সমকালীন পুঁজিবাদ ও অক্টোবর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

হায়দার আকবর খান রনো: [অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে পঠিত বক্তব্য] মহান অক্টোবর বিপ্লব কেবল অন্যতম বৃহত্তম দেশে সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়াদের উৎখাত করে সেই দেশে সমাজতন্ত্র অভিমুখী যাত্রাই শুরু করেনি, এই বিপ্লব গোটা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণি ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর স্বপক্ষে বিশ্ব-ইতিহাসের ধারাকেও পরিবর্তিত করেছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই বিপ্লব অন্যান্য দেশের শ্রমিক ও অন্যান্য শোষিত শ্রেণিকে মুক্তি-সংগ্রামের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র পৃথিবীর বহু বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদকে আকৃষ্ট করেছিল। অক্টোবর বিপ্লবের জন্যই উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশ দেশগুলো জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য লাভ করছিল এবং সে জন্যই পরাধীন জাতিসমূহ দ্রুত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অস্তিত্বের কারণেই গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের মধ্যেই সারা পৃথিবী থেকে পুরনো উপনিবেশবাদ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল, যদিও সেই স্থানে নয়া উপনিবেশবাদ দেখা দিয়েছিল। অক্টোবর বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সারা দুনিয়ার মানুষের চিন্তা-চেতনাকেও প্রগতির অভিমুখে প্রভাবিত করেছিল। শক্তিশালী নারী-মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আরও গড়ে উঠেছিল বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন। মানবিক মূল্যবোধকেও সোভিয়েত ইউনিয়ন উন্নতর স্তরে উন্নীত করেছিল। আর তাই গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক অধিকার সংক্রান্ত বুর্জোয়া বুলিসমূহ যে ভণ্ডামিতে ভরা তা-ও প্রমাণিত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশে মানুষ কর্তৃক মানুষের ওপর শোষণের অবসান ঘটেছিল। শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, অন্যান্য ধরনের সামাজিক শোষণেরও অবসান ঘটেছিল। এই সব দৃষ্টান্ত পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ দেশসমূহেও প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনাকে নতুন ও উন্নত স্তরে উন্নীত করতে সাহায্য করেছিল। যদিও সর্বহারা শ্রেণি মাত্র একটি দেশে, রাশিয়াতে বিজয় অর্জন করেছিল, তবু তার প্রভাব পড়েছিল সারা বিশ্বে। অক্টোবর বিপ্লবের আগেও লেনিন বিজয়ী সর্বহারা শ্রেণির আন্তর্জাতিক ভূমিকার কথা বলেছিলেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, “বিজয়ী প্রলেতারিয়েত নিজ দেশে পুঁজিপতিদের উৎখাত ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংগঠিত করার পর তারা বাকি বিশ্বের বিরুদ্ধে অর্থাৎ পুঁজিবাদী বিশ্বের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, পুঁজিবাদী দেশসমূহের নিপীড়িত শ্রেণিগুলিকে আকৃষ্ট করবে, পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের জন্য জাগ্রত করবে এবং প্রয়োজন হলে শোষকশ্রেণি ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র শক্তিও ব্যবহার করবে।” (রচনা সমগ্র, মস্কো ইংরেজি খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা-৩৪২) অক্টোবর বিপ্লবের দশ বছর পর আরও সুনির্দিষ্টভাবে স্তালিন একই কথা বলেছিলেন, “অক্টোবর বিপ্লব সাম্রাজ্যবাদকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে একই স্থানে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের আধারে তৈরি করেছিল বিশ্ব-বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য একটি শক্তিশালী ও প্রকাশ্য ঘাঁটি। এমন ঘাঁটি আগে কখনও ছিল না, যার উপর বিশ্ব-বিপ্লবী আন্দোলন সমর্থনের জন্য নির্ভর করতে পারে। অক্টোবর বিপ্লব বিশ্ব-বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য একটি শক্তিশালী ও প্রকাশ্য কেন্দ্র তৈরি করেছে, যা আগে কখনও ছিল না এবং যাকে কেন্দ্র করে এখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সব দেশের নিপীড়িত জনগণ ও সর্বহারার বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট সংগঠিত ও সমবেত করা সম্ভব। (অক্টোবর বিপ্লবের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য, রচনা সমগ্র, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫১) অক্টোবর বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের অর্জন বিশাল। বিশ্ব-ইতিহাসে এই প্রথম মানুষ কর্তৃক মানুষের ওপর শোষণের অবসান ঘটেছিল। অর্থনৈতিকভাবে সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হলো। ১৯২৮ সালে সোভিয়েত সরকার ও বলশেভিক পার্টি সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়েই তারা অর্জন করেছিলেন প্রায় ১২ শতাংশের মতো উচ্চমানের প্রবৃদ্ধির হার। সোভিয়েত ইউনিয়ন তুলনামূলক পশ্চাৎপদ দেশ ছিল। কিন্তু গত শতাব্দীর ৩০-এর দশকের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর দেশগুলির অন্যতম। এই প্রসঙ্গে এ কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এটা ছিল ঠিক সেই সময় যখন গোটা পুঁজিবাদী বিশ্বে চলছে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও মন্দার কাল। তখন সব উন্নত পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশে উৎপাদন থেমে গেছে এবং বেকারত্বের সংখ্যা ছিল ভয়াবহরূপে বিশাল। উদাহরণস্বরূপ আরও বলা যায়, একমাত্র নিউইয়র্ক শহরেই না খেতে পেরে ২ হাজার বেকার মৃত্যুবরণ করেছিল। শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্য ছিল ব্যাপক। সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নাগরিকদের প্রত্যেকের জন্য জীবনের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নই হিটলারের নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করেছিল। আর এইভাবে বিশ্বকে ফ্যাসিবাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে গৌরবজনক সাফল্য অর্জন করেছিল তা পুঁজিবাদ কখনও কল্পনাও করতে পারে না। তা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ৭০ বছর পর ভেঙে পড়েছিল এবং পুঁজিবাদ নোংরা চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। এটা কী করে সম্ভব হলো? এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে গভীর ও বিস্তৃতভাবে আলোচনা হওয়া দরকার। সমাজতন্ত্রের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে বলশেভিক নেতৃত্ব কোনো ছক বাঁধা চেনা পথে চলতে পারেননি। ফলে কিছু ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা জোরের সঙ্গে বলতে পারি যে, যদি কোনো ভুল-ভ্রান্তি হয়েও থাকে, তা কখনই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের জন্য একমাত্র, এমনকি প্রধান কারণ হতে পারে না। বস্তুত সমাজতন্ত্রের কোনো পতন হয়নি। এই বিপর্যয়ের জন্য সমাজতন্ত্রের নীতিকে কোনোভাবেই দায়ী করা যেতে পারে না। অক্টোবরের বিপ্লবের আগেই ১৯১৬ সালে যে কথাটি লেনিন বলেছিলেন, তা উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তিনি বলেছিলেন, “বিশ্বে ইতিহাসের ধারা মাঝে-মধ্যে বড় রকমের পশ্চাৎপসরণ ছাড়া একটানা মসৃণ পথে সবসময় সামনের দিকে অগ্রসরমান হবে-এই রকম মনে করা হবে দ্বন্দ্ববাদকে অস্বীকার করা, এবং তা হবে অবৈজ্ঞানিক ও পরিপূর্ণরূপে ভ্রান্ত।” (জুনিয়াস প্যাম্পপ্লেট, রচনা সমগ্র, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ৩১০) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী ও বিলোপবাদীরা সমাজতন্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কেই প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তারা এমন কথাও বলেছেন যে, অক্টোবর বিপ্লব নাকি বিপ্লবই ছিল না। এটা ছিল ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা মাত্র, যখন লেনিন ও বলশেভিক পার্টি সামরিক অভ্যুত্থান ও হঠকারীতার মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে তা দীর্ঘ ৭০ বছর টিকে থাকতে পারত না এবং এত গৌরবজনক সাফল্যও অর্জন করতে পারত না। প্রায়শ আরেকটি প্রশ্ন করা হয়। “এটা কী করে সম্ভব যে, প্রলেতারীয় বিপ্লবের যুগ শুরু হলো পশ্চাৎপদ রাশিয়াতেই, যার জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই হচ্ছে কৃষক?” এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং লেনিনই দিয়েছিলেন। পুঁজিবাদী বিশ্বের অসম বিকাশের সূত্রটি তিনি আবিষ্কার করেন এবং এরই ভিত্তিতে তিনি বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার দুর্বলতম গ্রন্থিকে ছিন্ন করার তত্ত্ব তুলে ধরেন। অক্টোবর বিপ্লবের দুই বছর আগেই ১৯১৫ সালে লেনিন বলেছিলেন, “অসম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশ হলো পুঁজিবাদের অপরিবর্তনীয় নিয়ম। তাই প্রথমে কয়েকটি এমনকি একটি মাত্র দেশেই সমাজতন্ত্রের বিজয় সম্ভব হবে।” (রচনা সংকলন, খণ্ড- ২১, পৃষ্ঠা ৩৪২) সেই সময় রাশিয়ায় সব মৌল দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। তাই রাশিয়া ছিল সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থার দুর্বলতম গ্রন্থি। তখন ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে’র বেশ কয়েকটা পার্টি দাবি করত যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেবল সেখানেই সম্ভব, সেখানেই ‘অনুমোদিত’, যেখানে পুঁজিবাদী উৎপাদনী শক্তি পরিপূর্ণরূপে পরিপক্বতা অর্জন করেছে এবং সর্বহারা শ্রেণি জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পুরোপুরি অর্জন করেছে। লেনিন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সেই সব পার্টির গোড়ামীপূর্ণ এই তত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এমনকি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রতিষ্ঠাতা মার্কস-এঙ্গেলস যদিও উৎপাদনী শক্তির স্তর ও উৎপাদনী শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বকে খুবই গুরুত্ব দিতেন, তবু তারা সবসময় যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী ছিলেন। ‘জার্মান ইডিওলজি’ নামক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে তাঁরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, “....ঘটনাক্রমে কোনো বিশেষ দেশে সেই ধরনের সংঘর্ষের দিকে যাওয়ার জন্য এই দ্বন্দ্বকে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানোর প্রয়োজন না-ও হতে পারে।” তারা এই অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন এবং দেখান যে, কোনো কোনো বিশেষ উপাদান স্বল্প শিল্পোন্নত দেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরির জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে।” মার্কস-এঙ্গেলসের এই বক্তব্যটির প্রতি খুব বেশি নজর দেয়া হয়নি। কিন্তু প্রায়শ যা জোর দেয়া হয় তা হলো তারা নাকি মনে করতেন যে, প্রথমে সর্বাধিক শিল্পোন্নত দেশেই বিপ্লবী পরিবর্তন সাধিত হবে। মার্কস-এঙ্গেলসের উপরোক্ত বক্তব্যটি আসলে এই প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে পারে। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসও ভিন্ন কথা বলে। অক্টোবর বিপ্লবের পরে চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া যে সব দেশে বিপ্লব হয়েছিল সেই দেশগুলি ছিল আরও অনগ্রসর। এই সব দেশে শ্রমিক শ্রেণি ও তার পার্টি অর্থাৎ কমিউনিস্ট বা ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লব বিরতিহীনভাবে সমাজতন্ত্র অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিল। বিগত একশ বছরে পৃথিবী নানা দিক দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে। দুর্বলতম গ্রন্থিকে ছিন্ন করার তত্ত্ব এখন আর কার্যকরী নয়। অক্টোবর বিপ্লব বা চীন বিপ্লব বা ভিয়েতনাম বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি আর হবে না। একবিংশ শতাব্দীর বিপ্লব কোন দেশে সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কী রূপ গ্রহণ করবে তা অনুমান করা সম্ভবও নয়, উচিতও নয়। তবে আমরা যা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি তা হলো, সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেবল সম্ভবই নয়, একবিংশ শতাব্দীতে যা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কারণ এখন সমাজতন্ত্রের জন্য বস্তুগত উপাদান ও শর্তসমূহ লেনিনের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব। ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। তাহলে আমরা দেখব যে, বিপ্লব সংঘটিত হতে হলে বস্তুগত পরিস্থিতি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ১৮৯৫ সালে এঙ্গেলস ইউরোপের ১৮৪৮ সালের বিপ্লব সম্পর্কে বলেছিলেন (মার্কসের লেখা ‘ফ্রান্সের শ্রেণিসংগ্রাম-১৮৪৮-৫০’ গ্রন্থের ভূমিকা) এটা আমাদের কাছে পরিস্কার হয়েছিল যে, তখনও মহাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের স্তর পুঁজিবাদী উৎপাদনের বাতিলের জন্য মোটেও পরিপক্ব ছিল না।” কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বস্তুগত অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন পুঁজিবাদ তার সর্বোচ্চ স্তরে অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদে উপনীত হয়েছে, যখন পুঁজিবাদ হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু ও মূমুর্ষ। আবার এই সাম্রাজ্যবাদের যুগটাই হচ্ছে সর্বহারা বিপ্লবের যুগ। সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত লেনিনের বিশ্লেষণ এটা দেখিয়ে দিয়েছে যে, এমনকি রাশিয়ার মতো আপেক্ষিক পশ্চাৎপদ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক পুর্নগঠন সম্ভব হতে পারে। লেনিন আরও বলেছেন, (বিশেষ করে ১৯০৫ সালে লেখা ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোসাল ডেমোক্রেসির দুই কৌশল’ নামক তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থে) সর্বহারার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাজতন্ত্র অভিমুখে অগ্রসর হবে। ঠিক সেটাই রাশিয়ায় ঘটেছিল। এখন আসা যাক, বর্তমান যুগের সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা প্রসঙ্গে। অক্টোবর বিপ্লবের পর গত একশ বছরে যে সব মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছুটা উল্লেখ করা যাক। আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজি বলতে এখন বোঝায় প্রায় ৫০০-এর মতো আন্তর্জাতিক অতিকায় একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানমূহকে যারা দুনিয়াব্যাপী ব্যাংক, শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষিশিল্পে একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৯০ সাল থেকে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার আন্তর্জাতিকীকরণ গুণগতভাবে এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে। সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অতিকায় একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানসমূহের দ্বারা পৃথিবীতে আধিপত্যের অবস্থান দখল করা ও তাকে রক্ষা করাই হচ্ছে আজকের পুঁজিবাদের মৌলিক ও অর্থনৈতিক নিয়ম। অবশ্য বুর্জোয়া তাত্ত্বিক ও অর্থনীতিবিদগণ এবং সেই সঙ্গে সংশোধনবাদীরাও দাবি করেন যে, এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবে একটি একক বিশ্ব ট্রাস্টের দিকে, যা নাকি সব দেশ ও সব শ্রেণির জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে আসবে। বলাই বাহুল্য, এমন ভাবনা নিছক অবাস্তব। এমন ভাবনা কাউটস্কির অতি সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, লেনিন যার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন একশ বছর আগে। “এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিকাশের প্রবণতা হচ্ছে একটি একক বিশ্ব ট্রাস্টের দিকে, যার মধ্যে থাকবে ব্যতিক্রমহীনভাবে সব রাষ্ট্র ও সব শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই বিকাশ অগ্রসর হবে এমনভাবে, এমন গতিতে ও এমন ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে, এমন দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ও উত্থানের মধ্য দিয়ে, শুধু অর্থনৈতিকই নয়, রাজনৈতিক জাতীয় ইত্যাদি ধরনের উত্থানের মধ্য দিয়েও যে, তাতে অনিবার্যভাবে সাম্রাজ্যবাদ ফেটে পড়বে এবং একক বিশ্ব ট্রাস্ট গঠিত হবার অনেক আগেই, জাতীয় ফিনান্স পুঁজির বৈশ্বিক একীভূত হবার অনেক আগেই, অতি-সাম্রাজ্যবাদী অবস্থায় যাবার অনেক আগেই পুঁজিবাদ তার বিপরীতে রূপান্তরিত হবে।” (এন. বুখারিনের প্যামপ্লেটের ভূমিকা, রচনা সংকলন, খণ্ড-২২, পৃষ্ঠা ১০৭) আধুনিক পুঁজিবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ফটকাবাজির আধিপত্যকারী ভূমিকা। লাগাতারভাবে পুঁজির অতি সঞ্চয়ের কারণে উৎপাদনশীল শিল্পের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমাগত সীমিত হয়ে আসছে। তাই আন্তর্জাতিক একচেটিয়া সংস্থাসমূহ সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক লগ্নি বাজারে ফটকাবাজিতে তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি বিনিয়োগ করে। এই অবস্থাটা বর্তমান সময়ের বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার দেউলিয়াত্ব ও অপ্রয়োজনীতার দিকটাই তুলে ধরছে। আমেরিকান মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ পল সুইজি যথার্থ বলেছেন যে, বর্তমান সময়ে পুঁজি সত্যিকার অর্থনীতিকে সেবা করে না। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর অর্থাৎ মহামন্দা শুরু হবার পরপরই মান্থলি রিভিউ পত্রিকায় এক প্রবন্ধে জন বেলামি ফোস্টার ও ফ্রেড ম্যাগডফ পল সুইজির ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন, “আমেরিকান অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বহু আগেই দেখিয়েছিলেন যে, স্থবিরতা ও বিপুল পরিমাণে লগ্নিপুঁজির ফটকাবাজির উদ্ভব ঘটেছে। সংশোধনের অযোগ্য গভীর অর্থনৈতিক কানাগোলির প্রতীক রূপেই তা বর্তমান। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে স্থবিরতার মানে হচ্ছে এই যে, মুদ্রারূপী পুঁজিকে ধরে রাখা ও বৃদ্ধি করার তাগিদে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমবর্ধমান হারে লগ্নিপুঁজির প্রবৃদ্ধির নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অর্থনীতির লগ্নি কাঠামো শুধুমাত্র উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তির ওপর সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনভাবে নির্ভর করে আর বাড়তে পারছিল না।” এই সব উপাদান ভবিষ্যতের সমাজতন্ত্রের বিকাশ ও সাফল্যের জন্য বস্তুগত শর্ত তৈরি করেছে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আজকের দিনে সারা বিশ্বেই অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ দেশে প্রথম পর্যায়ে দরকার হবে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যেই বিপ্লবী গণতান্ত্রিক রূপান্তর। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে দেশ দ্রুতই সমাজতন্ত্রের অভিমুখে এগিয়ে যাবে। সেই জন্য আমাদের পার্টি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যাভিমুখী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের রণনীতি গ্রহণ করেছে। সারা বিশ্বে এখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এজেন্ডায় চলে এসেছে। তার জন্য বস্তুগত পরিস্থিতি খুবই পরিপক্ব। হ্যা, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাময়িক বিপর্যয় সত্ত্বেও আমরা এ কথা জোরের সঙ্গে বারবার উচ্চারণ করছি। বিপ্লব বিলম্বিত হচ্ছে, কারণ আমরা সাবজেকটিভ প্রস্তুতির দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছি। বস্তুগত বিকাশের দিক দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ক্ষয়িষ্ণু। এই যুগ হলো সমাজতন্ত্রের যুগ। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণিচেতনা এখনও বস্তুগত অবস্থার সঙ্গে তাল রেখে অগ্রসর হতে পারেনি। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ দেশের শ্রমিকদের চেতনা ও কাজ পিছিয়ে আছে। পুঁজিবাদকে সংশোধন করা যায় এমন মোহ দ্বারা তারা আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাই, শক্তিশালী মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনার কাজটি জোরের সঙ্গে করা এখন আরও জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং আমরা এই কাজ সব দেশের শ্রমিক শ্রেণির পার্টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যৌথভাবে করতে পারি। কোন দেশ বা দেশগুলোতে বিপ্লব হবে এবং কীভাবে হবে-এ নিয়ে আমাদের আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করার দরকার নেই। কিন্তু যা নিশ্চিত তা হলো কোনো দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য আগের যে কোনো সময়ের অনেক বেশি নির্ভর করবে অন্যান্য দেশের বিপ্লবী আন্দোলনের ওপর। একই সঙ্গে এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, লেনিনের তত্ত্ব ও অক্টোবর বিপ্লবের মৌল শিক্ষাসমূহকে আরও গভীরভাবে বুঝতে ও অনুধাবন করতে হবে যদি আমরা একুশ শতকের বিপ্লবী আন্দোলনকে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে চাই। তাই অক্টোবর বিপ্লব এখনও জীবন্ত। আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজতন্ত্রের লাল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরি। শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী পার্টিসমূহের সমন্বিত কাজের কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। লেখক: সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..