প্রশ্ন ফাঁসের ভয়ংকর বাণিজ্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বলা যায় পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষা হচ্ছে কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস হয়নি, এমনটা শোনা এখন আহামরি বিষয়। সর্বশেষ, গত ৯ নভেম্বর রাজধানীর একটি জেএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে মোবাইলে প্রশ্ন মেলার খবর জানা গেল। গত দুই-চার-পাঁচ বছরের প্রশ্ন ফাঁসের ফিরিস্তি লিখে শেষ করা যাবে না। এক কথায় প্রশ্ন ফাঁসের বাজার রমরমা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, পরীক্ষার আগে পরীক্ষার্থীর পাশাপাশি অভিভাবকরাও এখন প্রশ্ন খুঁজে বেড়ান। পরীক্ষার আগের রাতে শিক্ষার্থীরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে বইয়ে মুখ গুঁজে রাখার যে চিত্র এতকাল দেখে এসেছে সবাই, এভাবে প্রশ্নফাঁস অব্যাহত থাকলে এ দৃশ্য অতীত হতে বেশিদিন লাগবে না। উন্নয়নের মহাসড়ক দিয়ে যারা দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তাদের এ নিয়ে মাথাব্যথা অছে বলে মনে হয় না। বরং অনেক সময় মনে হয়েছে, নিরাপদ আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে, পরস্পর যোগসাজশেই ঘটছে। এমনটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। যখনই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠছে বা প্রমাণ মিলছে, সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করছেন। এমনকি খোদ শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত। যখন অস্বীকার করার আর উপায় থাকে না, তখন এ নিয়ে কিছুদিন হম্বিতম্বি চলে। বড়জোড় পরীক্ষা বাতিল করা হয়। তাছাড়া, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় হাতেনাতে কেউ ধরা পড়লে তার বিচার কী হয়, তা কেউ জানে না। জানার কথাও না। এখন পর্যন্ত যে দু-একজন ধরা পড়েছে তাদের পরিচয়-পরিচিতির কারণেই কারো জানার আগ্রহ থাকার কথা না! প্রশ্ন হলো, এভাবেই কি চলবে? এর কি কোনো প্রতিকার নেই? হতাশ করে বলতে হচ্ছে, না নেই। কেউ কি বলতে পারবে প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়িত্ব অবহেলার কারণ দেখিয়ে কখনো কারো চাকরি গেছে? যায়নি। প্রশ্ন ফাঁসের মত এতো বড় একটা কারণে কখনো কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন? করেননি। বরং দেখা যাচ্ছে, পুরো ব্যাপারটিকে অস্বীকার করা হচ্ছে নির্লজ্জভাবে! সম্প্রতি জানা গেছে, প্রশ ফাঁস ঠেকাতে নাকি কেনা হচ্ছে অত্যাধুনিক ‘ডিজিটাল অটোমেটেড প্রিন্টিং মেশিন’। সারা দেশে সব ধরনের প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই মেশিন কেনা হবে বলে জানিয়েছে সরকারের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কিনতে যাওয়া এই আধুনিক মেশিনে ছাপা হবে দশটি শিক্ষা বোর্ড, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসি) শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), সার্টিফিকেট (জেএসসি), জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিপিস)’র প্রশ্নপত্র। পাশাপাশি বাজেট, রিপোর্ট, বিল, আইন, অধ্যাদেশ, লিফলেট, পোস্টার, আদেশপত্র, অর্থনৈতিক সমীক্ষা, জার্নাল, ফরম, ডিও প্যাড, ডিও খাম, দাওয়াতপত্র, ভৌগলিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সংক্রান্ত কাগজপত্র বিশেষ গোপনীয়তা বজায় রেখে ছাপা হবে এই মেশিনে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয় মেশিন কেনার বিষয়টি। ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব অটোমেটেড, ডিজিটাল, এনক্রিপটেড প্রিন্টিং সিস্টেম ফর কনফিডেনসিয়াল সেকশন অব বিজি প্রেস’ প্রকল্পের আওতায় মেশিনটি কেনা হচ্ছে। সে সময় মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এফ আমিন চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘সব কিছু স্বয়ংক্রিয় হলে শুধু প্রশ্নপত্র নয় আর কোনো কিছু ফাঁসের ঘটনাই আর ঘটবে না।’ ২০১৮ সালের জুন মাস নাগাদ পুরোদমে এই অত্যাধুনিক মেশিনে ছাপা শুরু হবে জানিয়ে মহাপরিচালক আশা প্রকাশ করেছিলেন, ‘আশা করা যায়, এর মধ্য দিয়ে দেশ থেকে চিরতরে দূর হবে প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাধি।’ ‘ডিজিটাল অটোমেটেড প্রিন্টিং মেশিন’-এ প্রশ্ন ফাঁস কতটুকু দূর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মহাপরিচালকের কথায় একটা বিষয় পরিষ্কার যে, প্রশ্ন ফাঁস ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। জাতির মেরুদণ্ডে যে ব্যাধি বাসা বেঁধেছে তা কি এসব মেশিনে দূর করা সম্ভব? সম্ভব। তবে মেশিনে নয়, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের বোধ, আত্মোদ্বোধন, দায়বদ্ধতা আর বৈষম্যহীনতার অনুশীলনে। সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় চলমান যে বৃহদাকার বৈষম্য তা সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণি বৈষম্যেরও প্রতিফলন। ভাবনাটা যেহেতু আসন্ন অনাগত সময়ের, বিশেষত শিক্ষা ভাবনাটা যেহেতু জাতির আত্মশিক্ষা অর্জনের অতএব প্রশ্ন ফাঁসের মতো এইসব ‘ভয়ংকর বাণিজ্য’ বন্ধে কঠোর হওয়া একান্ত জরুরি। নয়তো আত্মহননের এই পথে প্রশ্ন ফাঁস জাতির কণ্ঠে পরাবে ফাঁসির মালা!
সম্পাদকীয়
ঘুষ-দুর্নীতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..