চালের দাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
চালসহ কৃষি পণ্যের উৎপাদক হলো দেশের কৃষক। কিন্তু খুচরা ক্রেতার কাছে সরাসরি তাদের উৎপন্ন ফসল তারা বিক্রি করতে পারে না। কৃষকরা উৎপাদক হলেও তারা বাজারের প্রধান বিক্রেতা নয়। খুচরা দোকানদারেরাও প্রধান বিক্রেতা নয়। মধ্যসত্বভোগী ফরিয়া-কারবারিরা ‘প্রধান বিক্রেতার’ আসন দখল করে নিয়েছে। তারা উৎপাদনকারী না হয়েও, ‘বিক্রেতাদের’ অশুভ সিন্ডিকেট গঠন করে কৃষক ও ক্রেতা-সাধারণ উভয়ের কাছ থেকেই সুবিধা উঠিয়ে নিচ্ছে। এরাই বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। অগণিত ক্রেতা-সাধারণের ওপর এরাই উচ্চমূল্যের বোঝা চাপিয়ে রাতারাতি বিপুল মুনাফা কামিয়ে নেয়। এই বোঝা বইবার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের না থাকায়, এর ফলে তাদের ওপর নেমে আসে সর্বনাশ! চাল যেমন একটি পণ্য, মানুষের ‘শ্রম শক্তিও’ তেমনই একটি পণ্য। এদেশের প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্র এমনই যে, অধিকাংশ মানুষ যা বিক্রি করে সেই ‘শ্রম-শক্তির’ দাম একটু-একটু করে বাড়লেও, তা যে পরিমাণে বাড়ে তার চেয়ে লাফিয়ে-লাফিয়ে কয়েক ধাপ বেশি পরিমাণে বাড়ে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের দাম। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এটিই হলো একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা যায় যে, দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন আয়ের ৬০% থেকে ৬৫% ব্যয় হয় চালের পেছনে। মফস্বলের একজন ভ্যানচালক দৈনিক যা আয় করেন তা থেকে প্রথমেই তাকে পরিবারের জন্য ২ কেজি চাল কিনে নিতে হয়। চাল কেনার পর তার হাতে অবশিষ্ট থাকা টাকা দিয়ে তাকে তেল-লবণ-সবজি ইত্যাদি কিনতে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়তে হয়। দেশের ৪০ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিকের ক্ষেত্রেও তাদের স্বল্প আয়ের ৬০% থেকে ৬৫% চাল কেনার পেছনেই খরচ হয়ে যায়। অথচ যাদের আয় বেশি, তারা সবচেয়ে উঁচু মানের চাল কিনে খেলেও সেজন্য তাদেরকে তাদের আয়ের ১০%-১৫%-এর বেশি খরচ করতে হয় না। ফলে, চালের মূল্যবৃদ্ধির চাপ অবস্থাপন্নদের তুলনায় জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, অর্থাৎ সমাজের দরিদ্র ও হতদরিদ্রদের ওপর বহুগুণ বেশি চেপে বসে। এই চাপ পরিহার করার কোনো উপায় তাদের নেই। গত এক বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৫০%। গত বছর মুদ্রাস্ফীতির হার যেখানে ছিল ৭.৩% সেখানে শুধু চালের মূল্যবৃদ্ধি এককভাবেই ৫০% হওয়ার ঘটনায় একথা প্রমাণিত হয় যে মুদ্রাস্ফীতির প্রধান চাপ পতিত হয়েছে দরিদ্র-মধ্যবিত্ত মানুষের ওপরে। চাল ব্যতিত অন্যান্য বেশিরভাগ পণ্যর দাম, বিশেষত বিত্তবানরা যেসব জিনিসপত্র কেনার পেছনে তাদের আয়ের সিংহভাগ খরচ করে তার দাম বেড়েছে ৭.৩%-এর চেয়ে অনেক কম। যেমন কিনা সোনার দাম বেড়েছে ২.৫৯ শতাংশ হারে, যা গত কয়েকদিনে এখন উল্টো আরো কমতে শুরু করেছে। বাজার দর বৃদ্ধির এই বিভাজিত হারের কারণে সমাজে গত একবছরে ধন-বৈষম্য শ্রেণি-বৈষম্য ক্রমাগত আরো বেড়ে যাচ্ছে। যে ব্যবস্থায় দেশের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে তাতে মূল্যবৃদ্ধির এই বিভাজিত হার অব্যাহতই থাকবে এবং এর ফলে গরিব আরো গরিব হওয়া আর ধনী আরো ধনী হওয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকবে– এটিই স্বাভাবিক। কয়েক বছর আগে প্রস্তুত করা কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ৫ বছরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, গরিব মানুষ যে মোটা চাল খায় তার ক্ষেত্রে বাৎসরিক গড় মূল্যবৃদ্ধির হার হলো ১৬%, মাঝারি মানের চালের ক্ষেত্রে তা ১১.৩% এবং উন্নতমানের সরু চালের ক্ষেত্রে তা ১৩.৫%। গত এক বছরে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এই বিপরীতমুখী বৈষম্য আরো বেড়েছে। চালের বাজার নিয়ে এই সামগ্রিক ‘চালবাজির’ অবসান ঘটানো প্রয়োজন। এ জন্য যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক সেগুলো হলো– সারা দেশে শক্তিশালী দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত ‘গণবণ্টন ব্যবস্থা’ চালু করা, গরিব নাগরিকদের জন্য স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন, টিসিবিকে প্রকৃতই সচল ও শক্তিশালী করা, কসকোর দোকান চালু করা, উৎপাদক-সমবায় ও ক্রেতা-সমবায় গড়ে তুলে তাদের মধ্যে ‘ডাইরেক্ট টু ডাইরেক্ট’ অর্থাৎ সরাসরি বিপণন কার্যক্রম গড়ে তোলা, ন্যায্যমূল্যের সরকারি দোকান খোলা, সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর বাফার স্টক গড়ে তোলা ইত্যাদি। কিন্তু তা করার জন্য ‘পুঁজিবাদী অবাধ বাজার অর্থনীতি’র ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর পথ পরিত্যাগ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা ও রাষ্ট্রীয় চার নীতির পথে দেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সমাজতন্ত্র অভিমুখীন অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..