গৃহকর্মী শিশুর রক্ষাকবচ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আতিকা রোম : জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককে শিশু বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে ১৪ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু সনদ একটি আন্তর্জাতিক আইন যেখানে একদম প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এতে প্রতিটি শিশুর জন্য কয়েকটি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হযেছে, যেমন: বেঁচে থাকার অধিকার, সুরক্ষার অধিকার, বিকাশের অধিকার এবং মত প্রকাশ ও অংশগ্রহণের অধিকার। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে বিশ্বের সব শিশুরই রয়েছে উল্লিখিত অধিকারগুলি সমানভাবে ভোগ করার অধিকার, কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। সব রাষ্ট্রের সব শিশু একইভাবে একই অধিকারগুলো ভোগ করে না। করতে পারে না। তবে উন্নত দেশগুলোর চিত্র অনেকটাই ভিন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায়। উন্নত দেশগুলোতে শিশুদের অধিকারগুলো গুরুত্বের সাথেই নিশ্চিত করা হয় এবং রাষ্ট্র তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পুরোপুরি নিশ্চিত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে বিপুল পরিমাণ শিশু নিজেই নিজের জীবিকা দিয়ে জীবন নির্বাহ করে। যে বয়সে একটি শিশুর স্কুলে যাবার কথা সেই বয়সে শিশুটি শ্রমের সাথে যুক্ত থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক দুই ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণে শিশুরা শ্রমের সাথে জড়িত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সব সেক্টর মিলিয়ে এই সংখ্যাটি আসলে কত তা নির্ধারণ করাও কঠিন এবং কোনও সরকারই এই সংখ্যাটি নির্ধারণে কখনও কোনও আন্তরিকতা দেখায়নি। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং ২০১৩ (সংশোধিত) অনুযায়ী ১৪ বছরের নীচে কোন শিশু শ্রমের সাথে যুক্ত হতে পারবে না। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে যদিও এই চিত্র অনেকটাই দেখা যায় বিদেশি ক্রেতাদের ভয়ে, অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে এর দেখা পাওয়া যায় না বললেই চলে। অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাজের দিকে দৃষ্টি দিলেই চিত্রটির সত্যতা পাওয়া যাবে। যেমন: ময়লা সংগ্রাহক শিশু যারা টোকাই নামে বেশি পরিচিত, লেগুনা গাড়ির হেলপার এবং গৃহকর্মী শিশু। খেয়াল করে দেখবেন এদের সবারই বয়স ৮-১২ বছরের মধ্যে। যে শিশুরা রাস্তায় আছে তাদের পরিস্থিতি খুব সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু যে শিশুরা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে থেকে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে তাদের পরিস্থিতি কি তা বাইরে থেকে কারো পক্ষে জানা সম্ভব না কখনও। তবে মাঝে মাঝে ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে এ সম্পর্কে আমরা কিছু ধারণা পেয়ে থাকি। ২১ ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে “গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫” নামের একটি নীতিমালা মন্ত্রিসভায় কেবিনেটে পাস হয় এবং পরবর্তীতে গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। উক্ত নীতিমালাটিতে গৃহকর্মীদের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা রয়েছে যা গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় সত্যি যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। নীতিমালাটিতে বলা আছে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং ২০১৩ (সংশোধিত) অনুযায়ী ১৪ বছরের নীচে কোন শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে বিশেষক্ষেত্রে ১২ বছরের বেশি বয়সী শিশুকে নিয়োগ দেয়া যাবে যে বাড়ির হালকা কাজগুলো করবে। কিন্তু জটিলতা হল হালকা কাজ কোনগুলোকে বোঝান হচ্ছে সে সম্পর্কে নীতিমালায় কিছু বলা হয়নি। এছাড়া ১৪-১৮ বছরের বয়সী শিশুদেরকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে মৌখিক বা লিখিত চুক্তি করতে হবে শিশুর আইনানুগ অভিভাবকের সাথে এবং সেই চুক্তিতে শিশুটি কত ঘণ্টা কাজ করবে, তার মজুরি কত হবে, বিশ্রামের সময় কতক্ষণ হবে, ছুটি, কাজের ধরণ, থাকা-খাওয়া, পোশাক পরিচ্ছেদ ইত্যাদি কি হবে তা উল্লেখ থাকবে। নীতিমালাতে আরও উল্লেখ আছে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে মজুরি পরিশোধ করতে হবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে বলা আছে গৃহকর্মী অসুস্থ হলে তাকে নিয়োগকর্তা নিজ ব্যয়ে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসককে দিয়ে চিকিৎসা করাবেন এবং কাজ করা অবস্থায় গৃহকর্মীরা দুর্ঘটনার শিকার হলে তার চিকিৎসার ব্যয়ভার গৃহকর্তাকে বহন করতে হবে। নীতিমালায় আরও বলা আছে ১৪-১৮ বছর বয়সী গৃহকর্মী শিশুদের জন্য বিভিন্ন কাজের দক্ষতা তৈরির লক্ষ্যে সরকারি বা বেসরকারিভাবে অথবা গৃহকর্তা নিজ দায়িত্বে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন। যাতে ঐ শিশুটি বড় হয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হতে পারে। এই নীতিমালাটি বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। এছাড়া, স্বরাষ্ট্র, মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নীতিমালাটি বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়েও নীতিমালাটি বাস্তবায়নের জন্য ডিসি অফিস, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন যুক্ত। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত যতগুলি শিশুবিষয়ক নীতিমালা বা আইন হয়েছে, সবগুলই ভীষণ যুগোপোযুগী। কিন্তু তারপরও কিন্তু থেকে যায় এই কারণেই যে নীতিমালাগুলি বা আইনগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখা যায় না। যদিও একথা ঠিক যে শুধু নীতিমালা বা আইন দিয়ে মানুষের মানসিকতাকে পরিবর্তন করা যায় না, তারপরও এগুলো রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। আমরা আশা করি অচিরেই সরকার নীতিমালাটিকে আইনে পরিণত করে এবং তা যথাযথ বাস্তবায়ন করে গৃহকর্মী শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সমর্থ হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে আরও অনেক বেশি দায়ত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে যেন ন্যূনতম প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করে এবং ১৪ বছর বয়সের আগে কোন শিশুই কোনও ধরনের শ্রমের সাথে যুক্ত হতে না পারে। পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে ছোট শিশুদের কোনও কাজে নিয়োগ না দেয়ার ক্ষেত্রে এবং তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..