বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসবের ঘোষণা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৫০ দেশ থেকে বিশ সহস্রাধিক যুব প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ১৯তম বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব রাশিয়ার সোচিতে অনুষ্ঠিত হলো। ”শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সংগ্রাম করি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে - অতীতের মর্যাদাকে সমুন্নত রেখে, ভবিষ্যত বিনির্মানে” - এ শ্লোগানকে ধারণ করে অনুষ্ঠিত এ উৎসবের ঘোষণা - আমরা রাশিয়ার জনগন, বিশেষ করে যুব সমাজকে অভিনন্দন জানাচ্ছি, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোম ও উৎসাহ নিয়ে সারা বিশ্বের সেইসব যুবকদের স্বাগত জানানোর জন্য, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যাঁরা আপোষহীন লড়াই করছে। আমরা স্মরণ করছি, রাশিয়ার জনগনের ঐতিহাসিক সংগ্রামকে। তাঁদের গৌরবময় বিপ্লবী ইতিহাসকেযার চুড়ান্ত মুহুর্ত ছিল ১৯১৭ সালে মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে। যখন প্রমাণিত হয়েছে মানুষে মানুষে বিভেদ না করেও উন্নত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। আমরা বিশেষ করে স্মরণ করি, জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাজি ফ্যসিবাদকে প্রতিরোধের লড়াইকে, যাঁর নেতৃত্বে ছিল সোভিয়েট ইউনিয়ন, বিশ্ব শান্তি, ন্যায় ও সমাজ প্রগতির জন্য।আমরা এখানে মিলিত হয়েছি, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ফ্যাসীবাদের সবচেয়ে বড় পরাজয় ঘটেছিল। যেখানে জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্খার বিজয়ে সমগ্র বিশ্বের প্রগতিশীল, কমিউনিস্ট, ফ্যাসীবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর শপথ নিয়েছিল। পরাস্ত করেছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গর্ভে সৃষ্ট নাজি ফ্যাসীবাদকে। আমরা শ্রদ্ধা জানাই, লাখো মানুষের আত্মদানকে। যাঁদের মধ্যে রয়েছে অগনিত নারী ও যুব। য়াঁরা জীবন দিয়েছিল ফ্যাসীবাদের বর্বর ও রক্তাক্ত তান্ডবকে রুখে দিতে। বিশেষত সোভিয়েট ইউনিয়নের বীর জনতার মহান আত্মদানকে। আজও সে স্মৃতি রাশিয়ার জনগণের মনে ফ্যাসীবাদবিরোধী চেতনাকে জাগরত রেখেছে। বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে আমরা যারা এখানে সমবেত হয়েছি তারা গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই রাশিয়ার জনগণের প্রতিআর অবশ্যই সোভিয়েট ইউনিয়নের জনগণ যাঁরা এর আগেও দু’ দুবার বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব আয়োজনের কষ্ট স্বীকার করেছিল ১৯৫৭ সালে ও ১৯৮৫ সালে। ১৯তম বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন, যেখানে সমবেত হওয়া সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, প্রগতিশীল এবং বিপ্লবী যুবরা এ প্রত্যয় পূণর্ব্যক্ত করছে যে, বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসবে প্রতিক্রিয়াশীল, ফ্যাসিস্ট, জিওনিস্টদের কোন স্থান নেই। উৎসবের মৌল চরিত্র বজায় রাখতে আমরা ফ্যাসীবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের আপোষহীন অবস্থানকে সমর্থন করছি। ১৯তম বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব স্মরণ করছে বিশ্বের দেশে দেশে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, জাতীয় মুক্তি ও জনগণের সার্বোভৌমত্ব রক্ষায় যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছে তাঁদেরকে। একারণেই জনগনের লড়াইয়ে নেতৃত্বদানকারী আর্নেস্টো চে গুয়েভারা, ফিডেল ক্যাস্ট্রো, মোহাম্মাদ আব্দেল আজিজ ও রবার্ট গেব্রিয়েল মুগাবেকে আমরা এবারের উৎসবে বিশেষভাবে স্মরণ করেছি। ১৯৪৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসবে ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সমুন্নত রেখেই বিশ্ব গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের নেতৃত্বে উৎসব আজ ৭০ বছরে পদার্পন করেছে। দীর্ঘ এ পথ পরিক্রমায় বিম্ব বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্রো সবচেয়ে বড় মিলন মেলা হিসেবে। ৭০ বছরে উৎসব পরিণত হয়েছে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, স্বেরাচার, ফ্যাসীবাদ, যুদাধ, দখলদারিত্ব, আগ্রাসী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনগণের সার্বোভৌমত্ব রক্ষার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ যুবকদের বিশ্ব সভায়। যুবকদের উন্নততর জীবন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে শিক্ষা - কাজ - সাস্থ্য, খেলাধূলা, বিনোদনের দাবীতে গড়ে ৗঠা বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামকে আমরা সমর্থন জানাই। বিশ্বের যুবশক্তিকে বিপথগামীকরার, নিপীড়ণ - নির্যাতনের অনিরাপদ জীবনে ঠেলে দেয়ার পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আমরা নাকচ করছি। কেননা আমরা জানি, বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিগুলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থারহাতিয়ার হিসেবে যুবকদের মুক্তচিন্তাকে বাঁধাগ্রস্থ করছে। জনগনকে দূর্বল, নির্যাতিত ও প্রতিরোধ শক্তিহীন নিরব দর্শকে পরিণত করতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ১৮তম বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসবের পর এসময়ে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তার আগ্রাসী থাবা বিস্তারে আরো সক্রিয় হয়েছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজিৈতক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বহুমাত্রিক আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় সাম্রাজ্যবাদ আজ যে কোন অন্যায় আক্রমণে দ্বিধাহীন। পুঁজিবাদের ভ্রান্তনীতির নগ্ন হস্তক্ষেপে বিশ্বের দেশে দেশে মানুষ আজ উদ্বাস্তু হয়ে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে দারিদ্র আর দূর্দশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। একই সময়ে পারমানবিক বিপর্যয়ের বিপদ এখনো বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র এর মিত্র রাষ্ট্রসমূহের সামরিকীকরণে প্রতিযোগিতা তাদের সেই অসৎ উদ্দেশ্যকে জোড়ালো করেছে। সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের কথিত ন্যায়ের যুদ্ধে অন্যান্য দেশের সার্বোভৌমত্বকে অমর্যাদা করতে পিছপা হয়না। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের মুনাফাকে বাড়াতে ণ্যায়ের নামে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন দেশের ওপর। জাতিসংঘের সনদকে পাশ কাটিয়ে ণ্যাটোর অশুভ উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নে তারা যেকোন দেশের স্বাধীনতা, সার্বোভৌমত্বকে ক্সুন্ন করতে তৎপর। মধ্রপ্রাচ্যের দেশসমূহের জনগণ প্রতক্ষ্য করছে সিরিয়ার ঘটনাবলী কিভাবে তাদেরকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক বিচ্ছন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে মদদ দিয়ে তারা আজ বিশ্ব জুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৬ সালের গ্রীষ্মকালে ওয়ারসোতে ন্যাটোর সম্মেলনে চুক্তির আলোকে তাদের এমনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশসমূহের অব্যাহত সামরিকীকরণ প্রবণতা আরো জোড়দার হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার প্রগতিশীল সরকারসমূহের উপর নানা ধরণের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। ইসরাইল কর্তৃক প্যালেস্টাইনকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছ্ েদীর্ঘদিন ধরে। অন্যান্য অনেক দেশে তাদের আজ্ঞাবহ সরকার দিয়ে জনগণকে বিপর্যস্থ করে লূটপাটের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে। আফ্রিকার দেশসমূহের জনগণ পৃথকীকরনের পর থেকে নতুন করে নয়া উপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। জনগণের অধিকার বঞ্চিত শুধু না, জাতীয় সার্বোভৌমত্ব হারিয়ে ওয়েস্টার্ণ সাহারা আজ বিশ্বের শেষ উপনিবেশ রাস্ট্র্। মরক্কো আজও তাদেরকে শরনার্থী শিবিরে ঘিরে রেখেছে। এশিয়া ও প্যাসিফিকের দেশগুলোতে পারমানবিক হুমকি জিইয়ে রাখা, সামরিকীকরণ বৃদ্ধি করা, বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসন, জাতীয় সম্পদকে গ্রাস করার পাঁতারা অব্যাহত রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান চরিত্র হচ্ছে বহুজাতিক পুঁজির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরা, সর্বক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল নীতিকে উৎসাহিত করা, এমনকি যেসব দেশে যুদ্ধাবস্থা নেই সেখানেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া। উগ্র জাতীয়তাবাদী শোষণ, বিদেশী শক্তির কল্পিত ভয় এসবের মাধ্যমে জনগণের মতামতকে বিভ্রান্ত করে প্রতিক্রিয়শীল, দক্ষিণপন্থীদের হাতে অপপ্রচারের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। সেইসাথে কমিউনিস্টবিরোধী অপপ্রচারকে উষ্কে দেয়া হচ্ছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে ১৯তম বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব বিশ্বের সকল যুবদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, যুবদেরকে সংগঠিত করে প্রতিটি দেশে শ্রমিক ও জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই জোড়দারে ভূমিকা রাখুন। সাম্রাজ্যবাদের ষঢ়যন্ত্র নস্যাৎ করতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলুন। শান্তি আন্দেলনে সম্পৃক্ত শক্তিসমূহের সাথে নিবীড় যোগাযোগ গড়ে তুলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তিকে রুখে দিন। আমরা নিপীড়ক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে মোকাবেলায় লড়াইয়ে সামিল হওয়ার আহ্বান জানাই। বিম্ব যুব উৎসব কমিউনিস্ট বিরোধী প্রচারণাকে নাকচ করেছে। আমরা ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশসমূহকে এই সংস্থা থেকে নিজেদেরকে প্রত্যাহারের দাবী জানাই এবং সশস্ত্র সামরিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়া থেকে বিরত থাকতে সকল দেশের প্রতি আহ্বান জানাই। আমরা সমর্থন জানাই যুদ্ধ, সংকট, বৈষম্য, বেকারত্ব, দারিদ্রবিরোধী প্রতিটি সংগ্রামকে, স্বাধীনতা, শান্তি, সম্প্রীতি ও মুক্তচিন্তার জন্য লড়াইকে। প্রিয় বন্ধুরা, পুঁজিবাদী অর্থনীতি শুধু সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকেই নিশ্চিত করে না, সেইসাথে বৈষম্য ও সামাজিহ অন্যয্যতাকেও প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্বের ১% ব্যাক্তির হাতে তাই ৫০% মানুষের সম্পদ পুঞিজভুত হয়ে পড়েছে। উন্নয়নের নামে তাই বিশ্ব জুড়ে অসম প্রতিযোগিতা আর অনৈতিক বিধি ব্যবস্থা আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে যুবকরা আজ বেকারত্ব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পাঁকে আটকা পড়েছে। বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব তাই এ অসাম্যের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বৈষম্যমূলক সামাজিক ব্যবস্থার পুঁজিবাদী অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় চিরস্থায়ী হতে পারে না। কিন্তু তাকে প্রতিরোধ করতে হলে নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই। আর সেই সংগ্রামের পথ রচনার ঐতিহাসিক দ্বায়িত্ব যুব সমাজের। আমরা এ উৎসব থেকে প্রত্যয় ঘোষণা করছি যে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সেই লড়াইয়ে বিজযী না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। ”শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সংগ্রাম করি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে - অতীতের মর্যাদাকে সমুন্নত রেখে, ভবিষ্যত বিনির্মানে”। বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব অমর হোক। জনগণের বন্ধুত্ব অমর হোক। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই অমর হোক। অনুবাদ : হাফিজ আদনান রিয়াদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..