ক্রিয়ো-ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপির উন্নয়নে রসায়নে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : এবছর রসায়নে নোবেল পেয়েছেন তিন দেশের তিন বিজ্ঞানী ও গবেষক। তারা হলেন জ্যুকেয়েস ডোবেশেট (সুইজারল্যান্ড), জোয়াকিম ফ্রাংক (জার্মানি) ও রিচার্ড হ্যান্ডারসন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)। ক্রিয়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কপি উদ্ভাবনের জন্য এই তিন বিজ্ঞানীকে পুরস্কার দেওয়া হলো। দ্রবণে জৈব অণুর গঠন সুস্পষ্টভাবে (উচ্চ-রেজ্যুলেশনে) চিহ্নিত করা যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। গত ৪ অক্টোবর স্থানীয় সময় দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সুইডেনের স্টকহোমে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের নাম ঘোষণা করে। নোবেল বিজয়ীদের মধ্যে জ্যাক ডাবোশেট কাজ করেন সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লৌসানেতে। রিচার্ড হেন্ডারসন একজন স্কটিশ হলেও কাজ করেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের এমআরসি ল্যাবরেটরি অব মলিকিউলার বায়োলজিতে। অন্যদিকে জার্মান বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী জোয়াকিম ফ্র্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একাডেমি জানায়, তাদের গবেষণা অণু বিভাজন প্রক্রিয়ার মধ্যে অচিরেই জীবনের জটিল কলকব্জার নিখুঁত ও বিস্তারিত প্রতিচ্ছবি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ক্রায়ো ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য এই তিনজন বিজ্ঞানী এবারের নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন। ক্রায়ো ইলেকট্রনিক পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে জৈবকণার চিত্রধারণের কাজটা আরো উন্নত ও সহজ হয়ে ওঠে। এই ক্রায়ো ইলেকট্রনিক পদ্ধতির প্রয়োগের সুবাদে জৈব রসায়ন বিদ্যা এক নতুন যুগে পা রাখল। সহজ ভাষায় বলতে গেলে মানব দেহের শরীরের অভ্যন্তরে রয়েছে বিভিন্ন জৈব ও জটিল যৌগের অণু আর তাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু, ডিএনএ, আরএনএ। একটি বিন্দুর লক্ষ-কোটি ভগ্নাংশের সমান এসব জৈবের আচার-আচরণ, স্বভাবচরিত্র, মতিগতি ঠিক কী রকম তা দেখার, বোঝার, চেনা ও জানার মোক্ষম হাতিয়ার ক্রায়ো-ইএম বা ক্রায়ো ইলেকট্রনিক। সালমোনিলা ব্যাকটেরিয়া যার কারণে আমাদের শরীরের কোষগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে, তারা কী ভাবে মানবদেহে বিস্তার লাভ করে তা জানা সম্ভব হয়েছে ক্রায়ো-ইএম কারণে। ক্যানসার সারানো বা ক্যানসারে আক্রান্ত কোষগুলির শরীরে ছড়িয়ে পড়া রুখতে যে সব ওষুধ ব্যবহার করা হয় (কেমোথেরাপি), সেগুলি যে সব প্রোটিনের জন্য ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, তা সঠিক ভাবে বুঝা সম্ভব হচ্ছিল না। এ সমস্যার সমাধান এনে দেয় ক্রায়ো-ইএম। ক্রায়ো-ইএম এর ফলে বলা সম্ভব হয়েছে কোন কোন প্রোটিন অণু বা কী ধরনের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া আমাদের দেহের ঘড়িকে (বডি ক্লক) চালায়, কী ভাবে চালায়। বলা সম্ভব হয়েছে সালোকসংশ্লেষের কোন কোন ধাপে পাতার ভিতরে চলা কোন কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া কী ভাবে কতটা শুষে নেয় সূর্যালোক। এই সব কিছুর কারিগর যে সব জৈব অণু, তাদের প্রথম ধরিয়ে দিয়েছিল, চিনিয়ে দিতে পেরেছিল ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপই। শুধু তাই নয় ওই বিশেষ ধরনের অনুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমেই প্রথম ত্রিমাত্রিক ছবি তোলা সম্ভব হয়েছিল জিকা ভাইরাসের। যার ফলে আবিষ্কার হয়েছে জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক। গত শতাব্দীর আটের দশকে এসব সমস্যা মেটাতে চালু পদ্ধতি এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্র্যাফির বদলে এল নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স (এনএমআর) স্পেকট্রোস্কোপি। তাতে যে ছোট ছোট প্রোটিনগুলি কঠিন অবস্থায় আর তরল দ্রবণে থাকতে পারে, তাদের দেখাটা সহজ হল। ক্রায়ো-ইএম পদ্ধতিতে শুধুই প্রোটিন অণুগুলির গঠনকাঠামো দেখা যে সম্ভব হল তাই নয়, শরীরে সেই অণুগুলি কী ভাবে চলাফেরা করে, কার কার সঙ্গে কী ভাবে কোন কোন পথে বিক্রিয়া করে, সেটাও আর অজানা থাকল না। দু’টি পদ্ধতিরই যেমন কিছু সুবিধা ছিল, তেমনই ছিল কিছু অসুবিধাও। এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্র্যাফিতে যেমন কেলাস অবস্থায় না থাকলে প্রোটিনকে দেখা যায় না, তেমনই কোনো দ্রবণে এনএমআর পদ্ধতিতে একমাত্র তুলনায় ছোট প্রোটিনগুলিকেই দেখতে পাওয়া সম্ভব। আকারে বড় প্রোটিনগুলিকে দেখতে পাওয়া যায় না। সেই জন্যই সাতের দশকে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্র্যাফিকে বাতিল করার পথে এগিয়েছিলেন রিচার্ড হেন্ডারসন। আর জোয়াকিম ফ্র্যাঙ্ক সেই ছবিগুলিকে আরও উন্নত করার উপায় বাতলেছিলেন। পুরস্কার হিসেবে ওই তিন বিজ্ঞানী ৮ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার (৯ লাখ ৩১ হাজার মার্কিন ডলার) নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবেন। গত বছর মলিকুলার মেশিনস বা আণবিক যন্ত্রের নকশা ও সংশ্লেষে অবদান রাখায় তিন বিজ্ঞানী রসায়নে নোবেল জিতে নিয়েছিলেন। তারা হলেন- স্কটল্যান্ডের স্যার ফ্রেশার স্টডডার্ট, জাঁ ফ্রান্সের পিয়েরে সভেজ ও নেদারল্যান্ডসের নাগরিক বার্নাড ফেরিঙ্গা । উল্লেখ্য, সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের শেষ ইচ্ছা অনুসারে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবতার কল্যাণে অবদানের জন্য প্রতি বছর চিকিৎসা, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেল তার মোট উপার্জনের ৯৪% (৩ কোটি সুইডিশ ক্রোনার) দিয়ে তার উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরষ্কার প্রবর্তন করেন। এই বিপুল অর্থ দিয়েই ১৯০১ সাল হতে শুরু হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান। ১৯৬৮ তে তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি। পুরস্কার ঘোষণার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। আইনসভার অনুমোদন শেষে তার উইল অনুযায়ী নোবেল ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া অর্থের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করা এবং নোবেল পুরষ্কারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা। আর বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব সুইডিশ একাডেমি আর নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিকে ভাগ করে দেওয়া হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..