উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলন

অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রভাব

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মনোজ দাশ: ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট বাঁকে এসে উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে রুশ অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। প্রথমত রুশ বিপ্লব এই উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে, সংহতি জানিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, শিক্ষা গ্রহণে সাহায্য করেছে। দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের ‘বিজ্ঞানসম্মত দর্শন-বিশ্লেষণ ও কর্মসূচি’ প্রভাবিত করেছে উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলন-সংগ্রামকে। শুধুমাত্র বামপন্থি বা প্রগতিশীল মানুষের ওপরই না, মহান অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব পড়েছিল উপমহাদেশের বুর্জোয়া নেতৃত্বের ওপরও। লক্ষ্য তাদের যা-ই থাকুক না কেন, তারাও এই মহাবিপ্লবের তাৎপর্যকে অস্বীকার করতে পারেননি। অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকেও ‘ভারত ও সাম্যবাদ’ নামক পুস্তকে লিখতে হয়েছে-‘লেনিনের মতো মহাত্মাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার উপর যে আদর্শের সৌধ গড়ে উঠেছে, তা কখনো বৃথা যেতে পারে না।’ আর জহরলাল নেহেরুকে আরো এক ধাপ এগিয়ে বলতে হয়েছে-‘রুশ বিপ্লব মানব প্রগতির যে পথ নির্ধারণ করেছে তার প্রভাবেই মানবজাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে’। প্রকৃতপক্ষে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরবর্তী অধ্যায়ে এর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া কোন প্রগতিশীল আন্দোলন, সংগঠন বা ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব ছিল না। খাইবার গিরিপথ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপমহাদেশে মেহনতি মানুষ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন নিজেদের অস্তিত রক্ষায়, সম্মান ও মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার তাগাদায়। এই সংগ্রাম প্রথমে ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক। এক সময় তা রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। এসব সংগ্রামের অনেকগুলিই সংগঠিত হয়েছিল শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠার আগেই। সংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা তাদের নিয়ে গেছে সংগঠন গড়ে তোলার দিকে। তাৎপর্যময় ভাবে শ্রমিকদের আন্দোলনের দাবিগুলি পর্যায়ক্রমে বিকশিত হয়েছে। একাধিক প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে শ্রমিক আন্দোলন। শুরুর দিকে উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অভিমুখীনতা ছিল না। শ্রমিকরা নিজেরাই সংগঠিত হয়েছেন, সংগ্রামের মধ্য থেকে গড়ে উঠেছে নেতৃত্ব। শ্রমিকরা নিজেরাই সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী গড়ে তুলেছেন সংগঠন। অক্টোবর বিপ্লবের পরে মার্কসবাদী শ্রমিক নেতৃত্বের প্রভাবে উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনে সংগঠনশীলতা ও লক্ষ্য অভিমুখীনতা আরো গতিশীল হয়। ১৯১৮ সালে গঠিত মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন ছিল ট্রেড ইউনিয়ন সুসংগঠিতভাবে গঠন করার প্রথম প্রয়াস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এবং রুশ বিপ্লবের অল্পকাল পরেই লন্ডনে গঠিত হয় ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার লীগ অব ইন্ডিয়া। উপমহাদেশে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নিতে বামপন্থি শ্রমিক এবং কমিউনিস্ট নেতারা এই উদার ও বামপন্থি ধারার সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের প্রভাবে ভারতে শ্রমিক আন্দোলনে সংগঠনশীলতা বৃদ্ধি পায়, লক্ষ্য অভিমুখীনতা আরো স্পষ্ট হয়। রুশ বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী ভূমিকা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯২০ সালে উপমহাদেশে বিভিন্ন প্রদেশে গড়ে ওঠা ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে গঠিত হয় ‘সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’। এর ফলে আন্দোলনে গতি সঞ্চার হয়। ১৯২১-৩০ সময়কালে ১৮৫৭ বার শ্রমিক ধর্মঘট হয়। এসব ধর্মঘট ও আন্দোলনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের পরামর্শ, সহযোগিতা ও প্রভাব ছিল। রুশ বিপ্লবে শ্রমিক ও মেহনতি কৃষকের যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা থেকে উপমহাদেশের শ্রমিক শ্রেণি ও তাদের নেতৃত্ব শিক্ষা নিয়েছিলেন। উপমহাদেশের শ্রমিকশ্রেণি ‘কৃষক আন্দোলন ও কৃষকের সাথে’ এ সময়ে সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করে। ১৯২০-২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন কালে বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি কৃষক অভ্যুত্থান ঘটে। সংযুক্ত প্রদেশে গোরখপুরে চৌরি চৌরায় ১৯২২ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি কৃষক অভ্যুত্থান ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যমণ্ডিত। চৌরি চৌরার অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের বিচারের নামে ১৯২৩ সালে ২০ জানুয়ারি এলাহাবাদ হাইকোর্ট ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এ সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে এম এম রায় শ্রমিক শ্রেণিকে গোরখপুরের দণ্ডিত কৃষকদের রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। শ্রমিকরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। চৌরি চৌরার ঘটনায় দণ্ডিতদের সমর্থনে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটি এবং রেড ইন্টারন্যাশনাল অব লেবার ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটি ‘চৌরি চৌরার ঘটনায় দণ্ডদান সম্পর্কে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ইস্তেহার’ নামে বক্তব্য প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপমহাদেশে জনগণের পাশে এসে দাঁড়ায়। এ রাজনৈতিক সংগ্রাম হয়ে ওঠে সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের অংশ। শ্রমিকশ্রেণি এ সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বিপ্লবী শ্রেণি চেতনার প্রকাশ ঘটাতে শুরু করে। বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদেরও প্রকাশ ঘটতে থাকে। ১৯২৩ সালের ২৪-২৭ মার্চ এআইটিইউসি’র লাহোর অধিবেশনে যুদ্ধ বিরোধী প্রস্তাবে অন্যায় যুদ্ধে ভারতের শ্রমিকশ্রেণিকে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এই অধিবেশন উপলক্ষে এম এন রায় তার ‘ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে সংস্কারবাদী আন্দোলনের পরিবর্তে রুশ বিপ্লবের চেতনার ধারায় বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ১৯২৩ সালের মার্চ মাসের ‘সোসালিস্ট’ পত্রিকায় এস এ ডাঙ্গে তার ‘পুঁজিবাদী আক্রমণ’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন শ্রমিক শ্রেণিকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রেণিসংগ্রাম করেই জয় লাভ করতে হবে। এআইটিইউসি’র লাহোর অধিবেশনে অক্টোবর বিপ্লবের চেতনায় ভাস্বর শ্রমিক আন্দোলনের ধারাই জয়যুক্ত হয় এবং এর প্রভাব কলে-কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। এই বিপ্লবী ধারার নেতৃত্বে ১৯২৩ সালে মাদ্রাজে সর্বপ্রথম মে দিবস পালিত হয়। ১৯২৫ সালের ৩০ মে নর্থ-ওয়েস্ট রেলওয়েতে ধর্মঘটী শ্রমিকরা লাহোরের রাজপথে মিছিল করেন। এ মিছিলে ধর্মঘটীরা বিপ্লবের লাল পতাকা বহন করেন; আর এ পতাকা তারা রাঙ্গিয়ে নেন নিজেদের রক্তে। এটাই হচ্ছে কোনো উপমহাদেশে ধর্মঘটী মিছিলে প্রথমবারের মতো লাল পতাকা বহন করে নেওয়ার ঘটনা। এ সময়ে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলায় ‘শ্রমিক-কৃষক পার্টি’ নামে শ্রমিকশ্রেণির প্রাথমিক রাজনৈতিক সংগঠন গঠিত হওয়ার পরে উপমহাদেশে অন্যান্য প্রদেশেও এই সংগঠন গঠিত হয়। রুশ বিপ্লবের অন্যতম শিক্ষা ‘শ্রমজীবী শ্রেণির ঐক্যবদ্ধতার’ চেতনায় ১৯২৮ সালে ডিসেম্বরে কলকাতায় বিভিন্ন প্রদেশের এই সংগঠন একত্রিত হয়ে গঠন করে ‘সারা ভারত শ্রমিক-কৃষক পার্টি’। ১৯২৮ সালে বাংলা সহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিপ্লবী শ্রমিক নেতৃত্বের পরিচালনায় পাটকল, চটকল, রেল, আয়রন অ্যান্ড স্টিল মিলে বড় বড় ধর্মঘট হয়। এ সম্পর্কে সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁর ‘ভারতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার পটভূমি’ বইতে লিখেছেন, ‘বোম্বাইয়ের বস্ত্রকল শ্রমিকদের ধর্মঘটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, কারণ এটি একটি সংঘবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল দলের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। যাঁদের কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন বলে অভিযোগ করা হয়েছিল এবং যাঁদের অন্তত কয়েকজন মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় বিচারের সময় নিজেদেরকে গোঁড়া কমিউনিস্ট বলে ঘোষণা করেছিলেন।...বছরের শেষের দিকে খনি অঞ্চল ঝরিয়ায় যখন ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের অধিবেশন বসল তখন দেখা গেল যে, বামপন্থীদের সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের মধ্যে কমিউনিস্টদের দলই হচ্ছে সংঘবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল।’ সুভাষ চন্দ্র বসুর এ বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় তখন শ্রমিক আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাব কত ব্যাপক হয়ে উঠেছিল। অক্টোবর বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে ১৯২৮ সালে এআইটিইউসি সমাজতন্ত্রকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এ লক্ষ্য গ্রহণ করায় উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনে গতিশীলতা আসে। এ বছরই বামপন্থিদের নেতৃত্বে ঢাকেশ্বরী কটন মিলে সাধারণ ধর্মঘট হয়। ১৯২৯ সালে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের উদ্যোগে ‘লাল পতাকা’ নামে ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রাম ও সংগঠন গড়ে ওঠে। এ বছরই বাংলায় চটকল শ্রমিকদের প্রথম সাধারণ ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। রুশ বিপ্লবের চেতনায় উদ্দীপ্ত আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় উপমহাদেশে ১৯২৯-৪০ সালের মধ্যে শ্রমিক আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। শ্রমিক আন্দোলনের এই তীব্রতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ১৯৩৬ সালে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ও রেড ট্রেড ইউনিয়ন একীভূত হয়। অক্টোবর বিপ্লবের জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে উপমহাদেশের শ্রমিকশ্রেণি। যখন ১৯৪৬ সালে নৌ বিদ্রোহ শুরু হয় নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘হিজ ম্যাজেস্টিস ইন্ডিয়ান শিপ’ এর গায়ে শ্লোগান লেখা ছিল- “ভারত ছাড়ো, সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক”। নৌ বিদ্রোহের সমর্থনে বোম্বেতে শ্রমিক শ্রেণির ঐতিহাসিক রক্তাক্ত ধর্মঘটের সূচনা হয়। প্রায় ২৫০ জন এতে নিহত হয়। অক্টোবর বিপ্লবের চেতনায় উদ্দীপ্ত একদল শিক্ষিত তরুণের শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী মতাদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ গ্রহণ করে শ্রমিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলন তখন এত বেগবান হয়েছিল। ভারত বিভক্তির পর ১৯৪৮-৫৩, এই ছয় বছরে শ্রমিক আন্দোলন আবার তীব্র হয়ে ওঠে। আদমজীসহ অন্যান্য সেক্টরে শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের হত্যার প্রতিবাদে কমিউনিস্ট কর্মীদের নেতৃত্বে সুতাকল ও রেল শ্রমিকরা ধর্মঘট করে এবং ঢাকার আসপাশে শিল্প এলাকাসমূহে শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে। ১৯৫৪-৫৮ সালে ২৪২টি শ্রমিক ধর্মঘট ঘটে এবং ২ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক এতে অংশগ্রহণ করেন। এসবের মধ্য দিয়ে বিপ্লবী চেতনার প্রসার ঘটে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং রোববার ছুটির দাবিতে আদমজীর ২৫ হাজার শ্রমিক ধর্মঘটে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন উপেক্ষা করে শ্রমিক আন্দোলন জোরদার হয় এবং ২৯টি শ্রমিক ধর্মঘটে ৩৩ হাজার শ্রমিক যোগ দেয়। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে ছাত্র ধর্মঘটে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক সংখ্যায় শ্রমিকরা অংশ নেয়। এ সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনও জেগে ওঠে। শ্রমিক শ্রেণির মধ্য থেকে পূর্ববাংলার স্বায়ত্বশাসনসহ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দাবিও উত্থাপন করা হয়। ১৯৬২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার বিরাট মিছিলে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক যোগদান করেন। সেনাবাহিনীর গুলিতে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিক নিহত হলে আন্দোলন জঙ্গিরূপ ধারণ করে। পরবর্তী আন্দোলনগুলিতে তার প্রভাব পড়ে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবিতে ঢাকাসহ সারা দেশে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিক শ্রেণির ছিল বিরাট ভূমিকা। রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ ও গণঅভ্যুথানের পটভূমিকায় ‘ঘেরাও’ আন্দোলন প্রভৃতির ফলে শ্রমিকদের মধ্যে শ্রেণি সচেতন রাজনীতি, আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে ওঠার সুনিশ্চিত সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, শ্রমিকদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চেতনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির ছিল ব্যাপক অংশগ্রহণ। ’৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানের চেতনায় সমৃদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমাজতন্ত্র অভিমুখী করতে ভূমিকা রাখে। অক্টোবর বিপ্লবের চেতনায় শ্রমিকশ্রেণি অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে উপমহাদেশকে মুক্ত করার লড়াইয়েও থেকেছে সামনের সারিতে, সবচেয়ে সাহসী সৈনিকদের ভূমিকায়, সবচেয়ে আত্মপ্রত্যয়ী-আত্মত্যাগী যোদ্ধার ভূমিকায়। শ্রমিকেরা দাঁড়িয়েছেন দেশীয় সামন্ত প্রভু-দেশীয় রাজন্যবর্গের বিরুদ্ধে। শ্রমিকেরা দাঁড়িয়েছেন গণতান্ত্রিক দাবি নিয়ে। শ্রমিকরা মৈত্রী গড়ে তুলেছেন কৃষকদের সাথে। শ্রমিকরা আপসকামী রাজনৈতিক নেতৃত্বের আপসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, যাতে এই নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের কাছে সবার স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে না দিতে পারে। আমাদের দেশসহ গোটা উপমহাদেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণির রয়েছে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। এটা প্রমাণ করে শ্রমিক শ্রেণিই হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে অগ্রসর শ্রেণি। অক্টোবর বিপ্লবের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে আজ হোক, কাল হোক শ্রমিকশ্রেণি অন্যান্য মেহনতিদের সাথে নিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তাদের ওপর অর্পিত ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবে। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..