছেন বিসিএস পরীক্ষা দেয়ার মতো প্রান্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতাও ২৮৩টি কলেজের অনেক শিক্ষকের নেই। অনেক শিক্ষক এমপিওভুক্তই নন। এ ব্যাপারে আত্মসমালোচনা দরকার। পাস কোর্সের এমএ যার আগের তিনটিতেই থার্ড ডিভিশন। অনার্সে থার্ড ক্লাস এমএ তেও থার্ড ক্লাস নিয়ে কি বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত হওয়া যায়? হওয়া যায় কি কলেজশিক্ষক? নাকি সুযোগ কাজে না লাগানো বোকামি? একজন শিক্ষকের জায়গা থেকে উত্তরগুলো বের করাটা জরুরি। সরকারিকরণকৃত কলেজেশিক্ষক নিবন্ধন পাস করা, চারটি ২য় বিভাগ/শ্রেণি ও চারটি প্রথম বিভাগ/শ্রেণি প্রাপ্ত অল্পসংখ্যক শিক্ষকও আছেন। এনসিটিবি’র চেয়ারম্যানসহ বেশির ভাগ কর্মকর্তাই আপনাদের সমিতির। পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সেখানে কি হচ্ছে? কোথায় আপনাদের মেধা-কোয়ালিটি? ডিজি অফিস, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর এবং শিক্ষা বোর্ডসমূহে প্রধানসহ আপনারা অনেকেই আছেন। সেখানে সব ঠিকমতো হচ্ছে তো? ক্লাসরুম টিচিং বাদ দিয়ে আপনারা অনেকেই বছরের পর বছর দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত আছেন। কেন? দেশের সরকারি কলেজেগুলো ভালো কাজ করছে কি? বছরের পর বছর আপনারা অনেকেই ঢাকা ও মেট্রোপলিটন শহরের কলেজে কাটাচ্ছেন কেন? সরকার শতভাগ সুযোগ-সুবিধা দিলেও আপনারা অনেকেই স্টেশনে থেকে কলেজ না করে হাওয়ার বেগে চলেন কেন? প্রায় ১৪ হাজার সদস্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার আজও মর্যাদার লড়াই করে চলেছে। বিষয়টি বেদনার এবং হতাশার। আপনাদের কোনো ব্যর্থতাই কি নেই? সরকারিকরণকৃত শিক্ষকদের কোথাও বদলি করা যাবে না বলে আপনারা কলোনিয়াল মাইন্ড সেটের যে পরিচয় দিয়েছেন তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এমন পরিস্থিতিতে একমাত্র সরকারই পারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে। সরাকারি হাই স্কুলের ৩য় শ্রেণির সহকারী শিক্ষকদের এবং সরকারি প্রাইমারি স্কুলের ৩য় শ্রেণির প্রধান শিক্ষকদের সরকার আন্দোলনের মুখে ২য় শ্রেণির পদমর্যদা দিয়েছে। যে কোনো সময় এরা প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দাবি করলে আবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সরকার হয়তো তা দিয়েও দেবে। কারণ, চাইলেই পাওয়া যায়। এমন সংস্কৃতিতেই বর্তমান আন্দোলন চলছে। প্রায় ২৫ হাজার সদস্যের দেশের সর্ববৃহৎ পেশাগত ক্যাডার বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে বিসিএস পাস ছাড়া প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। সেখানে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার চিকিৎসক আছেন। বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারেও একই অবস্থা। সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) এর মাধ্যমে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসে এবং বিসিএস ছাড়া ১ম শ্রেণির নন-ক্যাডারে নিয়োগ দেয়া হয়। অর্থাৎ বিসিএস পরীক্ষা পাস করা ছাড়া কোনো ক্যাডারেই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে শিক্ষার মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্যাডারের ক্ষেত্রে কেন এমন বেহাল দশা? দেশের উচ্চ শিক্ষা পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে প্রত্যাশা করবো দ্রুতই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ২০১৭ সালেই ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার বিতর্কের অবসান হবে। অন্যথায় ২০১৮ সালেও উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে অচলাবস্থা চলতেই থাকবে। কাজেই আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৭ চূড়ান্তকরণ অতি জরুরি। ইতোমধ্যেই ২৬ ক্যাডার বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। বিষয়টিকে হাল্কা করে দেখার অবকাশ নেই। পাশাপাশি মানবসম্পদ সৃষ্টি ও উন্নয়নে ভূমিকা পালনকারী বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার দেশের মডেল ক্যাডারে পরিণত হউক সেটিই কাম্য। কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) একটি ক্যাডার অব এক্সিলেন্স। যুক্তির আলোকে বিরাজমান সমস্যার সমাধান করতে হবে। মানুষ গড়ার কারিগরদের অবশ্যই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স যেন ভেঙে না পড়ে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রকেই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ঝিট্কা খাজা রহমত আলী ডিগ্রি কলেজ, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..