রুশ বিপ্লবের অনিঃশেষ যাত্রা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আহমদ সিরাজ: মানুষের জীবন-ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক সময়কালকে নিয়ে পরিব্যাপ্ত হয়ে ইতিহাসের অমোঘ ধারায় বয়ে চলেছে। মোটা দাগে ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের জীবন চলেছে সাম্যবাদ তাড়িত, শোষণ বঞ্চনাহীন, জীবন ও জীবিকায় সংগ্রহধর্মী আর কেবল বেঁচে থাকার চেষ্টাতেই। কেউ কাউকে ঠকিয়ে বা বঞ্চিত রেখে জীবন চালায়নি, সে প্রয়াসও ছিল না তখন। পৃথিবীতে মানুষ যখন শোষণ-বৈষম্য-বিভাজন দ্বারা তাড়িত হয়েছে তখনই মানুষে মানুষে শোষণ নির্যাতন বৈষম্য ক্রমে বিস্তৃত হয়ে পড়ে, যার মাত্রা ইতিহাসে হিংস্র, নিষ্ঠুরতায় ভরপুর। যার সর্বশেষ রূপ পুঁজিতান্ত্রিকতা-যাকে পুঁজিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে মানুষের সভ্যতায় পুঁজির শাসন বা তাণ্ডব, যার রাষ্ট্রীয় রূপ হয়েছে বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থা-এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৯১৭ সালে সংগঠিত হয়েছে রুশ বিপ্লব। যাকে পৃথিবীর সমাজ বদলের ইতিহাসে মহান রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেবল পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই বিপ্লব সংগঠিত হয়নি, এরও আগে মানুষ দাস, সামন্ত শাসনসহ নানা ভেদাভেদ দ্বারা শোষণ নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল। মানুষ দিক দিশাহীন ভাবে ক্ষোভে-বিক্ষোভে-বিদ্রোহে মুক্তির দিশা খুঁজছিল। কিন্তু তাদের সংগঠিত জীবনধর্মী রূপ সম্পর্কে জানাবুঝা ছিল না। মানুষের জীবন থেকে মেহনতি মানুষের শ্রম ঘাম থেকে উৎসারিত মহামতি কাল মার্কস, এঙ্গেলস্ এর দেওয়া দর্শনকে কেন্দ্র করে লেনিনের নেতৃত্বে রুশ দেশে জার কেন্দ্রিক রাজার শাসনের বিরুদ্ধে দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা বা জাগরণ মানুষের মুক্তির দিশা হিসাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। দেশে দেশে সকল বৈষম্য নির্যাতন জুলুমের বিরুদ্ধে নির্যাতিত মানুষরা যেমন, তেমনি শুভবুদ্ধির মানুষেরাও জেগে উঠে-সাম্যের দুনিয়া গড়ার লক্ষ্যে ও চেতনায়। এর পর দ্রুতই দেশে দেশে সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে গড়ে উঠতে থাকে সংগঠন সংগ্রাম। ভারতবর্ষও এ লক্ষ্যের বাইরে ছিল না। বাংলাভূমিও বাইরে থাকেনি। বিশ্বব্যাপী মহাযুদ্ধের দামামা, ফ্যাসিস্ট হিটলারের উত্থানে সমগ্র দুনিয়ার মানুষ আলো-আধারের দোলাচলে যখন দিকভ্রান্ত, তখন রুশ বিপ্লবের বিপ্লবী চেতনা, যা মেহনতি মানুষের শ্রম ঘাম থেকে উৎসারিত, সেই চেতনাই ফ্যাসিস্ট তাণ্ডব থেকে তাবৎ দুনিয়াকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য বহুমানুষের জীবন দিতে হয়েছে। পৃথিবীর মানুষের অগ্রযাত্রা, সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে রুশ বিপ্লবী চেতনা। পুঁজিবাদী দুনিয়া নয়-নব উত্থিত সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার রুশ দেশই সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছে। এজন্য রুশ বিপ্লব একাধারে সভ্যতা বিনাশী, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ও সভ্যতা নির্মাণের স্বপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বলা যেতে পারে দেশে দেশে প্রগতিশীল আন্দোলন, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও রাশিয়ায় গড়ে উঠা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইতিবাচক সমর্থন ও প্রেরণা যুগিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের হিংস্র থাবার বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কাছে থাকতে সচেষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধ প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী উপাদানকে নিয়ে গড়ে উঠে। বাঙালির এই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ প্রভৃতি পর্ব দ্বারা সিক্ত হয়েছে। রুশ বিপ্লবের প্রভাবে আমাদের দেশেও বামপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি, সংগঠন সংগ্রাম যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনি এর প্রভাবে বাঙালির সকল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে প্রগতিশীলতা চিহ্নিত হয়েছে। স্মর্তব্য যে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বামপন্থি কমিউনিস্টদের অবস্থান হেলাফেলার থাকে নি। ইতিহাসও যে সাক্ষ্য বহন করছে, তাতে দেখা গেছে পরবর্তী সকল আন্দোলনে বামপন্থি কমিউনিস্টদের লড়াই সংগ্রাম জেল জুলুম উপেক্ষণীয় নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাদের অবস্থান-অবদান দালিলিক সত্যে ভাস্বরিত হয়েছে। দেশের ভেতরে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উদীপ্ত ন্যাপ, কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী নিয়ে গড়ে উঠে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন-যা মুক্তিযুদ্ধের অভিন্ন অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নয় মাসব্যাপী এই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি, রাষ্ট্র যে নৈতিক ও সাহসী সমর্থন যুগিয়েছে, তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে। কেবল তাই নয় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ভেটো প্রদান করে আমাদের পক্ষে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক শক্তির বলয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক না হলে তিলে তিলে গড়ে উঠা চেতনার রাষ্ট্র নির্মাণ কঠিন হতো। ফলে আমাদের মূল নেতৃত্বও কৃষক শ্রমিক তথা মেহনতি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা দ্বারা তাড়িত হয়েছে। তাতে মুক্তিযুদ্ধে একটা বাম উপাদান উৎসারিত হয়েছে। যার অন্যতম বাস্তব নির্দশন বা দলিল হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা বাহাত্তরের সংবিধান। যার মূল স্তম্ভ হচ্ছে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। আমাদের পুরো মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম-বাংলার কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভরকেন্দ্র দৃশ্যমান ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে মূল সংবিধানসহ অনেক কিছুই বিবেচ্য থাকেন নি। সমাজতন্ত্র সাম্যের পথ সহজ সোজা নয়, আঁকাবাঁকা জটিল ও কঠিন। তার প্রভাবের বাইরে বাংলাদেশ নয়। মহৎ আদর্শের যে মৃত্যু হয় না, তার উদাহরণ রুশ বিপ্লব। শত বছর আগে গড়ে উঠা এ আদর্শ নানা উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে আলোকিত শিখা– যা দেশে দেশে বিশেষত মেহনতি মানুষকে আলোড়িত, আন্দোলিত ও আলোকিত করে চলেছে। রুশ বিপ্লবের শত বছর পূর্তিতে বাংলাদেশও এই দিবসটি পালনে বাম কমিউনিস্টসহ সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। শত বছর পালনের মধ্য দিয়ে রুশ বিপ্লবের প্রভাব গুরুত্ব আরো গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। বিশেষত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রবল অভাবের কারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বায়নের ছদ্মবেশে দুর্নীতি, লুটপাটের জন্ম দিয়ে চলছে, যার অন্যতম মুক্তবাজার অর্থনীতি, যা আমাদের চেতনার বাংলাদেশ নির্মাণে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১৯৭১ সালে অর্থাৎ ৪৬ বছর আগে গড়ে উঠা এ সংগ্রাম বাঙালির ভাষাতাত্বিক জাতীয়তাবাদের ভেতর দিয়ে একটা লোকতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে গড়ে উঠেছে-যা বাঙালির হাজার বছরের চেতনাকে বহন করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে। যার সমস্ত উপাদান সমাজতান্ত্রিক ধারায় বহমান। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসে প্রধান অতিথি হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ভাষণের একটি উদ্ধৃতি টানা যেতে পারে-“সমাজতন্ত্র আমাদের প্রয়োজন। সমাজতন্ত্র না হলে এদেশে দুঃখী মানুষের বাঁচবার উপায় নেই। আমরা শোষণহীন সমাজ চাই, সমাজের সুষম বণ্টন চাই। আমাদের সহকর্মী ভাইয়েরা, সমাজতন্ত্রের রাস্তা সোজা নয়। সমাজতন্ত্র করতে হলে যে ক্যাডারের দরকার তা আমরা তৈরি করতে পেরেছি কি না, এ নিয়ে অনেক আলোচনার প্রয়োজন আছে। আজকে আমাদের সেজন্য ক্যাডার তৈরি করতে হবে। সমাজতন্ত্রের রাস্তায় আমরা যে পদক্ষেপ নিয়েছি, তা থেকে আমরা পিছু হটতে পারি না, পারব না, যত বড় ষড়যন্ত্রই চলুক না কেন।” বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির সমাজতান্ত্রিক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধে এ চেতনার বহমানতাকে তাৎপর্যময় ও অর্থবহ করে তুলেছে। রুশ বিপ্লবে শত বছরের আহ্বান আমাদের সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের দিকে চোখ ফেরাতে ডাক দিচ্ছে, তা সমকালে যেমন তেমনি অনাগত ভবিষ্যতেও। লেখক: সদস্য সিপিবি, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..