লড়তে শেখায় লাক্সমা শ্রমিকের দিনরাতের আন্দোলন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মঞ্জুর মঈন: টানা পাঁচদিন লাগাতার অবস্থান আন্দোলন করে বকেয়া পাওনা আদায় করলো গাজীপুরের লাক্সমা সোয়েটার কারখনার শ্রমিকরা। এই আন্দোলনের কাছে পরাজিত হয়েছে শ্রমিকদের আইনানুগ পাওনা বঞ্চিত করে কারখানা বন্ধ করে দেয়ার সকল অপকৌশল। গত ২৬ নভেম্বর তিন মাসের বকেয়া মজুরি আর বন্ধ কারখান খুলে দেয়ার দাবিতে দেশের গার্মেন্ট মালিকদের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান শুরু করে শ্রমিকরা। মালিক অবশেষে স্বীকার করেছেন যে তিনি এই কারখানা একেবারে বন্ধ করেছেন। আন্দোলনের চাপে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সাথে চুক্তি করেছে চাকরি অবসানের জন্য এগারশো শ্রমিককে তাদের পাওনা আগামী ২৫ জানুয়ারি ২০১৮ পরিশোধ করা হবে। এদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের পরম ভরসাস্থল গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। এই পাঁচদিন শ্রমিকরা আক্ষরিক অর্থে রাস্তায় কাটিয়েছে, খোলা আকাশের নীচে অবস্থান করেছে রাত দিন। এ আন্দোলন শ্রমিকদের শিখিয়েছে অনেক কিছু এবং তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে দিয়েছে। গত একমাস ধরে শ্রমিকরা বকেয়া মজুরির দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। মালিকপক্ষের আশ্বাসের ভিত্তিতে বকেয়া মজুরি আনতে কারখনায় গিয়ে নির্মম পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কারখানা বন্ধ করতে হলে যে সকল পাওনা শ্রমিককে দিতে হয় সেসব দূরের কথা বকেয়া মজুরি পাওয়ার আশাই এক পর্যায়ে শ্রমিকরা ছেড়ে দিচ্ছিলো প্রায়। কিন্তু সংগঠন এবং আন্দোলন শ্রমিকদের বিজয়ী করেছে। অসহায় আর্ত চোখে মুখে সফলতার প্রত্যয়ী হাসি ফুটিয়েছে। যে শ্রমিকরা ঢাকায় এসে অবস্থান নিয়েছিল তাদের হাত ছিল শূন্য, প্রত্যেকের কয়েক মাসের ঘর ভাড়া বাকি। একেক জনের মুদির দোকানসহ এলাকায় ধার-দেনা করে সঙ্গিন অবস্থা। এই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে শ্রমিকরা দেখেছে সমাজের বহু মানুষ তাদের পাশে আছে। যারা শ্রমিকদের তিন বেলার খাবার থেকে শুরু করে আন্দোলনের অন্যান্য খরচের যোগান দেয়া, মালিকদের অব্যাহত চাপ উপেক্ষা করে গণমাধ্যমে আন্দোলনের খবর তুলে ধরা, অবস্থানস্থলে উপস্থিত হয়ে দাবির প্রতি সমর্থন এবং শ্রমিকদের প্রতি সংহতি জানানোসহ নানান ভাবে আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা এই আন্দোলনে তাদের মন নিবিষ্ট রেখেছিল, তারা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছিলো। আশেপাশের কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন ও শ্রমিকদের খোঁজখবর নিতে প্রতিদিন ছুটির পর অবস্থানস্থলে আসতো। এই আন্দোলনের তিনশোরও বেশি নারী শ্রমিক প্রতিদিন রাত এগারোটার পর প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে পুরানা পল্টনে মুক্তিভবনে এসেছেন, রাতে সেখানে ঘুমিয়ে আবার খুব ভোরে মিছিল করে অবস্থানে ফিরেছেন। সাধারণ পথচারী, সকাল বেলা যারা হাঁটতে বের হন, ট্রাফিক পুলিশ, বাস-গাড়িতে সওয়ার মানুষদের চোখে মুখে এই শ্রমিকদের জন্য আমরা মায়া আর সহানুভূতি দেখেছি। ‘তিন মাস বেতন দেয় না - কেউ তার খবর নেয় না’ এই একটি স্লোগানই মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি এবং বহু প্রশ্নের তড়িৎ জবাব দিতে পেরেছে। কাওরানবাজারের মাছের আড়তের শ্রমিকরা বিজিএমইএ ভবনের পাশেই ফুটপাথে যে ছোট ভাতের দোকানগুলোতে খায়, সেই দোকানদাররা এই দুর্মূল্যের বাজারে পঁচিশ টাকায় সকালে আলুভর্তা ডাল ভাত, দুপুরে আর রাতে ত্রিশ টাকায় ডিম ডাল ভাত খাওয়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিল। এত শ্রমিক এমন শৃংখলার সাথে তিন বেলা খেয়েছে, কখনো অবস্থানস্থল ফাঁকা হয়নি। প্রথম দিন লাক্সমা শ্রমিকরা নিজেরা চাঁদা তুলে খাবারের অর্থ যোগান দিয়েছে। এরপর থেকে গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র নেতাকর্মীরা শ্রমিক ও দরদিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আন্দোলনের ব্যয় নির্বাহ করেছে। শ্রমিকদের এই আন্দোলনে অপরাপর শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি জানিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, শিল্পী, সাংস্কৃতিককর্মীরাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নেতৃবৃন্দ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে শক্তি যুগিয়েছেন। গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র বিভিন্ন অঞ্চল পর্যায় থেকে লাক্সমা শ্রমিকদের আন্দোলনের সমর্থনে সকাল সাড়ে ৭টায় সকল শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করার জন্য চাপ বাড়ছিলো। নিশ্চিত করে বলা যায়, মালিকরাও এই আতঙ্কে ছিলেন যে, সকাল বেলা কারখানা খোলার সময় এলাকায় এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি দেয়া হলে মজুরি বৃদ্ধির দাবির সাথে মিলে এ আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পরতে পারে। মালিকরা কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকেও এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল, গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি পয়সা খরচ করে শ্রমিকদের খাইয়েদাইয়ে লাগাতার অবস্থান ধরে রেখেছে শুধুমাত্র গার্মেন্ট শিল্পকে অস্থিতিশীল করার অসৎ উদ্দেশ্য থেকে। ফলে কয়েকটি গণমাধ্যম আন্দোলন সম্পর্কে টানা নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করেছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা সাংবাদিকতার অতি আবশ্যিক নৈতিক বিষয়গুলোও লঙ্ঘন করেছে। আমরা বক্তৃতায় সাধারণভাবে বলে থাকি দেশ চালায় সরকার, আর সেই সরকারকে চালায় মালিকরা। এই বক্তব্যের সত্যতা ও যথার্থতার বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নাই। তার পরও লাগাতার অবস্থানের তৃতীয় দিনে নিজ চোখে দেখা একটি ঘটনা এখনো বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হয়। ঐ দিন বিজিএমইএ ভবন থেকে আমাদের অনুরোধ করা হলো আমরা যেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করি। কারখানার দশজন শ্রমিক এবং আমরা গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসির পাঁচজন নেতা গিয়েছিলাম তাদের দপ্তরে। আমরা তাদের বলি, এর আগে দু’বার আমরা এখানে এসেছি, ঘেরাও করেছিলাম, আলোচনা হয়েছে, আপনারা তারিখ দিয়ে বকেয়া পরিশোধের অঙ্গীকার করেছিলেন, সে তারিখে বকেয়া মজুরি আনতে গিয়ে পুলিশের মার খেয়ে শ্রমিকদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে, আজ আর আমাদের নতুন কোন কথা নেই, শ্রমিকদের দাবি মেনে নিলেই সংকটের সমাধান হবে। তারা সুনির্দিষ্ট কোন কথা বলতে না পারায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই সে সভা ভেঙে যায়। সভা শুরুর আগে কিছুক্ষণের মধ্যে সভা শুরু হবে এমন সময় আমাদের সামনে বসে বিজিএমইএ’র এক কর্মচারী তার টুকিটাকি কাজ করছিলেন। হঠাৎ করে তিনি আমাদের সামনেই তার ফোন থেকে মনে হয় পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কোন বড় কর্তাব্যক্তিকে টেলিফোন করে আধা মিনিটেরও কম সময়ে যে হুকুম দিলেন তা দেখে আমাদের আকাশ থেকে পরার মত অবস্থা। তিনি বললেন, আমার একজন সহ-সভাপতি কাকলীতে আছেন, তিনি মহাখালী, ফিলিপস, কাওরানবাজার হয়ে বিজিএমইএ আসবেন, রাস্তা খালি করেন। ঐ প্রান্তের ব্যক্তিকে দু’বারের বেশি তিনবার জি স্যার বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি টেলিফোন রাখলেন। তারপর অন্য কাউকে ফোন করে বললেন- এখনই টেনে দেবে। টেলিফোনে নির্দেশ দিয়ে মানুষ খুন করানো যায় এটা নিয়ে আমার সন্দেহ নাই; কিন্তু আধা মিনিটের টেলিফোন নির্দেশে ঢাকা শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করার মত ক্ষমতাবান মানুষ দেখার আচানক ধাক্কা আমি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারি নাই। এ দেশের মালিক সমিতির কর্মচারীদের হাতে এত ক্ষমতা জমা হয়েছে, তারা শ্রমিকদের আন্দোলনের খবর আটকে দেবে এটাই স্বাভাবিক। চাইলে তারা নিশ্চয়ই সব পত্রপত্রিকা বন্ধই করে দিতে পারে। লাক্সমা কারখানার শ্রমিকরা গত ৩০ অক্টোবর সকালে কাজে যোগ দিতে কারখানায় গিয়ে দেখে মালিক লোকসানের অজুহাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে নোটিশ টানিয়ে দিয়েছে। তার আগে থেকেই কারখানার শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া রাখা হয়েছিল। আমাদের গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা হলো, একের পর এক কারখানা বন্ধ করা কিংবা স্থানান্তর করার ক্ষেত্রে মালিকরা আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করছে না। সবকটি ক্ষেত্রেই প্রথমে শ্রমিকদের কয়েক মাসের মজুরি বকেয়া করা হয়, তারপর কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকরা আরো দুই তিন মাস দ্বারে দ্বারে ঘুরে যখন কোনও উপায় বের করতে পারে না তখন তাদের বকেয়া মজুরি ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করা হয়। কখনো সেটাও পুরোটা দেয়া হয় না। কারখানা বন্ধ করলে বা চাকরিচ্যুত করলে সার্ভিস বেনিফিট, অর্জিত ছুটির টাকাসহ শ্রমিকের যে সব পাওনা আছে তা থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করার জন্যই মালিকরা এই ঘৃণ্য অপকৌশল অবলম্বন করছে। যে শ্রমিকের শ্রমে-ঘামে মালিকদের নতুন কারখানা হচ্ছে বা সম্পদের পাহাড় হয়েছে তাদেরই সারা জীবনের গচ্ছিত উপার্জন মেরে দিয়ে এই মালিকরা ঝামেলা মুক্ত হচ্ছে। বিগত সময়ে এই কায়দায় শ্রমিক ঠকানো হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিউ ফ্যাশন, ডডি এপারেলস, টেক্সটেক গার্মেন্ট, ওভারসিজ ফ্যাশন কারখানায় সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে। গত কোরবানি ঈদের দু’দিন আগে গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করলে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে টেক্সটেক গার্মেন্টের কিছু মেশিনপত্র বিক্রি করে শ্রমিকদের এক মাসের মজুরি দেয়া হয়। বিজিএমইএ সেই ঘটনা ফলাও করে প্রচার করে বলেছিল, ঈদের আগে কারখানার মেশিনপত্র বিক্রি করে হলেও সকল কারখানায় বেতন- বোনাস দেয়া হয়েছে। অথচ এই কারখনার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি এবং আইনানুগ পাওনার বিষয়ে এখনো কোনো সমাধানই হয় নাই। কোন ভাবেই মালিকের কাছ থেকে পাওনা আদায় করতে না পেরে শ্রমিকরা পাওনা পাবে সে আশা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছে। এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেড কারখানা। একবার গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, দুই দফা বিজিএমইএ এবং সর্বশেষ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ঘেরাও করেও কোন প্রতিকার না পেয়ে শ্রমিকরা লাগাতার অবস্থান শুরু করে। সরকারের সাথে মালিকদের কোনো গোপন সমঝোতা না হলে মালিকরা বারবার একই কায়দায় গোটা কর্মজীবনের উপার্জিত পাওনা থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করতে পারার কথা না। সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদেই একের পর এক কারখানায় মালিকরা আইন ভঙ্গ করছে। তবে এই জুলুম যে অব্যাহত ভাবে এবং বিনা বাধায় চালিয়ে যাওয়া যাবে না সেই বার্তাই দিলো লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেড কারখনার শ্রমিকদের অবস্থান আন্দোলন। লাক্সমা শ্রমিকদের আন্দোলনে বিজয় অন্য শ্রমিকদের এই শিক্ষাই দেয়- মালিকদের জুলুমের কাছে অসহায় ভাবে পরাজয় মেনে নিয়ে নীরবে চলে যাওয়ার বিকল্প আরেকটি পথ আছে। সেই পথ সংগঠন ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জুলুমের জবাব দেয়া এবং অধিকার আদায় করে বিজয়ী হওয়ার পথ। লেখক: আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..