সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রাম জরুরি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে পরাস্ত করার সংগ্রাম পরস্পরের সংযুক্ত। জনগণের মুক্তি অর্জন, শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ী হতে গেলে এই লড়াইগুলিতেও জিততে হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় এই লড়াইয়ের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের কেরালা রাজ্যের কোচিতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থি দলগুলির আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ এই অভিমত ব্যক্ত করেন। সিপিআই (এম)-র উদ্যোগে নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ‘সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের প্রতিনিধিরা। ভিসা সমস্যায় যোগ দিতে না পারলেও পাকিস্তানের কমিউনিস্টদের পাঠানো লিখিত অভিমত ও পরামর্শ এই সভায় আলোচিত হয়। মোট ২৭ জন প্রতিনিধি আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকার ১৩জন প্রতিনিধি এই আলোচনা সভায় যোগ দেন। প্রত্যেকে দেশের বামপন্থিরা কীভাবে লড়াই করছেন, সংহতিমূলক কার্যক্রম নেওয়া যায় কিনা, সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি নিয়ে অভিমত ও অভিজ্ঞতার বিনিময় হয় এই আলোচনা সভায়। ২৩ সেপ্টেম্বর শনিবার সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিলেন প্রতিনিধিরা ছাড়াও আমন্ত্রিতরা। সভাপতিত্ব করেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিআই (এম) পলিট ব্যুরোর সদস্য পিনারাই বিজয়ন। তাঁর ভাষণে বিজয়ন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ প্রভাব বৃদ্ধি করছে। তা একদিকে যেমন যুদ্ধের মতো বিপদ তৈরি করবে তেমনই নয়া উদারনীতির রাস্তা প্রশস্ত করবে। জনগণের শোষণ বাড়বে। ইতিমধ্যেই ভারতের মতো দেশে অর্থনৈতিক শ্লথতা দেখা দিয়েছে। কর্মসংস্থানের সংকট সামনে এসেছে। ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে শাসক শ্রেণি সব সমইে যুদ্ধজিগির তৈরি করে, এই অভিজ্ঞতাও আমাদের রয়েছে। এদিন বিকেলের অধিবেশনে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য শাহীন রহমান পার্টির পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননও তার লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন। বাংলাদেশ সংক্রান্ত অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সিপিআই (এম) পলিটব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম এবং শ্রীলঙ্কা সংক্রান্ত অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রকাশ কারাত। পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর রোববার বিকেলে কোচিতে রেড ভলান্টিয়ার্সদের মিছিল ও পরে জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিস্ট ও বামপন্থি দলগুলির আলোচনা সভা থেকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়। দেশে দেশে শাসকশ্রেণির জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই সমাজতন্ত্র গঠনের লক্ষ্যে সংগ্রামকে জোরদার করার কথা ঘোষিত হয় দলগুলির যৌথ বিবৃতিতে। কোচিতে সিপিআই (এম) আয়োজিত এই আলোচনাসভায় যোগ দিয়েছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল), নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী কেন্দ্র), শ্রীলঙ্কার কমিউনিস্ট পার্টি, জনতা বিমুক্তি পেরুনামা, সিপিআই এবং সিপিআই (এম)। পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিরা যোগ দিতে না পারলেও তাদের লিখিত অভিমত পাঠিয়েছিলেন। রোববার যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লগ্নিপুঁজি পরিচালিত নয়া উদারনীতি জনগণের জীবনজীবিকার ওপরে আক্রমণ নামিয়ে আনছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাজারের ওপরে লগ্নিপুঁজি দখলদারি কায়েম করছে। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ও বিপুল মানবসম্পদে পূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া তাদের এই লক্ষ্যের অন্যতম শিকার। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানব প্রয়াসের সমস্ত ক্ষেত্রে বিজ্ঞান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়াক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের অর্জিত সাফল্য ছিল নজিরবিহীন। দুনিয়াজুড়ে উপনিবেশবিরোধী বহু সংগ্রামকে তা অনুপ্রাণিত করেছে। ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করার সংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়ন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এই সংগ্রামে সোভিয়েতের জনগণের ত্যাগ স্বীকারকে কোনোদিনই ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে মুছে দেওয়া যাবে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বা সমাজতন্ত্রের আদর্শকে খারিজ করছে না। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এবং মানুষের জীবনের গুণগত উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে সমাজতন্ত্র নজিরবিহীন ভূমিকা পালন করেছে। এখনও তা প্রাসঙ্গিক, এখনও তা লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েই সাম্রাজ্যবাদ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সার্বভৌমত্ব প্রত্যেক দেশের অধিকার। সামাজিক মেরুকরণের লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে বামপন্থিদের লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির তরফে পেশ করা লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, সামরিক শাসনের সময়ে পাকিস্তানের সমাজকে ধ্বংস করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় মৌলবাদকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। সেই একই পদ্ধতিতে আজও উগ্রপন্থি তৈরি করা হচ্ছে। যে কাউকে খুন করে দেওয়া অতি সহজ। এর বিরুদ্ধে লড়াই-ই আজ পাকিস্তানে মুখ্য প্রশ্ন। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে একটি পৃথক প্রস্তাবে এই আলোচনাসভা থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের সমস্যা আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সভা শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে হয় রেড ভলান্টিয়ারদের মিছিল ও সমাবেশ। সন্ধ্যায় বিশাল সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। তিনি বলেন, নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ পালিত হচ্ছে কেননা শোষণের অস্তিত্ব রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম অনিবার্য। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিকাশমান বিজ্ঞান। তার প্রয়োগে ভুলত্রুটি হলেও নতুন সমাজ গঠনের সংগ্রাম বন্ধ হতে পারে না। তিনি বর্তমান ভারত সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সমস্ত দিক থেকেই দেশকে বিপন্ন করে তুলেছে এই সরকার। অর্থনীতি বেহাল, দেশের যুবসমাজের সামনে কাজের দিশা নেই। সংখ্যালঘু, দলিতদের ওপরে আক্রমণ চলছে। অসহিষ্ণুতার শিকার হচ্ছেন বুদ্ধিবৃত্তির জগতের মানুষ, শিল্পী-সাহিত্যিক, যুক্তিবাদী, সাংবাদিকরা। কর্ণাটকে গৌরী লঙ্কেশ হত্যার পরে বি জে পি-র মদতপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী দুষ্কৃতিদের হাতে তরুণ সাংবাদিক খুন হয়েছেন ত্রিপুরায়। তবে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইও ক্রমে জোরদার হচ্ছে। রাজ্যে রাজ্যে কৃষক বিক্ষোভ হচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে আরো জোরদার করতে হবে। এর সঙ্গেই কেরালা ও ত্রিপুরায় দুই বামপন্থি সরকারকে রক্ষা করতে হবে। এই দুই রাজ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে আর এস এস-বি জে পি। তাকে প্রতিহত করে দুই সরকারকেই আরো শক্তিশালী করতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..