সুলেখা সান্যাল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
তপন কুমার দে: ১৯২৮ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোড়কদি গ্রামে সুলেখা সান্যালের জন্ম। বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ও সাহিত্যিক অবন্তী কুমার স্যনাল তাঁর ভাই। স্বামীর নাম চিত্ত বিশ্বাস। চট্টগ্রামে মাসির কাছে সুলেখার শৈশব কাটে। সাত বছর বয়সে লেখাপড়া শুরু করেন। ১৯৪২ সালে চট্টগ্রামে বোমা বিস্ফোরণের পর পুনরায় স্বগ্রামে ফিরে আসেন। ১৯৪৪ সালে জমিদার বাড়ির প্রথা ভেঙে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন প্রাইভেট পড়ে। ১৯৪৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আই. এ. পাশ করে কলকাতায় এসে ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউট-এ ভর্তি হন বি. এ. পড়ার জন্যে, কিন্তু পরীক্ষা দেবার আগেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন ও গ্রেপ্তার বরণ করেন। এক বছর প্রেসিডেন্সি জেলে কারাবাসের জন্যে বি. এ. পরীক্ষা দিতে পারেননি। ঐ বছরই তাঁর বিবাহ হয়। পরে জেল থেকেই পরীক্ষা দিয়ে তিনি বি. এ. পাস করেন। জেলের ভিতরেই অনশন ও পুলিশি অত্যাচারের ফলে তাঁর স্বাস্থ্য ভাঙ্গতে শুরু করে। জেলের বাইরে বেরিয়ে এসেও দারিদ্রতার নিষ্পেষণে তাঁর শরীর আরও দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। নামমাত্র বেতনে কলকাতার খিদিরপুর অঞ্চলের একটি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করতেন। এইসময় তিনি ‘পরিচয়’-গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠিত লেখিকা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘পঙ্কতিলক’ ১৯৪৪ সালে অরণি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সুলেখার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস হল নবাঙ্কুর। তাঁর অধিকাংশই ছোটগল্পে নারীচিত্রের প্রাধান্য, যে নারী সামাজিক, পারিবারিক নানাবিধ ঘাতপ্রতিঘাতে ভাগ্যবিড়ম্বিতা। এই সময় থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি লিখতে শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে তাঁর বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়। নিজেরই পছন্দকরা এক রাজনৈতিক সহকর্মীকে তিনি বিয়ে করেন। যদিও সেই বিয়ে সুখের হয়নি। ১৯৫৭ সালে হঠাৎ ধরা পড়ল তাঁর দুরারোগ্য লিউকোমিয়া রোগ। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি কলকাতা থেকে চলে গিয়েছিলেন বর্ধমানের বড়শূলে শিক্ষকতা নিয়ে। তিনি স্বেচ্ছায় সরে যেতে চেয়েছিলেন পরিচিত জীবন থেকে। তখনই তাঁর মধ্যে বাসা বেঁধেছে দুরারোগ্য ব্যাধিটি। ১৯৪৪ সালের আগে তাঁর লেখায় রাজনৈতিক সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। দেশভাগের ফলে ছিন্নমূল বাঙালি পরিবারে দুঃখ-দুর্দশার কথা তাঁর অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে হয়েও সমাজ পরিবর্তনের চেতনায় আকৃষ্ট হন এবং অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে বলিষ্ঠ লেখনীর সাহায্যে বেশ কিছু অমূল্য গল্প ও উপন্যাস তিনি রচনা করেন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে থেকেই দুরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারে ভুগছিলেন। চিকিৎসার জন্যে ১৯৫৯ সালে মস্কোতেও যান। মস্কোতে তিনি নিয়মিত ডায়েরি লিখতে শুরু করেন, দেশে ফিরেও লিখেছেন, মস্কো যাবার আগে তাঁর বিশ্বাসের ভিত দারুণ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল অতি প্রিয় পরিচিতজনের কাছ থেকে। সেই বিশ্বাসহীনতা তাঁর জীবনবোধকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। সৃষ্টির উৎসমুখ তাঁর নতুন করে খুলে যায় মস্কো থেকে ফিরে এসে। ‘জীবনের কাছ থেকে পাওয়া তিক্ততা, বিশ্বাসহীনতা তাঁকে ঠেলে দিয়েছে অদ্ভুত এক নৈর্বত্তিক শূন্যতাবোধের মধ্যে– যা তাঁর তখনকার সাহিত্যকর্ম নাথিংনেস নামে বারবার ঘুরে এসেছে। জীবনকে দেখেছেন যেন এক তৃতীয় ব্যক্তিরূপে। কোনও অভিযোগ কোনও দোষারোপ নেই কারও বিরুদ্ধে। তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো সৃষ্টি হয়েছে এই সময়ে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে অনাকাঙ্খিত বেদনা, তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, ভালোবাসার ব্যর্থতা, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া-ইত্যাদি সবকিছু অবিভ্যক্তি রেখাপাত করেছিল তাঁর লেখার মধ্যে।’ শরীর ও মনের এই বিপর্যস্ত অবস্থাতেও তিনি বি. টি এবং স্পেশাল অনার্স পাশ করেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৬২ সালের ৪ ডিসেম্বর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। সময়ের তুলনায় সুলেখা সান্যাল ছিলেন অনেক বেশি অগ্রণী। তাঁর আত্মপ্রত্যয় আপসহীন মন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়েও তাঁকে সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে। সুলেখার জীবনের সংগ্রামই তাঁর সৃজনশীলতার উৎস। – তপন কুমার দে তথ্যসূত্র: তপন কুমার দে’র বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের জীবনকথা বই থেকে নেয়া। প্রকাশক: ফয়সাল আরেফিন দীপন, জাগৃতি প্রকাশনী, ৪২/এ আজিজ সুপার মার্কেট, ২য় তলা, শাহ্বাগ, ঢাকা–১০০০। প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০০৫।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..