বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রুহিন হোসেন প্রিন্স: সকল যুক্তি, তথ্য, জনমত উপেক্ষা করে ১ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে এই সরকারের আমলে ৮ম বারের মত বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলো। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের একক এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেরটরি কমিশনের (বিইআরসি)। এই দাম নির্ধারণের আগে গণশুনানির আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। অতীতের তুলনায় এবার দীর্ঘ গণশুনানি হলো। অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ও প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাগুলো ছিল বেশি। ক্যাব, সিপিবি, বাসদসহ বামপন্থি দলগুলোর ‘দাম কমানোর প্রস্তাব’ নিয়েও গণশুনানি হয়। গণশুনানিতে যুক্তি, তর্ক, জনমত সব মিলিয়ে প্রমাণ করা হয় যে, ‘বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ানো নয় বরং কমানোই যুক্তিসঙ্গত’। তখনই নতুন করে শুরু হলো সরকার, জ্বালানি ব্যবসায়ী, কমিশন ভোগী, দেশি-বিদেশি লুটেরাদের বিশেষ তৎপরতা। এই তৎপরতার পেছনের শক্তি হলো সরকার প্রণীত ‘পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান-২০১৬’। বিগত দিনে বিএনপি সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যাপ্ত ছিল না। দেশে বিদ্যুৎ এর প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা বেড়েই চলেছে। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ সংকটকে জিম্মি করে, সরকার অধিক অর্থ ব্যয়ে, অর্থনীতিতে বোঝা চাপিয়ে রেন্টাল, কুইক রেন্টালসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এর নীতি গ্রহণ করে। ঐ সময় সরকারের পক্ষ থেকে প্রণীত জ্বালানি পথ নকশায় বলা হয়, এখন উৎপাদন খরচ বাড়লেও ভবিষ্যতে উৎপাদন খরচ কমবে। ২০১৪ সাল থেকে বিদ্যুৎ এর দাম কমানো হবে। সরকার সেই পথে না হেঁটে উল্টো পথে চলতে, ‘মাস্টার প্ল্যান ২০১৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে অগ্রসর হয়। বিদ্যুৎ এর দাম কমানোর যুক্তি তাই এসব কর্তাব্যক্তি আর সরকারের কাছে অসহনীয় ওঠে। তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ও সাবেক জ্বালানি সচিব, এসডিজি’র প্রধান সমন্বয়ক ও পিজিসিবি’র চেয়ারম্যান বিশেষভাবে তৎপর হন। আর বিইআরসি নিজেকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমাণ করে সরকারের তাবেদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে অনৈতিকভাবে বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ মেনে নেয়নি। ৩০ নভেম্বর এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বামপন্থিদের আহ্বানে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষেরা হরতালের সমর্থনে রাজপথে নেমে আসেন। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা প্রত্যাহারে এখনও বিক্ষোভ, সমাবেশ চলছে। বিশিষ্টজনদের লেখনি, প্রতিবাদ চলছে। চলমান আন্দোলন- একথাই বলছে যে, মানুষ এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি, নেবে না। লাগাতার কর্মসূচি চলবে। দুই. দাম কমানোর গণশুনানিতে কী যুক্তি ছিল? গণশুনানিতে দাম বাড়ানোর পক্ষে কোম্পানিগুলো ও পিডিবি যেসব যুক্তি দিয়েছিল, তার প্রধান কথা ছিল ব্যয় বাড়ছে, তাই দাম বাড়াতে হবে। ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল- ক) বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল বাবদ ২৬ পয়সা, খ) ভর্তুকির সুদ বাবদ ২১ পয়সা, গ) মেঘনা ঘাট আইপিপিতে ফার্নেস ওয়েলের পরিবর্তে ডিজেল ব্যবহারে ঘাটতি ১৪ পয়সা। আর আয় বৃদ্ধিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, ক) ১৩২ কেভি লেভেলে বিদ্যুৎ বিক্রিতে উদ্ধৃত্ত আয় ৮ পয়সা ও খ) পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন চার্জ বাবদ আয় ৪ পয়সা। এসব হিসেব অন্তর্ভুক্ত হলে বিদ্যুৎ এর উৎপাদন ব্যয় কমেছে, গণশুনানিতে এটা প্রমাণ করা গেছে। গণশুনানিতে দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞরা এটাও প্রমাণ করেছেন যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ক্ষতি হয়েছে ৮১৭১ কোটি টাকা। এই লোকসানগুলো হলো : ক) রেন্টাল-কুইক রেন্টাল এর গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় না করে ঐ গ্যাস সরকারি খাতের প্ল্যান্টসমূহ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সাশ্রয় হতো ১৩০১ কোটি টাকা। খ) গ্যাসে মেঘনাঘাট আইপিপিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে বাঁচতো ১৩২৭ কোটি টাকা। গ) বিদ্যুৎ উৎপাদনে আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দামের সাথে সমন্বয় করলে বাঁচতো ২১১১ কোটি টাকা। ঘ) বেশি খরচের ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কম উৎপাদন করে সাশ্রয় করা যেত ৭৫২ কোটি টাকা। ঙ) রেন্টাল-কুইক রেন্টাল এর পেমেন্ট যৌক্তিক পর্যায়ে এনে সাশ্রয় করা যেত ১৭৮৬ কোটি টাকা। আর এসব পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা বিইআরসি’র নির্দেশনায় ছিল। তাই এসব হিসেবে দেখা যায় ঐ অর্থবছরে উল্লিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করলে ব্যয় কমানো যেত অন্তত ৭৮৩৮ কোটি টাকা অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় কমতো ইউনিট প্রতি ১.৫৬ টাকা। গণশুনানিতে দাম কমানোর পক্ষে এসব যুক্তি হাজির করে দাম কমানোর কথা বলা হয়। এর বিপরীতে যুক্তিযুক্ত যুক্তি দিতে পারেনি কোম্পানিগুলো। বিইআরসি আইনে ক) ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষা করা, খ) স্বল্পতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা, গ) যৌক্তিক উৎপাদন ব্যয় হারের সাথে মূল্য হার সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, ঘ) অসাধু বিদ্যুৎ/জ্বালানি ব্যবসা বিরোধীদের প্রতিকার করা, ঙ) বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয় নিশ্চিত করা প্রভৃতি বলা আছে। তাই বিইআরসিও এসব যুক্তি উপেক্ষা করতে পারেনি গণশুনানিতে। গণশুনানিতে উল্লিখিত বিষয় ছাড়া দুর্নীতি, অপচয়, অদক্ষতাসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনা হয় মূল্যবৃদ্ধিতে অর্থনীতি ও জনজীবনে এর প্রভাব নিয়েও। এসব তথ্য-উপাত্ত প্রচার মাধ্যমে আসায় সাধারণ মানুষের ধারণা হয়েছিল যে, দাম না কমলেও এবার দাম বাড়বে না। সরকার সাধারণ মানুষের এই ধারণা ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে লুটেরা ব্যবসায়ী ও দেশি-বিদেশি কমিশনভোগীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দাম বাড়ানোর পথেই হাঁটলো। যুক্তি দিতে না পেরে বলা হচ্ছে- এই সামান্য (!) মূল্যবৃদ্ধি মানুষ মেনে নেবে। তথ্য বলছে- এই মূল্যবৃদ্ধিতে সরাসরি সরকার জনগণের পকেট কাটবে বছরে অন্তত: ১৭০০ কোটি টাকা। কিন্তু বিদ্যুৎ এর দাম বাড়লে, উৎপাদন খরচ বাড়বে, বাড়বে জিনিসপত্রের দাম, যোগাযোগ, বাড়ি ভাড়া প্রভৃতি। এই চোরাই পথের খরচ বৃদ্ধি পোষানো হবে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে। যা কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। তিন. দেশে লুটপাট সর্বত্র। মুক্তবাজারের নামে লুটপাটের অর্থনীতির উপর ভর করে চলমান দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি এই লুটপাটের ধারণাকেই এগিয়ে নিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের ছোট-খাট দখল, বড় বড় দখল, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট, নদী দখল এগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক দখল। নানা জায়গায় আইন করে জনগণের পকেট কেটে নেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে উন্নয়নের নামে বড় বড় প্রকল্পে। যা হয়ে দাঁড়িয়েছে লুটপাটের আরেক বড় ক্ষেত্র। এর থেকে জনগণ যতটুকু সুফল পাচ্ছে তার থেকে বেশি পাচ্ছে লুটপাটকারী আর কমিশন ভোগীরা। এদের রুখে দাঁড়াতে হবে। বিদ্যুৎ এর মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদের আন্দোলন তাই শুধু দাম কমানোর আন্দোলন নয়। সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প পথ দেখানোর আন্দোলন। যা আমাদের ভবিষ্যত জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে সর্বত্র বিদ্যুৎ ব্যবহারে সমতা নিশ্চিত করবে। এই আন্দোলন হলো চলমান লুটপাটের ধারার বিরুদ্ধে আন্দোলন। এই আন্দোলন সাধারণ মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে সাহায্য করবে যে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির ধারার বিপরীতে নীতিনিষ্ঠ বিকল্প রাজনীতিই পারে সাধারণ মানুষের স্বার্থ নিশ্চিত করতে। সেই বিকল্প ধারা পথ নির্দেশনা হাজির করে সিপিবিসহ বামপন্থি প্রগতিশীলরা যুক্তিতর্কে আর রাজপথে থাকছে। এই আন্দোলনের চলমান ধারা অব্যাহত রাখা তাই যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের দায়িত্ব। বাম-প্রগতিশীল দাবিদার দল, সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গের তো বটেই। লেখক: সম্পাদক, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..