রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়ায় গত ১০ নভেম্বর ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ৯টি হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হামলা চালানো হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ, প্রতিবাদী সমাবেশ, মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে পাঠানো সংবাদ: রংপুর: রংপুর সদর উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দু পল্লীতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের প্রতিবাদে এবং হামলার শিকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের দাবিতে রংপুরের প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় প্রেসক্লাব হতে গত ১২ নভেম্বর সকাল ১১টায় মিছিলটি শুরু হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধনে মিলিত হয়। সিপিবি’র কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা শাহাদত হোসেনের সভাপতিত্বে এবং মহানগর সাধারণ সম্পাদক দেবদাস ঘোষ দেবুর পরিচালনায় মানববন্ধন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদ জেলা সমন্বয়ক আব্দুল কুদ্দুস, বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য অশোক সরকার, গণতন্ত্রী পার্টির জেলার নেতা নৃপেন্দ্র নাথ রায়, জাসদ মহানগর সম্পাদক মাসুদ নবী মুন্না, সিপিবি নেতা মফিজার হোসেন প্রমুখ। সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের উস্কানিদাতা ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। চট্টগ্রাম: রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রতিবাদে সিপিবি ও বাসদ চট্টগ্রাম জেলার উদ্যোগে গত ১২ নভেম্বর নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ে এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অমৃত বড়ুয়ার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন বাসদ চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক মহিমউদ্দীন, যুব নেতা আমির হোসেন, সিপিবি জেলা কমিটির সদস্য রবিউল হোসেন, বাসদ নেতা আকরাম হোসেন প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন বাসদ নেতা আল কাদেরী জয়। সভায় বক্তারা বলেন- দেশে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটছে। কিন্তু সরকার এসকল ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলার সাথে যুক্ত ব্যক্তি-গোষ্ঠি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ঘটাতে সাহস পায়। এধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সংখ্যালঘু মানুষের জমি-সম্পদ দখল করা। ক্ষমতা দখলের জন্য বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় রাজনৈতিক ট্রাম কার্ড খেলছে। যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থি। সভা থেকে অবিলম্বে রংপুর, সাঁথিয়া, নাসির নগর, রামু সহ বিভিন্ন জায়গায় সংগঠিত সাম্প্রদায়িক হামলার সুষ্ঠ বিচারের দাবি জানানো হয়। এই জঙ্গি-সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিহত করার জন্য অসাম্প্রদায়িক, বাম-গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানানো হয়। বরিশাল: রংপুর জেলার সদর উপজেলার থলেয়া ইউনিয়নের ঠাকুরপাড়া গ্রামে গত ১০ নভেম্বর ফেসবুকে ধর্মের অবমাননা করে একটি মিথ্যা স্ট্যাটাসের অজুহাতে ৯টি হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হামলা চালানো হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে গত ১৩ নভেম্বর বিকেলে সিপিবি, বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, বরিশাল জেলার উদ্যোগে অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সিপিবি, বাসদ, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা বরিশাল জেলা সমন্বয়ক অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সেলিম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার কেন্দ্রীয় নেতা ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ এর কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে আজাদ, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক দেওয়ান আব্দুর রশিদ নিলু, বাসদ বরিশাল জেলা সংগঠক ডা: মণীষা চক্রবর্তী। সংহতি জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন, গণফোরাম জেলা সভাপতি অ্যাড. হিরণ কুমার দাস, উদীচী বরিশাল জেলা সভাপতি অ্যাড. বিশ্বনাথ দাসমুন্সী, গণনাট্য সংস্থা বরিশাল জেলা সভাপতি অধ্যাপক শাহ্ আজিজুর রহমান খোকন। সমাবেশ পরিচালনা করেন ইউনাইটেড কমিনউস্টি লীগ এর জেলা নেতা অধ্যাপক নৃপেন্দ্র নাথ বাড়ৈ। বক্তারা অবিলম্বে এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বক্তারা বলেন, রাসু, গোবিন্দগঞ্জ, নাসির নগর, দিনাজপুর সহ সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা নির্যাতনের বিচার না হওয়ার কারণেই সাম্প্রদায়িক শক্তি রংপুরে এ ঘটনা ঘটাতে পেরেছে। বক্তারা বলেন, এ ব্যর্থতার দায় সরকার কোনোভাবে এড়াতে পারে না। সূত্রাপুর: রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়ায় গত ১০ তারিখে হামলাকারী ও এর পেছনের মদদাদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভুয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে শত শত লোককে সংগঠিত করে পুলিশের সামনেই হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। টাকা-গরু-ছাগল ও স্বর্ণালংকার-চাল লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। হামলাটি ধর্ম রক্ষার জন্য নয় অবাধ লুটপাট ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্যই করা হয়েছে। এই হামলা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। গত ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন সূত্রাপুর থানার উদ্যোগে সূত্রাপুরের লোহারপুলে এক প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এই কথাগুলো বলেন। থানা সংগঠনের সভাপতি ইসমাইল হোসেনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগরের সভাপতি রিয়াজউদ্দিন, সাইফুল ইসলাম, গোলাম রাব্বী খান, দিপায়ন হোসেন, ইকবাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। বক্তারা বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বুকে ধারণ করেই ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি সেই স্বপ্ন বিনাশ করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। এই সাথে যুক্ত হয়েছে স্বার্থান্বেষী মহল। সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, বরিশালের বানিয়াপাড়া, কক্সবাজারের রামুসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৌলবাদী গোষ্ঠী একের পর এক হামলা করছে আর সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। সময়ের প্রলাপে জনগণকে সান্ত¦না দিচ্ছে। কিন্তু একদিন এই শক্তিই সরকারকে চরম বিপদে ফেলবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুযোগেই এই হামলা হয়েছে। দেশজুড়ে হামলা-মামলা-নির্যাতন চলছে। খুন-ধর্ষণ-গুম-হত্যা চরম আকার ধারণ করছে। দেশের কোটি যুবক বেকার, সরকারের কোনো বিকার নেই। উল্টো ঘুষ-দূর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিতে দেশের উন্নয়নের জোয়ার চলছে। অবিলম্বে এইসব বন্ধ করতে হবে। টিটু রায়কে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে এবং প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়: রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দু পল্লীতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের প্রতিবাদে এবং হামলার শিকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের দাবিতে গত ১৩ নভেম্বর সোমবার সকাল ১১.৩০টায় সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এ-মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি যুগেশ ত্রিপুরার সভাপতিত্বে এবং উদীচীর সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সাগরের পরিচালনায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উদীচীর সভাপতি ওয়াদুদ সাদমান, প্রাক্তন সভাপতি আসাদুজ্জামান শুভ, ছাত্র ফ্রন্টের রংপুর জেলা কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক আশিকুল ইসলাম তুহিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেজবাউর রহমান, নাহিদা নিশি, হৃদয়, গোপাল, সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ। নেতৃবৃন্দ বলেন, রামু ও নাসিরনগরের ন্যায় রংপুরের ঠাকুরপাড়ার হিন্দুপল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। এখানে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের জিকির তুলে মূলত এই বর্বরোচিত হামলাকে বৈধ করার চেষ্টা চলছে। পত্রিকায় এসেছে, এখন এটা প্রমাণিত যে, যে আইডি থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়েছে তা ভুয়া। মূলত এর পেছনে রয়েছে লুটপাট ও ভোটের রাজনীতির স্বার্থ। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে হামলার পরিকল্পনাকারী, উস্কানিদাতা ও অংশগ্রহণকারীদের দল-মত-নির্বিশেষে সকলকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। সেই সাথে নেতৃবৃন্দ এ-ধরণের সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..