পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
প্রমা ইসরাত: দুপুরের কড়া রোদে টিনের চালের উপর উঠে তার দিয়ে খুব ভালো করে সেটা সিলিং এর সাথে বেঁধে দিচ্ছিল রইসুদ্দিন। তাঁর ছেলে হাসু, বয়স মোটে তিন। কড়া রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হা করে বাবার কাজ দেখছে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছেলের কাজ দেখছে রইসুদ্দিনের পিতা হাশেমুদ্দীন। রইসুদ্দিন কড়া রোদে নিজের ছেলেকে খেলতে দেখে তাঁর স্ত্রী আমিনাকে চিৎকার করে ডেকে বলল, “ও হাসুর মা, দ্যাখতাছ না রইদে ছ্যাড়া পুইড়া যাইতাছে, এরে ভিতরে নেও”। হাশেমুদ্দীনও বলে উঠল, “তুইও পুইড়া যাইতাছস, আর কাম করন লাগতো না, তুই নাইমা আয় বাবা”। উপরের ছোট ঘটনাটি মানব চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, আর তা হচ্ছে স্নেহ সব সময় নিম্নগামী। মানুষ তাঁর নিজের সন্তানের প্রতি যতটা টান অনুভব করে, নিজের পিতা মাতার প্রতি ঠিক অতটা টান অনুভব করে না। ধর্মীয় এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। প্রত্যেক পিতা মাতা তাঁর সন্তানের কাছে কিছু অধিকার দাবি করেন, সন্তানের সময় এবং সঙ্গ পাবার অধিকার, ভরণ-পোষণ পাবার অধিকার, সম্মানের সাথে বসবাসের অধিকার। মানুষের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের নীতি নৈতিকতা সময়ে সময়ে বদলায়। যে মূল্যবোধ একটা সময় নিয়ম ছিল, চর্চায় ছিল, কালের পরিক্রমায় তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাই দেখা যায় মানুষ যে অধিকারগুলো পাবার দাবিদার সেই অধিকারের আইনগত একটা স্বীকৃতি পাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। তেমনই একটি আইন পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩। এই আইনটি ২০১৩ সালের ৪৯ নং আইন। আইনটি প্রণয়নের লক্ষ্য সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ২০১৩ এর ধারা (২) এর (খ) অনুযায়ী ভরণ-পোষণ অর্থ , খাওয়া দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা, বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদান। এই আইনের ধারা (৩) অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে সেক্ষেত্রে সন্তানগণ নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে তাদের পিতা মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে। এই ধারায় উল্লেখ আছে, পিতা মাতাকে আলাদা করা যাবে না। অর্থাৎ পিতা মাতার ভরণ পোষণ নিশ্চিত করবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা মাতার একই সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। সহজ কথায়, অনেক পরিবারে একাধিক সন্তান থাকলে সাধারণত সন্তানরা নিজেদের বাবা মা’কে সম্পত্তির মতো বণ্টন করে ফেলে। বাবা বড় ছেলের কাছে, আর মা ছোট ছেলের কাছে থাকবে, এইরকম বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। এই ব্যাপারটির প্রতিই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, আইনের এই ধারায়। এই আইনের ধারা (৩) এর উপধারা (৪) অনুযায়ী পিতা মাতাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে কোথাও বসবাসের ক্ষেত্রে বাধ্য করা যাবে না। ধারা (৩) এর (৫ ) অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তান তাঁর পিতা মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্চা করবে। ধারা (৩) এর উপধারা (৬) অনুযায়ী পিতা মাতা যদি সন্তান থেকে আলাদা বসবাস করে থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে পিতা মাতার সাথে সন্তানকে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করতে হবে। ধারা (৩) এর উপধারা (৭) অনুযায়ী কোন পিতা মাতা যদি সন্তানদের সাথে বসবাস না করে আলাদা বসবাস করেন, তবে সেক্ষেত্রে সেই পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তাদের দৈনন্দিন আয় রোজগারের ক্ষেত্রেও মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা উভয়কে নিয়মিত প্রদান করবে। এই আইনের ধারা (৪) অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তান পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদি এবং মাতার অবর্তমানে নানা নানিকে ধারা (৩) এ বর্ণিত ভরণ-পোষণ হিসেবে গণ্য হবে। পিতা মাতার ভরণ-পোষণ না করবার জন্য দণ্ডের বিধান রয়েছে এই আইনের ধারা (৫) এ। ধারা (৫) অনুযায়ী, কোনো সন্তান যদি ধারা ৩ এর যে কোনো উপধারা কিংবা ধারা ৪ এর বিধান লঙ্ঘন করেন তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এবং সে ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এবং যারা পিতা মাতার ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে বাধা দেবে, বা পিতা মাতার অবর্তমানে দাদা দাদি, বা নানা নানির ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে বাধা দেবে তারা এই ধারা অনুযায়ী দণ্ডিত হবে। আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী এই অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন যোগ্য এবং আপসযোগ্য হবে। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এ যা-ই উল্লেখ থাকুক না কেন, এই আইনের অধীনে সংগঠিত অপরাধ ১ম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে। তবে এই আইনের অধীনে সংগঠিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমলে গ্রহণ করা হবে না। এই আইনে যেহেতু প্রাপ্ত অভিযোগ আপসে নিষ্পত্তির বিধান আছে, সেক্ষেত্রে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বর বা ক্ষেত্রমতে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর কিংবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করতে পারবে। সন্তানের জন্য যে পিতা মাতা জীবনভর পরিশ্রম করে যান, সেই সন্তানের পিতা মাতার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, যা অবশ্য পালনীয়। সময়ের পরিক্রমায় সেই মূল্যবোধ লোপ পাওয়ার ফলেই আইনটি প্রণয়নের প্রয়োজন পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পিতা মাতাকে জোরপূর্বক বৃদ্ধাশ্রমে রাখা, দিনের পর দিন তাদের ভরণ-পোষণ ছাড়া, অবহেলা এবং অনাদরে একাকী জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হয়। সেই ক্ষেত্রে এরকম একটি আইন অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..