বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীমুক্তি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তাহা ইয়াসিন: নারীর ক্ষমতায়ন যে নারীমুক্তি নয় এটা বাংলাদেশে প্রমাণিত সত্য। নারী ক্ষমতায়ন হলেই নারীমুক্তি হয় না। একটা ভূ-খণ্ডের সমগ্র মানুষের মুক্তির সাথে নারীমুক্তি জড়িত। বাংলাদেশে নানা জায়গায় যে নারীরা ক্ষমতাসীন তাদের অধিকাংশই সচেতন শৃঙ্খলিত নারী। যে নিয়মে সমাজ চলছে সেই নিয়মের পুরুষতান্ত্রিক ভোগবাদী সংস্কৃতির ধারক তারা। তাদের চেতনা নানাপ্রকার লোভ-লালসায় নিমজ্জিত। তাই প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধের বিকাশ তাদের হবার সুযোগ নেই। চেতনাগতভাবে সেই পুরনো দাসত্বেরই তারা ধারক। তাই চেতনার দাসত্ব দিয়ে নারীমুক্তি বা মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। শুনেছি বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার সকল পদস্থ কর্মকর্তা নারী। তাতে ওই জেলার নারীদের তেমন কোনও সুবিধা বেড়েছে বলে শুনিনি। আরো কোন কোন জেলা, বিভাগ এমনকি গোটা বাংলাদেশটা যদি নারী কর্মকর্তা দিয়ে ভরে যায় তাতেও নারীমুক্তি ঘটবে না। পণ্য বা ভোগ্য চিন্তায় বিকশিত নারী যেখানেই থাক তার স্থান পরিবর্তন হবে, কাজের আহামরি কোনও বদল ঘটবে না। পুরুষ কর্মকর্তা দিয়ে যেমন পুরুষের কোনও উন্নতি হয় না তেমনি নারী কর্মকর্তা দিয়ে নারীর উন্নতি কামনা করা অবাস্তব। বেগম রোকেয়া নারীমুক্তি বলতে যা বুঝিয়েছেন সেই চিন্তায় বিকশিত নারী হতে না পারলে শুধু পদ দখল করে কিছু পদস্থ নারীর সংখ্যাই বাড়বে, বাস্তবে নারীর জন্য কোনও কল্যাণকর কিছু আশা করা হবে মূল্যহীন। বেগম রোকেয়া চেয়েছিলেন দাসত্ব তথা নারীকে ভোগ্যপণ্য থেকে মুক্ত করতে। তাঁর সময় নারী যে অবস্থানে ছিল আজ সেটা থেকে নারীর তেমন কোনও মুক্তি ঘটেনি। পুরুষের ভোগ্যপণ্য হিসেবে আজো নারীরা মুক্ত নয়। সেদিন তারা ঘরে ছিল আর আজ বাইরে। সেদিন শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে ছিল, আজ এগিয়েছে। সেদিন উকিল ব্যারিস্টার হয় নি আজ হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানও হয়েছে, কিন্তু চেতনার কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। নারীরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাস করেও নিজেরা নিজেদের আরো ভোগ্য আরো দাস করে তুলেছে। তারা নিজেরাই এত রূপসচেতন যে পুরুষকে আকৃষ্ট করার বাইরে অন্য কোন চিন্তা মাথায় কাজ করে না। নানা প্রকার অলঙ্কারে সজ্জিত হওয়াটাকেও তারা সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ বলেও মনে করে। অনেকে আজকাল সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নিয়মিত পার্লারে যায়। এটাও শিক্ষিত মেয়েদের এখন নিয়মিত কাজে পরিণত হয়ে গেছে। এর চেয়ে শারীরিক পরিশ্রম করলেই যে শরীরটা মজবুত এবং মস্তিষ্ক দৃঢ় হয় সেটাতে তাদের বিশেষ আগ্রহ নেই। বেগম রোকেয়া এ সম্পর্কে বহু বছর আগে যে কথা বলে গেছেন তা এরকম- ‘আর এই যে অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলি- এগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ। এখন সৌন্দর্য বর্ধনের আশায় ব্যবহার করা বটে; কিন্তু অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তির মতে অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন (Originally badges of slavery) ছিল। তাই দেখা যায় কারাগারে বন্দিগণ পায়ে লৌহনির্মিত বেড়ি পরে, আমরা (আদরের জিনিস বলিয়া) স্বর্ণ বা রৌপ্যের বেড়ি অর্থাৎ মল পরি। উহাদের হাতকড়ি লৌহনির্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্মিত চূড়ি! বলাবাহুল্য, লোহার বালাও বাদ দেওয়া হয় না। কুকুরের গলে যে গলাবন্দ (dogcollar) দেখি, উহারই অনুকরণে বোধহয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্মিত হইয়াছে! অশ্ব হস্তি প্রভৃতি পশু লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, সেইরূপ আমরা স্বর্ণশৃঙ্খলে কণ্ঠ শোভিত করিয়া মনে করি- হার পরিয়াছি। গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া নাকাদড়ি পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের নাকে নোলক পরাইয়াছেন!! ঐ নোলক হইতেছে স্বামীর অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন! অতএব দেখিলেন ভগিনী! আপনাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন ব্যতীত আর কী হইতে পারে? আবার মজা দেখুন যাঁহার দাসত্বের নিদর্শন যত অধিক, তানি সমাজে ততোধিক মান্যগণ্য’। বেগম রোকেয়া চেয়েছিলেন নারীরা যেন এগুলো থেকে চেতনাগতভাবে মুক্ত হয়। আমাদের সমাজে এসব থেকে মেয়েদের মুক্ত হবার কোন প্রবণতা আমরা দেখিনা। বরং বিয়ের সময় পার্লারে গিয়ে আরো বেশি অলঙ্কারে সাজতে মেয়েরা পছন্দ করে। অলঙ্কারবিহীন মেয়ে দেখা যায় না বললেই চলে। এখন এটি আরো বেশি প্রিয় মেয়েদের। অফিসে কিংবা অন্য কোন কর্মস্থানে দুজন নারী এক জায়গায় হলে যেসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনায় মত্ত হয় তা নারীত্বের বাইরের কোনও বাক্যালাপ নয়। কার পোশাক, গহনা কাকে কেমন মানিয়েছে। কি রান্না করে কেমন লেগেছে এসব। এর মধ্যে কারো ব্যাগ থেকে হয়তো চাটনি আচার এসব বেরও হয়। দুজন পুরুষ কিন্তু এক জায়গায় হলে তা করে না। বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এই পাস দেয়া নারীরাই তো পণ্যবৃত্তীয় পুরুষতান্ত্রিক দেয়ালে কুঠারাঘাত করে বন্দিত্ব তথা জড়তা থেকে নারীদের মুক্ত করার কথা ছিল। যেটা উন্নত বিশ্বে হয়েছে। উন্নত বিশ্বে এই নারীরাই জন্মনিয়ন্ত্রণ যৌন স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছে। আর এজন্য তারা সংগ্রামও করেছে দীর্ঘকাল। নারীর মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের জন্য যে প্রগতিশীল আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ৯০ দশক পর্যন্ত বজায় ছিল সেটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনও যে একটা দীর্ঘদিনের বিকাশমান ধারা ছিল যেটা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনেরই চেতনাপুষ্ট সেটির ছেদ ঘটায় চেতনাগতভাবে আমাদের গতি পিছনের দিকেই প্রবাহিত হতে থাকে। ফলে ৭১-র আগের চেয়েও সাংস্কৃতিক মান নিন্মগামী হতে হতে আজ নানা অপসংস্কৃতির সংযোগে নারী স্বাধীনতা এখন দাঁড়িয়েছে বুলিসর্বস্বতায়। সমাজ অভ্যন্তরে আলোর চেয়ে অন্ধকারের দিকে গতিময়তা প্রবল। রাজনৈতিক ব্যর্থতাই এর জন্য প্রধানত দায়ী। বাংলাদেশে নারীরা শিক্ষা-দীক্ষায় যথেষ্ট এগিয়েছে এবং তাদের অধিকাংশই সামাজিক উৎপাদনের সাথে জড়িত। ঐতিহাসিক বিবর্তনের সূত্র অনুযায়ী উৎপাদনের সাথে ব্যাপকহারে যুক্ত হলেই নারীর মুক্তি সম্ভব। বাংলাদেশে নারীমুক্তির ক্ষেত্রে এই সূত্র আংশিক কাজ করছে আর বাকীটা নিপতিত হয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামির মাঝে। একদিকে প্রকৃত জ্ঞানের অভাব আর অন্যদিকে প্রবল ধর্মীয় অন্ধত্ব বিবর্তনের সব সূত্রকে হার মানিয়েছে। ৭০/৮০ দশকেও নারীদের বোরখা, হিজাব বা পর্দা পরার প্রবণতা যতটা ছিল না সেটা এখন বেড়েছে কয়েকগুণ। যতই পর্দার দিকে ঝোঁক বাড়ছে ততোই সামাজিক অপরাধ যেমন ধর্ষণ, নানারকম নারী নির্যাতনও বাড়ছে। অথচ সময়ের হিসেবে আমরা এগিয়েছি, মেয়েদের শিক্ষার হারও বেড়েছে। কিন্তু নারীরা অবরোধবাসিনী না হয়ে চিন্তা প্রতিবন্ধীমুক্ত দাসে পরিণত হয়েছে। বলা যায় ধর্মের নামে, কেয়ামতের ভয় দেখিয়ে নারীকে পুরুষ উপহার দিয়েছে এই নব্য দাসীবৃত্তি। আর সামাজিকভাবে উগ্রধর্মীয় নানা সংগঠন, প্রচারমাধ্যম তাদের পরিণত করেছে যৌনদাসীতে। মুক্ত নারী হলেই তাকে পড়তে হয় পারিবারিক ও সামাজিক কোপানলে। এই শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাংলাদেশের নারী। সাহসী ভূমিকা নিয়ে প্রগতিশীল হলেই সে হয়ে যায় বিচ্ছিন্ন। একটা জাতির বিকাশের ধারাবাহিকতা না থাকলে তার অভ্যন্তরে নানারকম অপসংস্কৃতি, পশ্চাৎপদ চিন্তা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে। রাজনীতি যদি মানবীয় মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত না হয়ে পেশীশক্তি, অর্থ এবং আরো নানাপ্রকার অপশক্তি দ্বারা পরিচালিত হয় তাহলে জাতীয় চেতনা অধঃপতিত হতে বাধ্য। এক্ষেত্রে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী এর বাইরে বিকাশমান হতে পারে না। তাই নারীদের আজকের এই পরিণতির জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণও দায়ী। পুঁজিবাদী সংস্কৃতিরও কিছু উন্নত দিক আছে যেগুলো পৃথিবীর অনেক দেশে ন্যায় বিচারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। নারী স্বাধীনতা তার মধ্যে অন্যতম। তার জন্য আগে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। মৌলিক অধিকারের একটি ভোট দেয়া। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে কোনমতে ভোট দেয়ার অধিকারটুকু মানুষ পেয়েছে। এখন আমরা এটাকেই গণতন্ত্র মনে করি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের যে অবৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধ্যারণা সেখানে নারীমুক্তি জিনিসটা কি এটা আমাদের সমাজ কিভাবে দেবে? এর মাঝে আমাদের চিন্তার জগত জবড়দখল করে আছে ধর্মীয় অপসংস্কৃতি। বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ভেজাল মিশে গিয়ে যে অপ-বাঙালিত্ব তৈরি করা হয়েছে সেটার মূলোৎপাটনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিকল্প নেই। বাঙালির নৃ-তাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাসে নারীদের কৃষিসহ অনেক উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে অংশগ্রহণ দেখা যায়। সেটা এখন বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের নারীদের মাঝে আমরা লক্ষ্য করি। কিন্তু আমদানিকৃত আরোপিত সংস্কৃতি বাঙালি নারীকে অগ্রসর ও দৃঢ় করে নাই। তাদেরকে ঠিকানাহীন যাযাবর ভোগ্য এবং অজ্ঞ করে তুলেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের এটিও একটি বড় আকাক্সক্ষা ছিল আবর্জনা তথা পশ্চাৎপদ সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসা। আমরা নানা বিষয়ে অসফল হয়েছি এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। আমাদের সামাজিক উন্নতি যেমন ব্যাহত তেমনি নারীদের শিক্ষা-দীক্ষায় এবং কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে এনেও তাদের কোনও মুক্তি দিতে পারিনি। এই অযোগ্যতা, এই ব্যর্থতা থেকে ইতিহাস আমাদের মুক্তি দেবে না। বাংলাদেশে আজ নারী সাহিত্যিক, নারীনেত্রী আরো অনেক বিশেষায়িত নারী আছেন যারা গৃহবধূর সাজে নারীমুক্তির অগ্রদূতের ভান করে ফুলের তোড়া নিয়ে মরে যাচ্ছেন–তাদেরও এই অস্পষ্টতা থেকে মুক্তি মিলবে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..