ফিরিয়ে আনতে হবে আস্থা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
পাকিস্তান আমলে মানুষ সার্বজনীন ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করেছে। বাংলাদেশ আমলে বিশেষ করে সামরিক শাসক এরশাদের আমলে ‘আমার ভোট আমি দিব’ দাবিতে সংগ্রাম করেছে। ১৯৯০ সালে এরশাদ স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ জাতির সামনে এসেছিল। কিন্তু ’৯০ এর পরবর্তী ক্ষমতাসীন দলগুলোর ক্ষমতালিপ্সার কারণে বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। স্বৈরাচার আমলের মত নির্বাচনকে পুনরায় তামাশায় পরিণত করা হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ঘটনা আজ এমন অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে যে, চলতি নির্বাচনী ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে ঢেলে সাজানো ব্যতিত তার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সিপিবি তার সুপারিশে বলেছে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা অত্যাবশ্যক। এজন্য গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘এলাকাভিত্তিক একক প্রতিনিধিত্বে’র পরিবর্তে ‘জাতীয়ভিত্তিক সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা’ চালু করা একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে একটা অপ্রয়োজনীয় বির্তক উদ্দেশ্যমূলকভাবে চালু করার অপচেষ্টা চলছে- কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে? ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের বুর্জোয়া-বামপন্থি নির্বিশেষে দলগুলো বলছে, বর্তমান হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন করতেই হবে। অপরদিকে বিএনপি প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বর্তমানে সহায়ক সরকারের আলোচনা সামনে নিয়ে এসেছে। তারা জাতিকে এ বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত করে সংঘাতময় একটা পরিস্থিতির দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায়। সিপিবি’র দিক থেকে নির্বাচন কমিশনকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে নির্বাচন কমিশনের পরিপূর্ণ কর্তৃত্বে, কোনও সরকারের অধীনে নয়। নির্বাচনকালীন সরকার শুধুমাত্র রুটিনমাফিক কাজ করবে, তার ক্ষমতা এখতিয়ার সাধারণ সময়ের সরকারের চেয়ে প্রভুত পরিমাণে কম হবে এবং এ সাময়িক সরকারটি একটি ভিন্ন চরিত্রের সরকার হবে। সংবিধান সংশোধন করে এ বিষয়টি সন্নিবেশিত করা হলে প্রতিটি নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জাতিকে জড়িয়ে পড়তে হবে না। আরেকটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সামনে আনা হচ্ছে- নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী নিয়োজিত করা হবে কী, হবে না। সিপিবি’র সুপারিশ, নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে যে কোনও রাষ্ট্রীয় বাহিনী নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। নির্বাচনে ‘লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল সবাই বুঝে দেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি’র মধ্যে সমতা বিধান করা। ফলে তাদের দিকে দৃষ্টি রেখে বিধি ব্যবস্থাগুলো তৈরি হয়। কিন্তু নির্বাচনের প্রধান স্টেক হোল্ডার হচ্ছে জনগণ। তাদের ৯৫ শতাংশকে কেবল ভোটার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, নির্বাচিত হওয়ার যে সাংবিধানিক অধিকার বিধি বিধানের মারপ্যাঁচে তা কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাই সিপিবি’র সুপারিশে প্রাধান্য পেয়েছে নির্বাচনী ব্যয়সীমা হ্রাস করা এবং ক্রমান্বয়ে তা রাষ্ট্র কর্তৃক বহন করা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত দুই হাজার টাকায় নামিয়ে আনা। বাধ্যতামূলক টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) বাতিল করে যাদের আয় করারোপযোগ্য সীমার ঊর্ধ্বে তাদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা। নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ‘লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে সিপিবি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। যার অন্যতম- তফসিল ঘোষণার অব্যবহিত পূর্বেই বিদ্যমান জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতি অর্থাৎ সংসদীয় সরকারের ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচনের পূর্বে বিদ্যমান সংসদ ভেঙ্গে দেয়াটাই রেওয়াজ। আমাদের দেশেও পঞ্চম সংশোধনীর পূর্বে এই রেওয়াজই ছিল। সিপিবি সেই রেওয়াজ পুনঃপ্রবর্তনের সুপারিশ জানিয়েছে। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির প্রার্থী এবং ভোটারবিহীন নির্বাচন মানুষের মনে নির্বাচন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এই অবস্থা মারাত্মক বিপদজনক। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনাটা এখন অগ্রাধিকারমূলক কাজ। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে মূখ্য উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..