অগ্নিযুগের বিপ্লবী কমরেড নগেন সরকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডা. এনামূল হক ইদ্রিস : “মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে তার জীবন আর এই জীবন তখনই সার্থকতা লাভ করে যখন তাহা মানুষের কল্যাণে উৎসর্গিত হয়।’ -দস্তয়েভস্কি জন্ম ১৮৯৭, মৃত্যু- ১৩ অক্টোবর, ১৯৮১ইং ১৭৫৭ সালে ইংরেজ বেনিয়ারা ভারতবর্ষ দখল করে নেয়। তারপর ১৭৯৩ সালে ভারতবর্ষে ভূমিব্যবস্থাতে চিরস্থায়ী প্রথা এবং রাষ্ট্রভাষা ফারসির বদলে ইংরেজি চালু করা হয়। ইংরেজদের শাসন, শোষণ, সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতন চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে জমিদার, তালুকদার, জায়গীরদারসহ নানা শ্রেণি গড়ে তোলে। ভারবর্ষের চাষিদেরকে ধান, পাঠসহ দেশীয় পণ্য উৎপাদন না করে নীলচাষ করতে বাধ্য করা হতো। যারা নীল চাষ করতে রাজি হতো না তাদের ওপরে নেমে আসতো অমানবিক অত্যাচার। নিরীহ কৃষকদের স্ত্রী, কন্যাদের জোর করে নীলকুঠিরে নিয়ে যাওয়া হতো এবং তাদেরকে ধর্ষণপূর্বক হত্যা করা হতো। এ সকল কাহিনি আমাদের প্রায় সকলেরই জানা। ইংরেজদের এই অমানবিক নির্যাতনে সহযোগী ছিল এদেশীয় ইংরেজ গোলাম (ভক্ত) জমিদার, তালুকদার পরগাছা শ্রেণি। তাদের সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতনের ফলে ভারতবর্ষে সাধারণ কৃষক ও শ্রমিকের মাঝে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়। সাধারণ মানুষের মাঝে ইংরেজবিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটে ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে। বিভিন্ন অঞ্চলে, অনুশীলন, যুগান্তরসহ নানা নামে ইংরেজ বিরোধী সংগঠন গড়ে উঠে। এসকল সংগঠনের নেতৃত্বে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে, শুরু হয় ইংরেজ বিরোধী গণআন্দোলন। গণআন্দোলন ও বিদ্রোহের প্রথম ১৯০৮ সালে ১১ আগস্ট ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। ক্ষুদিরামের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে ইংরেজবিরোধী জোয়ারের সৃষ্টি হয়। এসময় ১৯১২/১৩ সালের দিকে কমরেড নগেন সরকার ১৫/১৬ বছর বয়সেই বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন দলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তবে কেহ কেহ যুগান্তরের কথাও বলেন। এ সময় তিনি নবম ও দশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। কমরেড নগেন সরকারের বাবা গোপীনাথ সরকার ছিলেন তালজাঁঙ্গার জমিদার রাজেন্দ্র চন্দ্র রায়ের নায়েব (সরকার)। তাই তিনি জমিদারের অমানবিক জুলুম ও নির্যাতন স্বচোক্ষে দেখেন। এই সকল অন্যায় অত্যাচার দেখে তিনি বিদ্রোহী হয়ে উঠেন এবং তার মনে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে উঠে। কমরেড নগেন সরকারের বয়স যখন ১৫/১৬ বছর অর্থাৎ ১৯১৪/১৫ সালে, তখন বিশ্ব পরিস্থিতি ও ভারতবর্ষে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা কি ছিল তা সংক্ষেপে জানা দরকার। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে ১৯১৬ সালে শেষ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯। ১ সেপ্টেম্বর পোলান্ডকে জার্মানির আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। ইংরেজদের দখলকৃত ভারতবর্ষেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৬ সালে যুদ্ধ শেষে তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বেকারত্ব, চুরি, ডাকাতি ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। মানুষের মাঝে ইংরেজ বিরোধী চেতনাও বেড়ে যায়। কমরেড নগেন সরকারের জীবনী আলোচনা ক্ষেত্রে ভারতবর্ষে আর্থ-সামাজিক অবস্থা স্মরণ রাখা দরকার। সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে : ১৯৩৯ সালে, বর্তমানে ঈশাঁখা- রোডে ফায়ার ব্রিগেড অফিসে ছিল কমিউনিস্ট কার্যালয়। এ কার্যালয়ে কমরেড নগেন সরকারের নেতৃত্বে ১০/১২ জন সহকর্মী নিয়ে একটি “কমিউন” চালু করেন। কমিউনে যারা সার্বক্ষণিকের দায়িত্বে ছিলেন তারা হলেন, কমরেড ওয়ালী নেওয়াজ খান, কটিয়াদীর সুবোধ গোস্বামী, ক্ষিতিশ চক্রবর্তী এবং কটিয়াদীর বজ্রগোস্বামী, সরারচরের ক্ষিতিশ রায়। কটিয়াদীর আছমিতার গ্রামের বীরেন দাস (তিনি পরবর্তীতে করিমগঞ্জের মোদকপাড়ায় বাড়ি করেন এবং সেখানে ১৯/১২/১৯৮৯ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে) লেখার অধিকাংশ তথ্যই তার একটি ছিন্ন পাণ্ডুলিপি থেকে সংগ্রহ করা। এছাড়াও ওই কমিউনে ছিলেন করিমগঞ্জের মরহুম জমিয়ত আলী, তাড়াইলের ধামিহা ইউনিয়নের রাহেলা গ্রামের কমরেড গঙ্গেশ সরকার, কিশোরগঞ্জে বিন্নাটি গ্রামের ডাঃ বিল্ম মঙ্গঁল চক্রবর্তী, করিমগঞ্জের জঙ্গলবাড়ী দেওয়ান কাজিম দাদ খান (কাজু মিয়া), ময়মনসিংহ শেরপুরের এহসা আলী ও ভূপেন হাজং। কমরেড নগেন সরকার ছিলেন উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি পুরুষ কমরেড মণি সিংহের সহকর্মী। ’৪০ এর দশকে কিশোরগঞ্জে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কমরেড নগেন সরকারের বিশেষ ভূমিকা ছিল। ভারত উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে কমরেড নগেন সরকারের নাম চির চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পরবর্তীতে কিশোরগঞ্জে যারা বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তারা প্রায় সকলেই নগেন সরকারের শিষ্য। কমরেড নগেন সরকার ছিলেন নিপীড়িত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। যেখানে মানুষের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, জরা-ব্যাধি, মৃত্যু সেখানেই কমরেড নগেন সরকারের উপস্থিতি, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ছিল। বৃটিশরা যখন ভারতবর্ষে কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি করেছিল, ফলে ১৯৪৩ সনে (১৩৫০ বাংলা) বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মহামারি ছড়িয়ে পড়ে এ সময় করিমগঞ্জের কাদির জঙ্গল ইউনয়িনের বড়চর গ্রামটি আক্রান্ত হয়। দুর্ভিক্ষ ও ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত বড়চর গ্রামের শত শত মানুষ মৃত্যুবরণ করে। দাফন বা চিতায় নিয়ে সৎকার করার মত কোনও সক্ষম পুরুষ ছিল না। সে সময়ে কমরেড নগেন সরকার তার ঘনিষ্ট অনুজ কমরেড জমিয়ত আলী, কমরেড ওয়ালী নেওয়াজ খান, ডাঃ আঃ ছোবহান, খুর্দিদ উদ্দিন (চেয়ারম্যান), কমরেড গঙ্গেশ সরকারসহ অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে মানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। মৃত ব্যক্তিদের সৎকার ও জীবিতদের জন্য লঙ্গরখানা চালু করে খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। উল্লেখযোগ্য যে, এ সময় সারা বাংলায় প্রায় পঞ্চাশ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে ও ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। মানুষের পঁচা গলা লাশ সৎকার ও দাহ করা হয় যত্রতত্র। তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান, চাল, পাট, বাঁশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে লঙ্গরখানা পরিচালনা করতেন। লতিফাবাদের চারণ কবি নিবারণ পণ্ডিত গান রচনা করেন- “শোন দুঃখের সমাচার করিমগঞ্জ তাড়াইল হইলোরে ঊজার বড়চর গ্রাম যাওয়ার পথে শত শত চিতা করব পাইবে দেখিতে” আজীবন বিপ্লবী চিরকুমার নগেন সরকার এর নিজের কোন বাড়ি ছিল না। তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময়ই জেলে বা আত্মগোপনে কাটিয়েছেন। শেষ জীবনে স্বাধীনতার পর প্রকাশ্য রাজনীতিতে চলে আসেন। তখন তিনি বার্ধক্যের ভারে আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারেন না। ঐ সময় তার ছোট ভাই কৃষি কর্মকর্তা গিরীন্দ্রনাথ সরকারের কিশোরগঞ্জ শহরের খরমপট্টি এলাকায় জোড়া পুকুর পাড়ের বাড়িতেই থাকতেন তিনি। এ সময়ই বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হন কমরেড নগেন সরকার। ক্রমশ তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে ঢাকার কয়েকজন সহকর্মী প্রথমে তাকে সোহরাওয়ার্দী হৃদরোগ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এর পর সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে। সেখানেই তিনি ১৯৮১ সালের ১৩ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি ১৮৯৭ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১২/১৩ সনে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন বলে তার আত্মীয়দের কাছ থেকে জানা যায়। কোন বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তা কেউ বলতে পারে না। ১৯৬৫ সনে সোভিয়েত নেতা ক্রশ্চেভ ও চীনের নেতা মাও সেতুং এর মধ্যে তত্ত্বগত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক পার্টিগুলিতে তার প্রভাব পড়ে। ফলে চীনপন্থি ও রুশপন্থি এই দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যায় বিশ্ব সমাজতন্ত্রীরা। তখন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে পড়ে। কমরেড মণি সিংহ, নেপাল নাগ, খোকা রায়, বারীন দত্ত (আঃ ছালাম), অনিল মুখার্জী, শহীদুল্লাহ কায়সার, চৌধুরী হারুন অর রশিদ ও মোজাফ্ফর আহমেদসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ নেন। ঐ সময় কমরেড তোহা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক। কমরেড তোহা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুখেন্দু দুস্তিদার মিলে চীনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি “সাম্যবাদী দল” গঠন করেন। কমরেড নগেন সরকার প্রথমে সাম্যবাদী দলের সঙ্গে ছিলেন। পরবর্তীতে কমরেড তোহার সঙ্গে মত পার্থক্য হলে তিনি সাম্যবাদী দল (নগেন গ্রুপ) নামে আরও একটি দল গঠন করেন। কমরেড নগেন সরকারের মৃত্যুর পর এর অংশের নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড দীলিপ বড়ুয়া। তিনি পরবর্তীতে মন্ত্রী হয়েছিলেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..