মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বিপ্লবী বাদশা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আবদুল জব্বার : ৪ আগস্ট পাবনার কৃতিসন্তান এ দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রনায়ক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জননেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাইয়ের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৮ সালের ৪ আগস্ট সকাল পৌনে ১০ টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৯২৯ সালের ১৪ এপ্রিল পাবনা শহরের কৃষ্ণপুর মহলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আলহাজ্ব নুরজ্জামান কেষ, মাতার নাম খবিরন নেছা। ৫ ভাই ১ বোনের মধ্যে ছোট দুই ভাই বর্তমানে বেঁচে আছেন। তাদের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম রবি, অপরজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম মুকুল। আমি ১৯৯৭ সালে পাবনা শহরের রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে ৭ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত অবস্থায় প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার মধ্যে দিয়ে পাবনার এই কৃতি সন্তান আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাই এবং তার ছোট ভাই রবি ভাইয়ের সাথে আমরা পরিচয়। বাদশা ভাই ছিলেন রাজনীতিবিদ এবং রবি ভাই ছিলেন পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের নেতা এবং দৈনিক সংবাদের পাবনা জেলা প্রতিনিধি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল কাদের খানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাবনা শহরের পুরাতন পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউশনে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে বাদশা ভাই ছিলেন ওই সমন্বয় কমিটির অন্যতম সদস্য। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের পর দেশের প্রথম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বাদশা ভাই ন্যাপ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে কুঁড়েঘর মার্কা প্রতীকে পাবনা-৫ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দু’টি নির্বাচনেই আমি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের স্থানীয় নেতা হিসেবে প্রচারকাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তবে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশে প্রথম ভোটার হয়ে ভোট প্রদান করতে পেরেছিলাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাদশা ভাই প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন করার সময় পাবনা থেকে জাতীয় পরিষদে নির্বাচনের প্রার্থী ছিলেন বেগম সেলিনা বানু। বেগম সেলিনা বানুকে আমি এবং আমার ছাত্র সংগঠনের বন্ধুরা ফুফু আম্মা বলে ডাকতাম। পাবনার নারী মুক্তিযোদ্ধা শিরীন বানু ছিলেন বেগম সেলিনা বানুর বড় মেয়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মিতিল আপাও পুরুষের পোশাক পরে বাদশা ভাইয়ে সঙ্গে থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। বাদশা ভাইয়ের বর্ণাঢ্য জীবনী নিয়ে লিখতে হলে স্বল্প পরিসরে তা লিখে শেষ করা যাবে না। তৎকালীন ন্যাপ নেতা বাদশা ভাই এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি কমরেড প্রসাদ রায় উভয়ই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং আমার প্রিয় নেতা ও অভিভাবক। আমি বাদশা ভাই সম্পর্কে ইতোপূর্বে সংক্ষিপ্ত একটি নিবন্ধন লিখেছিলাম। লেখাটির শিরোনাম ছিল, “আমার প্রিয় নেতা ও অভিভাবক আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাই”। লেখাটি পাবনার স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে লেখাটি আমার নিজের সম্পাদনায় ২০১৬ সালের বাংলা একাডেমির বই মেলায় প্রকাশিত “ইতিহাসের পাতা থেকে” বইতে এবং আমিনুল ইসলাম বাদশা স্মারক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। আজীবন বিপ্লবী আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাই পাবনা গোপালচন্দ্র ইনিস্টিউশনের ছাত্র হিসেবে অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৪৩ সালে ন্যাপ নেত্রী প্রয়াত জননেত্রী বেগম সেলিনা বানু এবং কমরেড প্রণতিকুমার রায়ের সাথে একই সঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ওই সময়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন তুঁেঙ্গ আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাই সে সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ উৎখাতের জন্য, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ও সে সময়ের দূর্ভিক্ষ প্রতিরোধ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে পাবনার ঈশ্বরদীতে রাজশাহীর প্রখ্যাত নেতা আতাউর রহমানের নেতৃত্বে যুব সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। বাদশা ভাই যুব সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। এর পর ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেরুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাবনা মুসলীম লীগ সরকারের বিরোধিতায় নাকচ হয়ে গেলে পাবনার সচেতন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেরুয়ারি পাবনায় সর্বদলীয় রাজনৈতিক দলের সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। বাদশা ভাই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। এর পর ২৭ ফেরুয়ারি সর্বদলীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৯ ফেরুয়ারি পাবনা শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ওই সময়ে প্রশাসনের জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পাবনা শহরে ছাত্র-জনতার মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলের নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন বাদশা ভাই। ওই সময় বাদশা ভাইসহ ৬৪ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তবে আন্দোলনের মুখে একই দিনে আদালত সকল গ্রেপ্তারকৃত নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দেন। ১৯৪৮ সালে ১১ মার্চ সারা পাকিস্তানে ডাকা সাধারণ ধর্মঘট হরতাল পাবনায় সর্বাত্মকভাবে পালিত হয়। এসময় বাদশা ভাই পুনরায় গ্রেফতার হন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবিতে ১৯৪৮ সালে ২৯ ফেরুয়ারি স্বাধীন পাকিস্তানে প্রথম হরতালের সময় ৪ বছর একটানা বিনা বিচারে আটক থাকার পর ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন বাদশা ভাই। ১৯৫০ সনের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে কারা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালীন সময় আটক রাজবন্দিদের ওপর জেল পুলিশের গুলিবর্ষণে ৭ জন রাজবন্দি শহীদ হন। অবশিষ্ট বন্দিদের মধ্যে ৩০ জনেরও অধিক গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। গুরুতর আহত রাজবন্দিদের মধ্যে পাবনার ন্যাপ নেতা বাদশা ভাই এবং কমরেড প্রসাদ রায়ও ছিলেন। এই দুই বিপ্লবী মৃত্যুর দিন পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ বুলেট তাঁদের শরীরে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। উল্লেখ্য, প্রয়াত দুই নেতা তাঁদের চিকিৎসার জন্য কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় বা পার্টিগত সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেননি। এরপর ১৯৫৭ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে বাদশা ভাই ন্যাপে যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনি পাবনা জেলা গণতান্ত্রিক কর্মী শিবিরের যুগ্ম আহবায়ক পদে নির্বাচিত হন। নির্বাচনী অভিযান পরিচালনাকালে ২২ ফেরুয়ারি পুনরায় গ্রেফতার হন বাদশা ভাই। নির্বাচনে মুসলীম লীগ সরকারের ভরাডুবি হলে এক মাস পর বাদশা ভাই মুক্তি লাভ করেন। এর দুই মাস পর ৯২ (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট নেতা শেরে বাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত পূর্ববাংলার প্রাদেশিক সরকার বাতিল করার পর পুনরায় গ্রেফতার হন বাদশা ভাই। দেড় বছরেরও অধিককাল পর ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে বাদশা ভাই কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাবনা শহর এবং ২৯ মার্চ পাবনা জেলা প্রথম পাকিস্তানি শক্রসেনা মুক্ত হয়। এরপর ১০ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাবনা পুন:দখল করে। এরপর বাদশা ভাই রাজনৈতিক দলের এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীদের নিয়ে ভারতে চলে যান। বাদশা ভাই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে প্রবাসী সরকারের সাথে রাজনৈতিক সংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চ মহলে এবং তাঁর প্রাক্তন রাজনৈতিক সহকর্মীদেরকে সাথে নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্প এবং শরণার্থী শিবিরের সাথে সমন্বয় সাধনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে খাদ্য ওষুধ ও রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন। ভারত সরকারের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পাবনা-৫ আসন থেকে ন্যাপের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাকশাল গঠিত হলে বাদশা ভাই বাকশালের পাবনা জেলা কমিটির অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহতের ঘটনায় তিনি সাংঘাতিকভাবে মর্মাহত হন এবং সে সময়গুলোতেই ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন। এসময় তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে বিশেষ ক্ষমতা আইনে বাদশা ভাই পুনরায় গ্রেফতার হন এবং দেড় বছর পর মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে মুক্তিলাভ করেন। মনে প্রাণে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতিবিদ আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাই আজীবন সমাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল মার্কসবাদ লেলিনবাদের প্রতি ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এই তিন পর্বেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে কাজ করে গেছেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি গণফোরাম, গণতন্ত্রী পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, কমিউনিস্ট কেন্দ্র ও বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের শরিক দলগুলিসহ ১১ দলীয় ঐক্য গঠনের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে একটি প্রগতিশীল বিকল্পধারা সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। আমিনুল ইসলাম বাদশা ভাইয়ের সহধর্মিনী নিলুফা ইসলাম জীবিত আছেন। তাঁর বড় মেয়ে নাজমা ইসলাম স্বপ্না, স্বামী অ্যাড.ইয়ার খান তপন। তাঁর ছোটে মেয়ে ইসমত আরা কনার স্বামী মাহমুদুল হাসান টুটুল এক কন্যা অনন্যা ও পুত্র তামিম সহ বর্তমানে কানাডার টরেন্টোতে বসবাস করছেন। বাদশা ভাইয়ের একমাত্র পুত্র সাবিরুল ইসলাম বিপ্লব বর্তমানে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক। লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..