ক্ষমতাই মানুষকে অযোগ্য করে তোলে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হিমাংশু দেব বর্মণ: কথা হচ্ছিল সাহিত্য আর জীবন নিয়ে। এসে গেল ‘মানুষ’ প্রসঙ্গ। এ প্রসঙ্গ এলে সমাজ তো দূরে থাকার কথা নয়। আর সমাজের শুরুটাই তো পুরুষ আধিপত্যে। বিশেষ করে যেখানে একটু স্বাধীনচেতা, মুক্তমনা মানুষের কথা হয়। কিন্তু তার মাঝে হঠাৎ কোন কথা থেকে যেন কথার প্যাঁচে এসে গেল ‘পুরুষতন্ত্র আর পুরুষ বিদ্বেষী এক কথা নয়’। প্রসঙ্গটা নিয়ে কপচাকপচির কিছু নেই। এটা কথার মাঝেই পরিষ্কার বোঝা যায়। পুরুষের স্বার্থ, আধিপত্য বজায় রাখার সুকৌশলটাই পুরুষতন্ত্র। এটা কখন কিভাবে কার হাত ধরে মানুষের সমাজে প্রবেশ করল, তা জানতে হলে চোখ ফেরাতে হবে প্রাচীন পুঁথি ও গ্রন্থের দিকে। প্রাচীন বৈদিক গ্রন্থে কথা ছিল- ‘সর্বকাজে নারীকে দাও অগ্রে’। কিন্তু পরবর্তীতে সুবিধাবাদের প্রশ্নে, ধর্মীয় বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে ব্রাহ্মণগণ যখন পুরোহিত দর্পনের মতো বিভিন্ন বাণিজ্যিক গ্রন্থ রচনা করলেন তখন সেখানে ‘অগ্রে’ শব্দটা বিকৃত করে লিখলেন ‘সর্বকাজে নারীকে দাও অগ্নে’। যার অর্থ আগুনে। আর বাক্যটার অর্থ সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়ে বোঝালো নারীদের দাও আগুনে। সনাতন সমাজে শুরু হয়ে গেল সতীদাহ, অনুমরণ, সহমরণের মতো অমানবিক ও অসামাজিক প্রথা। এখানে বোঝানো হলো পুরুষ ছাড়া নারী একা চলতে পারে না শুধু নয়, পুরুষবিহীন নারীর বেঁচে থাকার অধিকারই নেই পৃথিবীতে। কারণ স্বামী না থাকলে নারী ভ্রষ্টা হবে। এতে মহাপাপ। সে সমাজ নষ্ট করবে। কিন্তু পুরুষের বেলায় সেটা পাপ নয়। পুরুষ ভ্রষ্ট হলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। যত পাপ নারীর জন্য। কালেভদ্রে এ নীতিরও কিছু পরিবর্তন ঘটল বটে। কিন্তু বিধবা নারীদের দ্বিতীয় বিবাহ নিষিদ্ধ হলো। পর্যায়ক্রমে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মহান পণ্ডিতগণের দুঃসাহসিক ভূমিকায় সংস্কৃত হয়ে বিধবা বিবাহেরও প্রচলন ঘটল। তবে সেদিনের সেই পরিবর্তনের মাঝে নারীর কোনো ভূমিকাই ছিল না। নারীর কথা বলারই সুযোগ ছিল না। পুরুষের ভূমিকাতেই পরিবর্তন ঘটেছিল। কিন্তু সেই পৌরহিত্যসমাজের গণ্ডি থেকে আজও বেরিয়ে আসতে পারেনি মানুষের সমাজ। আজকের নষ্টের দিকে ধাবমান পুরুষ সমাজকে দেখলে সহজেই বোঝা যায় সেই ধারাবাহিকতা এখনো বিরল নয়। বরং প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তার মাত্রাটা। আলোচনার এ পর্যায়ে যদি আমরা একটু গভীরে প্রবেশ করি, তাহলে এর সপক্ষে যুক্তিগুলো অবশ্যই বেরিয়ে আসবে অনায়াসে। বর্তমানে প্রতিনিয়তই ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর যুবতী খুন-এর মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে অহরহ। এটা কী জানান দেয়? পুরুষ আজ ব্যর্থ হয়েছে নারীর কাছে। ব্যর্থ হয়েছে নারীর ভালোবাসা পেতে, নারীকে জয় করতে। তাই পুরুষ আজ তার আধিপত্যবলেই জোর করে ছিনিয়ে নিতে চায় নারীর সম্ভ্রম। চোখে লেগে গেলেই নানারকম প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঐ নারীদেরও তো চোখে, মনে লাগার ব্যাপার অবশ্যই আছে। এটা ভাবে না ঐ পাষ- পুরুষ। নারী তাকে অস্বীকার করলেই আর রক্ষা নেই। জোরপূর্বক বলাৎকার, তারপর খুন। বড় বীরত্বের পরিচয়! ক্ষমতাই যে মানুষকে অযোগ্য করে তোলে এটা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ক্ষমতার জোরে নারীকে ধর্ষণ করে খুন করতে পারে পুরুষ। কিন্তু মনে প্রেম ভালোবাসা না থাকায় নারীর মন জয় করে সঙ্গমসুখ লাভে ব্যর্থ হয় ঐ বিপথগামী পুরুষ। এই বিপথগামিতা রোধ করতে হলে অবশ্যই নারী-পুরুষের সমতা আনতে হবে সমাজে। এজন্য পুরুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। শুধু নারীদের পক্ষে কখনো সম্ভব হবে না সফলতা লাভ করা। কারণ, নারীরা পুরুষের চোখে আজও মূল্যহীন। তারা শুধু পুরুষের ভোগের বস্তু, সেবাদাসী। এখন নারী মুখ ফুটে কথা বলতে শিখেছে, বলছেও। কিন্তু পুরুষতন্ত্রের কাছে তাদের দুর্বলতাও প্রকাশ্য। এখানে পুরুষতন্ত্র বা পুরুষ আধিপত্যের বিপক্ষে কথা বলতে গেলেই আধিপত্যবাদী পুরুষের পক্ষ থেকেই বলা হয়- ওরা পুরুষ বিদ্বেষী। এটা সেই বৈদিক গ্রন্থের বিকৃত রূপের সামিল। আসলে পুরুষতন্ত্র আর পুরুষ বিদ্বেষী পরস্পর বিরোধী দুটি প্রসঙ্গ। প্রকৃতপক্ষে এই পুরুষ বিদে¦ষী প্রসঙ্গটা তথাকথিত। আর পুরুষতন্ত্র প্রচলিত। আসলে আমাদের চেতনাটাই এসে দাঁড়িয়েছে পক্ষতাতিত্বের এক চূড়ান্ত পর্যায়ে। এখন, এই মুহূর্তে যদি সমতার কথা বলা হয় তাহলে অবশ্যই নিরপেক্ষতার প্রশ্নে একবিন্দুতে মিলিত হতে হবে আমাদের সবাইকে। তখনই ছাড় দেয়ার প্রশ্নে বিদ্ধ হবে পুরুষতন্ত্র তথা সুবিধাভোগী পুরুষগণ। তখন সভামাঝেই জ¦লজ¦ল করে উঠবে এই পুরুষবিদ্বেষী প্রসঙ্গটা। ভাবতে গেলে হাসিও লাগে। এখানে একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ না টেনে পারলাম না। আমি দুই পুত্র সন্তানের বাবা। পরিচিতরা বলেন দুই সন্তান-মানে দুই লাঠি। এটা অবশ্য সব ‘বাবা’দের বেলায়ই ঘটে। দেখুন, শুধু পুরুষতান্ত্রিকতা নয়, রীতিমতো সাম্রাজ্যবাদী পায়তারাও আমাদের কতটা গ্রাস করে নিয়েছে। কেন আমরা পুত্র সন্তানদেরকে লাঠির সাথে তুলনা করব? আমরা তো তাদেরকে কলম ভাবতে পারি। তাহলে সে কলম হয়ে ওঠা একটা নারীর পক্ষেও সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তাতে সংঘাতের পথ পরিহার করে শান্তির পথে ধাবিত হতে পারে আমাদের সামগ্রিক চেতনা ও প্রচেষ্টা। কিন্তু আমাদের চেতনা যেখানে বাসা বেঁধে আছে, সেখানে শান্তির কোনো আশা নেই। বরং আগ্রাসনের মতো ভয়ঙ্কর মানসিকতায় আমরা আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎকে সাজানোর বাসনা লালন করি। পরিণতি যে কী হতে যাচ্ছে, হয়তো সেটা আমাদের বোধশক্তির বাইরেই থেকে যায়। আলোচনার শেষ পর্যায়ে এসে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। অবশ্য এটা পুনরাবৃত্তিও বটে। পূর্বে ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তার জের বাকি রয়ে গেছে। এখানে ধর্ষণকারীদের ধিক্কার দেয়ার পরিবর্তে, তাদের শাস্তির দাবি না করে আরো বলা হচ্ছে নারীদের পোশাকের দোষে নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছে। আমার মনে হয় পাশ্চাত্য দেশগুলার চেয়ে আমাদের দেশের পোশাকে যথেষ্ট শালীনতা রয়েছে। ধর্মবিশ^াসেরও কোনো ঘাটতি নেই। যা সেসব দেশে বিরল। তবুও সেসব দেশে কি এমন গণহারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে? বলতে বাধা নেই যে, এমন ঘটনা সেসব দেশের জন্য স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া যায়। কিন্তু আমরা তো যথেষ্ট মার্জিত। অথচ, আমরা নিজেদের (পুরুষের) নৈতিক চরিত্রের অবনতির কথা একবারও স্বীকার করব না। সংশোধিত হয়ে উন্নত চরিত্র গঠনের চেষ্টা করব না। শুধু আঙুল তুলে ধরব নারীর দিকে। এটাই যখন আমাদের চেতনার সারকথা তখন এসব হীন চেতনা থেকে বেরিয়ে আসার কথা বললেই সেটা পুরুষবিদ্বেষী দোষে দুষ্ট হবে, এটাই স্বাভাবিক।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..