মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করায় পদার্থে নোবেল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : চলতি বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী- ব্যারি ব্যারিশ, কিপ থর্ন ও রেইনার ওয়েইস। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করায় তাদের এ সম্মাননার জন্য বেছে নিয়েছে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস। এ বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী এ তিন বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করল প্রতিষ্ঠানটি। পুরস্কার বিজয়ী তিন বিজ্ঞানী ব্যারিশ, থর্ন ও ওয়েইস ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে একযোগে লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্রাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি (লাইগো) নামে একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। ১৯০১ সালে নোবেল সম্মাননা প্রচলনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৮টি পুরস্কার জিতে নিয়েছেন এ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। ১০০ বছর পর ফের প্রমাণিত হল, আইনস্টাইনের পূর্বাভাসে কোনো ভুল ছিল না, যা একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। আমেরিকার হ্যানফোর্ড আর লিভিংস্টোনে বসানো দু’টি লেসার ইনটারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি (লাইগো) আর ইতালির পিসার কাছে ‘ভার্গো’ ডিটেক্টরে একই সঙ্গে ধরা পড়ল ১৩ কোটি বছর আগে মহাকাশের একটি ধুন্ধুমার সংঘর্ষের ঘটনা। দু’টি নিউট্রন তারা বা নক্ষত্রের মধ্যে। যে দু’টি নিউট্রন নক্ষত্রের মধ্যে সেই ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, সেই দু’টি নক্ষত্র ভরের নিরিখে আমাদের সূর্যের চেয়ে ১০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। দু’টি অসম্ভব ভারী নক্ষত্রের মধ্যে সেই ভয়ঙ্কর ধাক্কাধাক্কির ঘটনাটি ঘটেছিল গ্যালাক্সি ‘এনজিসি-৪৯৯৩’-তে। সেই অসম্ভব জোরালো ধাক্কাধাক্কির ফলে যে ঢেউ বা কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল ১৩ কোটি বছর পর তা পৃথিবীতে ধরা পরলো গত ১৭ আগস্ট। পরীক্ষানিরীক্ষার পর অবশেষে সেই আবিষ্কারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল লাইগো-ভার্গো কোলাবরেশন। জানানো হল, পুকুরে বড় ঢিল ফেললে যেমন ঢেউয়ের জন্ম হয়, তেমনই দু’টি নিউট্রন নক্ষত্রের মধ্যে সেই জোরালো সংঘর্ষের ঘটনায় জন্মানো ঢেউয়ের কম্পনই যে এ বার শুধু অনুভূত হয়েছে, তা-ই নয়; যে নিউট্রন নক্ষত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে সেই ঢেউয়ের জন্ম হয়েছিল, তাদেরও দেখা মিলেছে এই প্রথম। কারণ, সেই সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া আলো বা তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গকেও এই প্রথম দেখতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রথম দেখা সম্ভব হল, গামা রে বার্স্টের ঘটনাগুলি ঘটে নিউট্রন নক্ষত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের দৌলতে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই আবিষ্কার একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ব্রহ্মাণ্ডের এই ঢেউটাকেই বলা হয়, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। আজ থেকে ১০০ বছর আগে প্রথম এই তরঙ্গের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন আইনস্টাইন। তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে। কিন্তু তার পর কিছুতেই সেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ, সেই তরঙ্গ অত্যন্ত ক্ষীণ। কয়েকশো কোটি বছর আগেকার সেই ঢেউ ব্রহ্মাণ্ডে ছড়াতে ছড়াতে যখন পৃথিবীতে এসে পড়ে, তখন তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায়। আইনস্টাইনের ধারণা ছিল, এ তরঙ্গকে সম্ভবত কখনই মাপা সম্ভব হবে না। লাইগো প্রকল্পের মূল সাফল্য হলো, একজোড়া বিশাল লেজার ইন্টারফেরোমিটার ব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আণবিক নিউক্লিয়াসের চেয়েও হাজার গুণে ছোট এক তরঙ্গের অভিঘাত পরিমাপ করা। গত শতাব্দীর সাত আর আটের দশকে সেই তরঙ্গকে অনুভব করার উপায় প্রথম বাতলেছিলেন যাঁরা, সেই রাইনার ওয়েস, ব্যারি সি ব্যারিশ এবং কিপ এস থর্নকে এ বছর নোবেল পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। আর মূলত সেই তিন পথপ্রদর্শক বিজ্ঞানীকে অনুসরণ করেই প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গের হদিশ মিলেছিল আমেরিকার হ্যানফোর্ড ও লিভিংস্টোনে বসানো দু’টি লাইগো ডিটেক্টরে ২০১৫-র সেপ্টেম্বরে। ওই বছরেরই ডিসেম্বরে তা আরও এক বার ধরা পড়ে লাইগো ডিটেক্টরে। সেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৃতীয় বার ধরা পড়েছিল এ বছরের জানুয়ারিতে, লাইগো ডিটেক্টরেই। আর চতুর্থ বার একই সঙ্গে আমেরিকার লাইগো ও ইতালির ভার্গো ডিটেক্টরে গত আগস্টেই। লাইগো ইন্ডিয়ার সায়েন্স অপারেশনের প্রধান, পুণের ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনমির অধ্যাপক সুকান্ত বসু বলেন, ২০১৫ সাল থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত যে ৪ বার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের হদিশ মিলেছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার উৎস ছিল কয়েকশো কোটি বছর আগের দু’টি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা। যেহেতু ব্ল্যাক হোল থেকে সাধারণভাবে কোনো আলো বা তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ বেরিয়ে আসতে পারে না তার অত্যন্ত জোরালো অভিকর্ষ বলের জন্য, তাই আগের চার বার সেই ব্ল্যাক হোল আর তাদের তরঙ্গ দেখা যায়নি। নিউট্রন নক্ষত্র থেকে যেহেতু আলো বেরিয়ে আসতে পারে, তাই এ বার এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের শুধু কম্পনই নয়, তাকে দেখাও সম্ভব হল। ২০১৫-র সেপ্টেম্বরে প্রথম যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের হদিশ মিলেছিল দু’টি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ফলে সেই ঘটনাটা ঘটেছিল ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। ওই বছর ডিসেম্বরে ধরা পড়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গটির উৎসস্থল ছিল ২৯০ কোটি আলোকবর্ষ। ২০১৭-র জানুয়ারিতে হদিশ মেলা তরঙ্গটির জন্ম হয়েছিল ১৪০ কোটি আলোকবর্ষ দূরত্বে। আর গত ১৪ আগস্ট যে তরঙ্গটির হদিশ মিলেছিল, সেটির উৎসস্থল ছিল ১৮০ কোটি আলোকবর্ষ দূরত্ব। তার কথায়, ‘আগের ৪ বারের ঘটনার তুলনায় গত ১৭ আগস্ট যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গটির হদিশ মিলেছে, তা এসেছে সবচেয়ে কাছ থেকে। দু’টি নিউট্রন নক্ষত্রের মধ্যে সেই ধাক্কাধাক্কির ঘটনাটা ঘটেছিল মাত্র ১৩ কোটি বছর আগে। সে দিক থেকেও এই আবিষ্কার রীতিমতো অভিনব।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..