যেভাবে বার্বি পুতুলের জন্ম হলো

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আফ্রিকান-আমেরিকান বার্বি ডল ২০১৫
দীপ্তি দত্ত : বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী মেয়েদের জন্য গড়ে তোলা বার্বি পুতুলের বাজারের পরিপ্রেক্ষিতে Jacqueline Urla Ges Alan C.Swedlund Gi ‘The Anthropometry of Barbie’ প্রবন্ধের একাংশ এখানে একতার পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে বার্বি পুতুলের জন্মের ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়েছে। বার্বিডল সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য আমাদেরকে বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিবেশের দিকে তাকাতে হবে, যা তার জন্মের পেছনে কাজ করেছিল এবং এই ঘটনাকে সম্ভব ও অর্থবহ করে তুলেছিল। জার্মান ‘লিলি’ (Lili) পুতুলের আদিরূপের (Prototype) উপর ভিত্তি করে, মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং ঠান্ডা যুদ্ধের আদর্শের মধ্য থেকে বার্বির জন্ম হয়েছিল। তার সুন্দর ও স্থায়ী ছাঁচ বস্তুত নকশা করেছিল জ্যাক রায়ান (Jack Ryan), যিনি রেথিয়ন কোম্পানি’র (Raytheon Company) জন্য হক (Hawk) এবং স্পেরো মিসাইলস (Sparrwo Missiles) এর নকশার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। বার্বির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মিলিটারি-অস্ত্র নকশাবিদ’রা হয়ে উঠে খেলনা আবিষ্কারক। যে বছর কুখ্যাত নিক্সন-ক্রুশ্চেভের ‘‘কিচেন ডিবেট” মস্কোর আমেরিকান ন্যাশনাল প্রদর্শনীতে স্থান করে নেয়, সেই বছরেই বার্বি বাজারে আসে। এখানে বিশ্বের গণমাধ্যমের সামনে পুঁজিবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের নেতারা মুখোমুখি হয় শুধু মিসাইল গণনার দিক থেকে নয়, ওয়াশিং মেশিন, টেলিভিশন এবং বৈদ্যুতিক বিষয়ের মতো আপেক্ষিক গুণাবলি নিয়েও সোভিয়েত ও আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র) মুখোমুখি হয়। ইলাইন টাইলার মে (Elaine Tyler May) তার ঠান্ডা যুদ্ধের গবেষণায় বলেন, এই বহুনন্দিত মিডিয়ার ঘটনা আমেরিকান (যুক্তরাষ্ট্র) পণ্য দুনিয়ার কথা জানান দেয় এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার রক্ষাকবচ এবং নিয়ন্ত্রক প্রতীক হিসেবে আদর্শ উপশহরের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। যদিও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের ভয় এবং ত্রুটিমুক্ত বোমার আশ্রয়ে থেকে, যৌনতাপূর্ণ উদ্ভট খেয়ালগুলো আমেরিকানদের (যুক্তরাষ্ট্র) কল্পনায় ছিল প্রচণ্ড গতিতে প্রসারণশীল। যেখানে বার্বি এবং বার্বির টর্পেডোমত স্তন লোকরঞ্জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠে এবং গার্হস্থ্য ও সমৃদ্ধির আকাক্সক্ষাকে, অনমনীয় লিঙ্গ ভূমিকার প্রতীক হিসেবে শাসন করতে শুরু করে। ফলে বার্বি, যুদ্ধোত্তর বুর্জোয়া ভোগবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় যার প্রতিমা হয়ে উঠেছিল আমেরিকান (যুক্তরাষ্ট্র) স্বপ্ন। প্রথম ‘টিনেজ’ ফ্যাশন পুতুল হিসেবেও বাজারজাত ও জনপ্রিয়তায় বার্বির উত্থান যুক্ত হয়েছিল। কোনো সন্দেহ নাই, যুদ্ধোত্তর একটি স্বতন্ত্র টিনেজ জীবনধারা সৃষ্টিতে এটা অবদান রেখেছিল। কিশোরীরা ও তাদের রুচি, তাদের আচরণ, সমাজতত্ত্ববিদ এবং অপরাধতত্ত্ববিদ উভয়েরই বিষয়ে পরিণত হয়েছিল মার্কেট জরিপ গবেষণাকারীদের মতোই, যাদের প্রবণতা ছিল তাদের বিবেচনাধীন ডলার কামানো। যখন রিটেইলারস্, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এবং মুভি মেকারসদের ‘the seven golden years’ ঘোষণাকে ১৩ থেকে উনিশ বছর বয়সের সীমায় টানা হয়, জে. এডগার হোভার (J. Edgar Hoover) তখন উচ্চারণ করেন আমেরিকান সমাজের জন্য Ôthe jvuenile jungle’ নির্দেশককে একটি বিপদ হিসেবে। বার্বি পুতুলের মধ্যে যেনো সুচতুরভাবে দুটি ধারণার সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। একজন ভালো মেয়ের মূর্ত রূপ তৈরি করা হয়েছে, যে হবে যৌনতার উদ্দীপক, কিন্তু তার নিজের কোনো যৌনতা নেই। এবং যে এইভাবে নিজেকে তৈরি করে নিজের শরীরকেই হ্রাস করা মানে খরচ করার মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়েই সে লাভ করে কেবলই খরচ, খরচ ও খরচ করার ধারণাই। প্রত্যেক সাবেক বার্বি মালিকরা জানতো একটা বার্বি কেনার পেছনে বস্তুগত বিবেচনাবোধ ছাড়াও কামবোধও কাজ করে। পলা রবিনওভিত্জ (Paula Rabinowity) এর হিসাব মতে, বার্বি পুতুলের পোশাকে ঝালর এবং ফ্যাশনে ফোকাস করার সঙ্গে সঙ্গে, শরীরকে এমন চুম্বকায়িত করে উপস্থাপন করা হয়েছে যেনো যুদ্ধোত্তর ইতিহাসের অধ্যায়ননামায় কিশোরী মেয়েরা এবং মেয়েদের সংস্কৃতি সাধারণের কাছে মালপত্রের মতো মূর্ত হয়। ভোগবাদী বুর্জোয়া পণ্য সংস্কৃতিতে এই দুটো বৈশিষ্ট্যই অপরিহার্য। কেন্দ্র নির্ধারিত ঠান্ডা যুদ্ধের অস্তিত্বের বর্ণনায় যা আপাতদৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। শহরতলির দোকানের অন্যান্য সরঞ্জামের সাথে এবং দোকানে বার্বির নিজস্ব মল সৃষ্টির মাধ্যমে, বছরের পর বছর ম্যাটেল বার্বির ভালোবাসা ধরে রাখতে পেরেছে স্বচ্ছন্দ শপিং লিস্টে। অতি সম্প্রতি একে কম্পিউটার গেম মার্কেটে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এখন আমাদের ইলেকট্রনিক ‘গেম গার্ল বার্বি’ (Game Girl Barbie) আছে যেখানে খেলার উদ্দেশ্যই হচ্ছে বার্বিকে কেনাকাটার উন্মাদনার মধ্যে নিয়ে যাওয়া। ‘গেম গার্ল বার্বি’র মধ্যে কেনাকাটা হয়ে উঠে দক্ষতার বিষয় এবং বার্বি খেলে জেতার জন্য। সম্ভবত এটাই বার্বিকে গড়ে তোলে মৃত পুঁজিবাদীদের নারীত্বের আদর্শ প্রতিমা (icon) হিসেবে, যে পথে তার ব্যক্তিত্ব জোড়া বাঁধে নারীত্ব অর্জনে সীমাহীন নিঃশেষণ এবং ঠিকঠাক লিঙ্গভিত্তিক শারীরিক আকার পেতে। বার্বি ক্রয়ের মাধ্যমে ভিন্ন নামের পণ্যচিহ্নের সাংস্কৃতিক পুঁজি সম্পর্কে, কিভাবে প্যাকেজিং পড়তে হয়, সার্বিকভাবে সামাজিক অবস্থানের জন্য ফ্যাশন এবং রুচির গুরুত্ব কি এইসব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হতে, মেয়েরা অনুশীলন করতে শুরু করে কিভাবে বৈষম্যমূলক সংস্কৃতির ভোক্তা হতে হয়। এই তর্কের মধ্যে আমরা জোর দিতে চাই যে, আমরা এখানে পুতুলের চেয়ে আরো বেশি কিছু চিত্রিত করছি। ‘বার্বি’ মোড়কে একইসঙ্গে যুক্ত থাকে স্পিন-অফ পণ্য (Spin-off: একটি বড় পণ্যের একটি উপজাত বা আনুষ্ঠানিক ফলাফল), ব্যঙ্গচিত্র, বাণিজ্যিক-ম্যাগাজিন এবং ফান ক্লাবের জিনিসপত্রও, যার সবকিছু তার ব্যক্তিত্ব তৈরিতে অবদান রাখে। পরিষ্কারভাবে বার্বির ‘অফিসিয়াল’ উপস্থাপনার নানাদিক দখলে নিয়ে বা উপেক্ষা করেই শিশুরা সম্ভবত এইসব পণ্যের সঙ্গে কম বেশি যুক্ত। যাহোক, আরেকটু এগোলে দেখবো এই ছোট্ট মেয়েরা অংশগ্রহণ করে বার্বির প্রিপ্যাকেজড বিশ্বে, যেখানে তারা ভোগ্য পুঁজিবাদের অধীনে নারীত্ব কেন্দ্রিক কতকগুলো বিশ্বাসের সংস্পর্শে আসে। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ছোট্ট মেয়েরা শিখে তাদের ব্যক্তিগত সুখ এবং তাদের বন্ধুদের আনুকূল্য লাভের ক্ষমতার মধ্যে তাদের চেহারার মূল গুরুত্ব নিহিত। বার্বির সামাজিক পঞ্জিকা সবসময়ই পূর্ণ থাকে এবং তার ফান ম্যাগাজিনের গল্পেরা সবসময় তাকে বিশেষ সজ্জায় প্রস্তুত থাকতে বলে হেটারোসেক্সুয়াল কিশোরী জীবনের আচার-অনুষ্ঠানের জন্য: যেমন ডেটস (dates), প্রমস্ (proms: এক ধরনের আনুষ্ঠানিক নাচ) এবং বিবাহ... বিংশ শতকের শেষভাগে লিঙ্গ নিজেই কীভাবে পণ্য হয়ে উঠে, বার্বি তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ‘কিন্তু আমরা কিনতে পারি...একইভাবে আমরা শৈলী কিনি।’ ভোক্তা পুঁজিবাদের যৌক্তিকতা নিয়ে তার অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ব্যাখ্যায়, সংস্কৃতি সমালোচক সুসান উইলিস (Susan Willis) বিশেষভাবে মনোযোগ দেন সেইদিকে যেখানে রয়েছে শিশুদের জন্য বার্বি’র মতো খেলনা এবং ছেলেদের জন্য লোকরঞ্জনপ্রিয় পেশীবহুল ‘He-Man’। যেসব খেলনায় দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে পণ্যব্যয়বাহী নারীত্ব এবং পুরুষের রক্ষণশীল ও সংর্কীণ প্রতিমালক্ষ্মণ। কিশোরী এবং বার্বি’র বিজ্ঞাপনের কল্পনার দুনিয়ায়, উইলিস এর পর্যবেক্ষণে, কিশোরীরা হতে থাকে বা হয়ে উঠতে থাকে সাবালিকার শরীর, নিরবচ্ছিন্নভাবে সুনির্দিষ্ট পণ্যসামগ্রী অর্জন করতে পারার সঙ্গে সঙ্গে, যা জানান দেয় তাদের পোশাক, গাড়ি, গান ইত্যাদির শৈলীর মাধ্যমে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..