নারীর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে নারী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শান্তা মারিয়া : ১৯৭১ সাল। পিরোজপুর। পাকিস্তানি সৈন্যদের শিবিরে আসা যাওয়া করেন এক নারী। তাদের টুকটাক কাজকর্ম করে দেন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন। কৌশলে খবর সংগ্রহ করে সেই খবর তিনি পৌঁছে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। তার পাঠানো খবরের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি অপারেশনে সফল হন মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু একদিন তার পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। রাজাকাররা ধরিয়ে দেয় তাকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। তার হাত জিপের সঙ্গে বেঁধে দুই কিলোমিটার ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। রক্তে রঞ্জিত হয় পিরোজপুরের সড়ক। তারপর গুলি করে হত্যা করে তার লাশ ছুঁড়ে ফেলা হয় বলেশ্বর নদীতে। অসীম সাহসী এই নারী মুক্তিযোদ্ধার নাম ভাগিরথী। দেশের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিলেও তিনি পাননি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। ভাগিরথীর মতো আরও অনেক নারী স্বাধীনতার বেদীতে বলিদান করেছেন নিজের জীবন। তবু ভাগিরথীর মতো মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য নারীর আত্মত্যাগ ও সাহসী ভূমিকার কথা অনেকটা ইতিহাসের আড়ালেই রয়ে গেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এদেশের সকল শ্রেণি, পেশা, অবস্থানের মানুষের সার্বিক জনযুদ্ধ ছিল। এ যুদ্ধে নারী পুরুষ উভয়েই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু এই জনযুদ্ধে নারীর কৃতিত্বের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা তিন লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে, বন্দি শিবিরে আটকে রেখে ভয়াবহ নির্যাতন করেছে এবং অসংখ্য নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তবুও তারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে আপস করেননি। অনেকে জীবন দিয়েছেন তবু প্রকাশ করেননি মুক্তিযোদ্ধা স্বামী, ভাই, বাবা বা অন্যদের পরিচয়। আবার অনেক নারী অস্ত্রহাতে যুদ্ধও করেছেন রণাঙ্গনে। শিরিন বানু মিতিল, তারামন বিবি, কাঁকন বিবি এমনই বীর নারীদের মতো আরও অনেকে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী তাদের পরিচয় সেভাবে সামনে আসেনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল গেরিলা অপারেশনের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। যুদ্ধের খবর আদান প্রদান, অস্ত্র পৌঁছে দেওয়া, যোদ্ধাদের লুকিয়ে রাখা, বাড়িতে আশ্রয় দান, খাবার রান্না করে দেওয়া, পাকিস্তানিদের গতিবিধির খবর জোগাড় করা এসবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশটির সিংহভাগ করেছিলেন নারীরা। তারা এই ভূমিকা পালন করেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, চরম নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা নিয়েই। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া, খাবার সরবরাহ করা, অস্ত্র ও গোপন সংবাদ পৌঁছে দেওয়া এই প্রতিটি ভূমিকার জন্য অসংখ্য বাঙালি নারীকে পাকিবাহিনী হত্যা করেছে, ক্যাম্পে নিয়ে ধর্ষণ ও চরম নির্যাতন করেছে। কিন্তু নারীর এই বীরত্বের জন্য স্বাধীন দেশে তাঁকে তেমন কোনো স্বীকৃতিই দেওয়া হয়নি। ভারতে আশ্রয় শিবিরে নারীরা নার্স ও ডাক্তার হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। শরণার্থী শিবিরে অসুস্থদেরও সেবা দিয়েছেন নারী। ডা. সেতারা বীরপ্রতীক খেতাব পেলেও অন্য নারীরা কিন্তু কিছুই পাননি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও অনেক নারী কণ্ঠসৈনিক ছিলেন। তাদেরও রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। মুক্তির গান তথ্যচিত্রে আমরা দেখেছি কীভাবে শাহিন সামাদ, লুবনা মরিয়মসহ বেশ ক’জন নারী পুরুষ একটি ট্রাকে করে মুক্তাঞ্চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা দিয়েছেন। প্রেরণা দিয়েছেন সাধারণ মানুষকে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বমতামত গড়ে তোলার জন্য যে প্রবাসী বাঙালিরা কাজ করেছেন তাদের মধ্যেও ছিলেন অনেক নারী। নূরজাহান মুরশিদসহ এই নারীরা মুক্তিযুদ্ধের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছেন, জনমত গঠন করেছেন। তারাও কি খুব বেশি স্বীকৃতি পেয়েছেন? মুক্তিযুদ্ধে যে নারীরা পাকিস্তানি বর্বরদের গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন পরবর্তিতে সবচেয়ে বেশি সামাজিক বৈরিতার শিকার হয়েছিলেন তারাই। ক্যাম্পে আটক একজন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার মতো একজন নারী মুক্তিযোদ্ধাও একইভাবে শারীরিক মানসিক চরম নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে পুরুষযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেলেও নারীকে দেওয়া হয়নি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। বরং তাকে ‘অচ্ছুত’, ‘সম্ভ্রম হারানো’ ইত্যাদি ভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। অনেক নিপীড়িত নারী দেশ ছেড়ে চলে যেতেও বাধ্য হন। ড. নীলিমা ইব্রাহীমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইতে উল্লিখিত বিভিন্ন কেস স্টাডিতে দেখা যায়, যে নারীদের বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন পঁচাত্তরের পর কিভাবে তাদের আবার চরম লাঞ্ছনার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। যে বীরাঙ্গনা উপাধি ছিল গৌরবের সেটা পরবর্তিতে হয়ে দাঁড়ায় অপমানের। প্রখ্যাত সাহিত্যিক রিজিয়া রহমান তাঁর ‘রক্তের অক্ষরে’ উপন্যাসে নারীর জন্য প্রতিকূল সামাজিক অবস্থার ছবি এঁকেছেন পরম মমতায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান কারও চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এদেশের প্রায় তিন লাখ নারী। তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে এবং প্রচণ্ডভাবে আঘাত করা হয়েছে। এই প্রবল নির্যাতনকে ‘সম্ভ্রম হারানো’ বলা ঠিক নয়। কারণ ধর্ষণের শিকার যিনি হচ্ছেন তিনি ভিকটিম, তিনি তো সম্মানহানির কোনো কাজ করেননি। সম্ভ্রম হারিয়েছে নির্যাতক। সে মনুষত্ব হারিয়ে মানুষ থেকে পিশাচে পরিণত হয়েছে। একাত্তরে প্রকৃতপক্ষে সম্ভ্রম হারিয়েছিল পাকিস্তানিরাই। তারাই সারা বিশ্বের চোখে ধর্ষক, হানাদার ও নরপিশাচ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। তাদের প্রকৃত পৈশাচিক রূপ প্রকাশিত হয়েছে। অথচ যুদ্ধের পর নির্যাতনের শিকার নারীরা এক অন্যরকম বৈরিতার মুখোমুখি হন। তাদেরকে ‘সম্ভ্রম হারানো’ নারী বলে সমাজে একঘরে করে ফেলা হয়। যিনি ধর্ষণের শিকার হলেন তাকে মমতাভরে গ্রহণ করার পরিবর্তে নির্যাতনের দায় তার উপরেই চাপিয়ে পরিবারে ও সমাজে তাকে আশ্রয়হীন করে ফেলা হলো। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘কাঁচের সমুদ্র’ উপন্যাসেও এই বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। কল্পনা করুন একটি ছবি। বুকের রক্তে আঁকা স্বাধীন দেশের পতাকা হাতে বাড়ি ফিরছেন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন এক পা। দীর্ঘসময় বন্দি থাকতে হয়েছে তাকে শত্রু শিবিরে। তবে পাকিস্তানি ঘাতকদের শত নির্যাতনেও হার স্বীকার করেননি। আহত ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তিনি। অশেষ গৌরবে তাঁকে বরণ করে নিচ্ছে পরিবারের সদস্যরা। এই ছবিটির পাশাপাশি দেখা যাক আরেকটি ছবি। শত্রুশিবির থেকে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরছেন আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানি নরপশুদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনিও। শত নির্যাতনে তিনিও হার স্বীকার করেননি, প্রকাশ করেননি কোনো মুক্তিসেনার নাম। কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করেনি। তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে একটি হাসপাতালে। কারণ তিনি নারী। এভাবেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ- যা ছিল নারী-পুরুষের সম্মিলিত জনযুদ্ধ, নারীর জন্য জন্ম দেয় দ্বিতীয় দফা সংগ্রামের। যুদ্ধে ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার এই নারীরা তাদের পরিবার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হন। সেইসঙ্গে যুক্ত হয় যুদ্ধশিশুর বিষয়টিও। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এই নারীদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেন। তিনি এই নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি তাদের নিজের কন্যার মর্যাদায় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা নেন। কবি সুফিয়া কামাল, ড.নীলিমা ইব্রাহিমসহ বিভিন্ন সমাজ সেবকের উদ্যোগে সরকারি পর্যায়ে যুদ্ধাহত নারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি পর্যায়ে মাদার তেরেসা প্রতিষ্ঠিত মিশনারিজ অফ চ্যারিটিজ এর কর্মীরা যুদ্ধশিশু এবং নির্যাতনের শিকার নারীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেবা প্রতিষ্ঠানও এ কাজে এগিয়ে আসে। যুদ্ধশিশুদের অনেককে বিদেশে বিভিন্ন পরিবারে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। নির্যাতনের স্বীকার এই নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে অপেক্ষা করতে হয় চার দশকেরও বেশি সময়। তবে সকলে এখনও এই স্বীকৃতি পাননি। এই নারীরা বীরযোদ্ধা। তাদের যথাযথ সম্মান জানাতে হবে, স্বীকৃতি দিতে হবে। এবং তাদের বিভিন্ন সহায়তাও দিতে হবে। তাদের আত্মত্যাগের কথা প্রচার করতে হবে গৌরব সহকারে। তারা আমাদের জাতির জন্য গৌরবের। তারা যুদ্ধের বীর নারী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে নারীরা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছেন, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন, যারা খবর পৌঁছে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, যারা পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের বিজয়ের ইতিহাস, গৌরবের ইতিহাস।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..