সংবাদপত্রের ধারায় মধ্যবিত্ত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ১৯৫১তে ‘সংবাদ’ যখন আত্মপ্রকাশ করে তখন চিনতে কোন ভুল হবার কথা ছিল না যে, এ কার কণ্ঠস্বর। পত্রিকাটির মালিকানা ছিল মুসলিম লীগ পন্থিদের হাতে। এর প্রকাশনার পেছনে উদ্দেশ্যটাও ছিল মুসলিম লীগের পক্ষের জনমত সৃষ্টি, কিন্তু ‘সংবাদ’-এর নাম তার ভাষা, তার সাহিত্য, সংস্কৃতি, ছোটদের ও মেয়েদের পাতা-সর্বত্রই স্বরটা ছিল ভিন্ন। সেটি মুসলিম লীগের নয়, উঠতি মধ্যবিত্তের। তখন অন্য পত্রিকাও ছিল, নামও রাখা হতো ‘আজাদ’, ‘ইনসাফ’, ‘জিন্দেগী’, ‘মিলাত’ কলকাতায় ছিল ‘ইত্তেহাদ’। সরকার-বিরোধিতার জন্য আকর্ষণীয় ছিল যে অবজারভার তার নামের সঙ্গেও যুক্ত ছিল ‘পাকিস্তান’। সেই সময়ে ‘সংবাদ’ এলো সম্পূর্ণ বাংলা নাম নিয়ে এবং বুঝতে কারও ভুল হলো না যে, এর রাজনীতি যাই হোক না কেন সংস্কৃতি হবে ভিন্ন। ঢাকায় মধ্যবিত্ত তখন গড়ে ওঠেছে, পাকিস্তান সৃষ্টি সেই সুযোগটা করে দিয়েছে তাদেরকে; সেই মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিতে বাঙালিয়ানা শক্তিশালী হয়ে ওঠেছে ক্রমশ, পাকিস্তনিপনা কমবে যে এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। নানাদিকে এই ঘটনার প্রকাশ দেখা যাচ্ছিল, দেখা গেল ‘সংবাদ’ এর আত্মপ্রকাশেও। রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির বিরোধটা যে আরও তীব্র হবে সেটা টের পাওয়া গেল, একইভাবে। মধ্যবিত্তের তখন ছিল মস্ত এক অসুবিধা। তার রুচি আকাক্সক্ষা পক্ষপাত একদিকে; কিন্তু যে রাষ্ট্র তাকে শাসন করে সেটি আরেকদিকে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তখনও অতটা প্রবল হয়নি, কিন্তু হবে যে, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে; ১৯৫১-এর মে মাস থেকে ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি আর কত দূর। কয়েক মাসের মধ্যেই তো শুরু হয়ে যাবে সেই পাবন; তার প্রস্তুতি চলছে, যতটা না সাংগঠনিকভাবে তারো বেশি মানুষের মনে মনে, ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে শিক্ষিত মানুষ, বিপন্ন বোধ করেছে, মনে করছে তার ভাষা থাকবে না, ভাষা কেড়ে নেওয়া হবে, আরবি হরফে বাংলা লেখা, তথাকথিত হিন্দুয়ানী শব্দ ‘উচ্ছেদ’ করা, এসব তৎপরতা তো লেগে ছিলই, প্রকাণ্ডভাবে এলো রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দিয়ে বাংলাকে তার অধীন করে ফেলবার চেষ্টা। ‘সংবাদ’-এর বাংলা নামকরণ এবং ভেতরে দৈনিক ‘আজাদ’-এর পাকিস্তানি ধাঁচের বাংলাকে প্রত্যাখ্যান–এ যেন ওই ক্ষোভেরই প্রকাশ। রাষ্ট্র তখন মুসলিম লীগের হাতে, ‘সংবাদ’ পত্রিকাও তেমনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের বিরোধ বেঁধেছে, ‘সংবাদ’-এর অন্তর্গত বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গেও তেমনি শান্ত একটা বিরোধ ছিল পত্রিকাটির মালিকানার। একই দ্বন্দ্বের প্রকাশ যেন, ধরনটাই শুধু যা আলাদা। তখন রাষ্ট্রের অধীনে মধ্যবিত্ত গড়ে ওঠেছে, কিন্তু সে শাসনে রাষ্ট্র পীড়িত বোধ করছে। বায়ান্নতে ভাষা আন্দোলন যখন পাবন তৈরি করলো তখন আমাদের বাবা কাকা মামাদের টানাপোড়েনটা দেখেছি। আমরা তরুণরা সবাই একদিকে, সকলেই বাংলার পক্ষে; অভিভাবকরা যে বিপক্ষে তা মোটেই নয়। তাঁরাও পক্ষেই, কিন্তু তারা সরকারি কর্মচারী, চাকরিটাকে বড়ই মূল্যবান মনে করেন, করতে হয়, এটি চলে গেলে দাঁড়াবেন কোথায়, ঢাকা শহরে কোথায় আশ্রয় তাদের, কোথায় অবলম্বন? ছেলেরা পিকেটিং করছে; অভিভাবকরা অনেকটা লুকোচুরি করে অফিসে যাচ্ছেন-এদৃশ্য দেখা যেত তখন, পাড়ায় পাড়ায় এবং রমনাতে, সেক্রেটারিয়েটের কাছে। অভিভাবকরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতেন ছেলেটাকে পুলিশে ধরে কিনা ভেবে, ওদিকে আবার তার ছেলেটার কিছু ক্ষতি না হয়ে আন্দোলনটা যাতে সফল হয় সেটাও চাইতেন এবং সাধারণভাবে খুশি হতেন আন্দোলন চলছে দেখে। সরকারের অধীনে অথচ সরকারবিরোধী এই বোধটা পাকিস্তান আমলে বাঙালি মধ্যবিত্তের বিধিলিপি ছিল, এই বোধ ‘সংবাদ’-এর ভেতরেও ছিল। ‘সংবাদ’-এ যারা কাজ করতেন এবং তাদের ভেতরে পত্রিকা যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে চাইতো তার প্রতি সমর্থন ছিল খুব কম, অনেকের মনেই বিরোধিতা ছিল তীব্র, কিন্তু ওই যে কর্তৃপক্ষ একদিকে, মানুষ অন্যদিকে এই দ্বন্দ্বটা শুরু থেকেই রয়ে গেল। আসলে মুসলিম লীগ পন্থিদের মালিকানায় নতুন পত্রিকা প্রকাশের যে উদ্যোগ সেটা তো বাণিজ্যিক ছিল না, ছিল রাজনৈতিক। লীগবিরোধী মনোভাব তীব্র হচ্ছে তাই আরো একটি নির্ভরযোগ্য মুখপত্র দরকার-এই প্রয়োজনবোধ থেকেই পত্রিকার প্রকাশ। কিন্তু লীগবিরোধী মনোভাব এতোই তীব্র ছিল যে, পত্রিকার অভ্যন্তরেও অনুপ্রবেশ করেছিল বেশ ভালো ও খুব স্বাভাবিকভাবে। তারপরে বায়ান্নর আন্দোলন এলো, এলো চুয়ান্নর নির্বাচন এবং তাতে মুসলিম লীগ এমন অবিশ্বাস্যরকম পরাজয় বরণ করল যে লীগবিরোধীরাও বিস্ময় মানলেন। বুঝতে বাকি রইলো না যে, মধ্যবিত্তের মন থেকে পাকিস্তানপন্থি কতটা নির্বাসিত হয়েছে। ওই নির্বাসন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে মুক্তিযুদ্ধে। যখন তার সূত্রপাত তখন সেই একান্নতে, বায়ান্নর পূর্বাহ্নে ‘সংবাদ’-এর আত্মপ্রকাশ, বাঙালির নবোদ্ভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনার পরিচয় বহন করে। প্রেস ট্রাস্টের মালিকানায় পরে যখন ‘দৈনিক পাকিস্তান’ বের হয় তখন মনে করা হয়েছিল, এটি হবে বাঙালি মধ্যবিত্তের পত্রিকা। কিন্তু পত্রিকাটি সে-অর্থে বাঙালির হলো না, যে-অর্থে ‘সংবাদ’ ছিল বাঙালি। তার নামে রইলো ‘পাকিস্তান’ এবং তার কর্তৃত্ব রইলো পাকিস্তানি মালিকদের হাতে; সে-মালিকানায় কোনো পরিবর্তন ঘটে নি, যতদিন পাকিস্তান টিকে ছিল, কিন্তু ‘সংবাদ’-এর মালিকানায় ঘটেছে, মুসলিম লীগের পতনের পর থেকেই ‘সংবাদ’ রাজনৈতিকভাবেও বদলে গেছে, ক্রমাগত। বামের দিকে ঝুঁকেছে সে, বাঙালি মধ্যবিত্তের একাংশের মতো। একটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে, সাংবাদিকরা নিয়েছিলেন, সেটি ছিল ঢাকায় প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠা। এখন বিশ্বাস করা কঠিন যে, একদিন ওই প্রতিষ্ঠানটি ছিল না। ‘সংবাদ’-এ যাঁরা ছিলেন উদ্যোগের পুরোভাগে সেদিন তাঁদেরকেই দেখা গেছে। প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রধান তাৎপর্য অবশ্য এখানে যে, এর আবাসে এসে সাংবাদিকরা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হবেন, তাঁরা যে আলাদা আলাদা পত্রিকায় কাজ করেন সেটা নয়, প্রধান পরিচয় হবে যে তাঁরা সাংবাদিক অফিসে যেমন কেউ সম্পাদক, কেউ রির্পোটার, কেউবা সহ-সম্পাদক, সেই বিভাজনটা থাকবে না, এখানে সবাই হবে সমান। ‘সংবাদ’-এর সঙ্গে যেহেতু সরকারের যোগাযোগ ছিল তাই প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় তার সাংবাদিকদের ভূমিকাটা বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল। সরকারের কাছ থেকে বাড়ি বরাদ্দ করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে যা ঘটবার তাই ঘটলো। মালিকরা যেদিকেই থাকুন অধিকাংশ সাংবাদিকই ছিলেন তখন সরকারবিরোধী, তাই প্রেসক্লাব পরিণত হলো সরকারের বিরুদ্ধপক্ষের অপর একটি ঘাঁটি। মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছে, তার কণ্ঠ নানা ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে। যেমন শোনা গেল লীগবিরোধী আন্দোলনে, তেমনি শোনা যাচ্ছিল সাংবাদিকতায়। কিন্তু সে সময়ে ‘সংবাদ’ আমরা বাসায় রাখতাম না। সেটাও ওই রাজনৈতিক কারণে বাসায় রাখা হতো ‘পাকিস্তান অবজারভার’। এমনিতেই ইংরেজি কাগজপড়া যে আত্মপ্রসাদের বিষয় ছিল না তা নয়, তদুপরি অবজারভারই সে সময়ে একমাত্র পত্রিকা, যেটি ছিল সরকারবিরোধী। ‘সংবাদ’ আমাদের কাছাকাছি এলো পরে, যখন সে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকটাকে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারলো। ঝেড়ে ফেলে দেয়ার ওই কাজটা সমগ্র জনগণ করছিল, জনগণের সাফল্য সমান তালে না হলেও একই সঙ্গে এগোচ্ছিল এবং জনতার অগ্রগতিতে ‘সংবাদ’ সাহায্য করছিল, প্রত্যক্ষভাবে যতটা নয়, অপ্রত্যক্ষভাবে তার চেয়ে বেশি। ‘সংবাদ’-এর সঙ্গে আমার নিজের যোগের প্রাথমিক স্তরটি খুব উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার স্মৃতিতে। ১৯৫১তে আমি স্কুলে পড়া শেষ করে সদ্য ঢুকেছি কলেজে। আমার লেখালেখির যে অভ্যাসটা ছিল এতোদিন সেটা পুষ্ট হচ্ছিল ‘আজাদে’র মুকুলের মাহফিলের আনুকূল্যে। কলেজে ঢুকে নিজেকে আর ‘মুকুল’ মনে করা যাচ্ছিল না। সেই সময়ে দু’টি লেখা পাঠিয়েছিলাম আমি ডাকে, দুই পত্রিকায়। একটি ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে যার দেখাশোনা করতেন তখন কবি আহসান হাবীব, আরেকটি ‘সংবাদ’-এর ‘খেলাঘরে’, যার দায়িত্বে ছিলেন কবি হাবীবুর রহমান। প্রথমটি একটি অনুবাদ, মোপাসাঁর ছোটগল্পের বইতে তখন আমি সদ্য পড়েছি ‘হীরার নেকলেস’ গল্পটি, পড়ে এমন চঞ্চল হয়েছি যে, ইংরেজি থেকে সেটা অনুবাদ করে পাঠিয়েছিলাম ‘মোহাম্মদীতে’। দ্বিতীয়টি একটি গল্প, নিজের লেখা ছোটদের উপযোগী। সেটা পাঠালাম ‘সংবাদ’-এর ‘খেলাঘরে’। দু’টোই ছাপা হয়েছিল পাঠানোর অল্প পরেই। এখন তাকিয়ে দেখি পিছনের দিকে, দু’টো গল্পেই মধ্যবিত্তের স্ব-বিরোধিতার কাহিনী ছিল। মোপাসাঁর গল্পে কেরানীর মেয়েটি চেয়েছিল নিজেকে দামি করতে, করতে গিয়ে সে তার যৌবন ও সঞ্চয়ের সবটাই খোয়ালো। আমার নিজের লেখা গল্পটির নাম ‘রচনাতেও বিপদ আছে’; আমি তখন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও শিবরাম চক্রবর্তীর মাত্রাতিরিক্ত ভক্ত, তাঁদের আদলে লেখা গল্প ওটি, মামাকে নিয়ে, দাদা পাব কোথায়, তাই মামাকে নিয়েই টানাটানি। ওই মামাটির বেশ টাকা পয়সা হয়েছে এখন তার শখ লেখক হবেন, অসহায় ভাগনেকে তিনি প্রায়ই নিজের লেখা পড়ে শোনান। একদিনে শুনিয়েছিলেন উপদেশাত্মক একটি রচনা, ভাগনেটি ত্যক্তবিরক্ত হয়েই ছিল, এবার সুযোগ পেয়ে মামার ‘উপদেশ’ পালন করে তাকে জব্দ করলো। গল্প এই নিয়ে। গল্পটি ছাপা হলো খেলাঘরের পাতায় এবং সেকালের জন্য বেশ উল্লেখ করবার ব্যাপার, গল্পের সঙ্গে ছবিও ছিল একটা। আসল ঘটনা কিন্তু সেটা নয়। সেটি ঘটল কয়েক সপ্তাহ পরে। পাড়ায় আমাদের ছাত্র সংঘ ছিল একটি, তার উদ্যোগে নানান অনুষ্ঠান করতাম আমরা, ‘সংবাদ’-এ সেসব ঘটনার রির্পোট ছাপা হতো, সেখানেই ছাপা হতো সবচেয়ে ভালভাবে; মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক উদ্যম বিস্তর উৎসাহ পেতো ওখানে। ওই রকমের একটি রির্পোট নিয়ে এক বিকেলে গেছি ‘সংবাদ’ অফিসে। খেলাঘরের হাবীবুর রহমান। রির্পোট-লেখা কাগজটা চেয়ে নিলেন। নিউজ টেবিলে তিনি ছিলেন প্রধান। পড়ে হেসে বললেন, ভালো কথা, কিন্তু কে রির্পোট দিচ্ছে তার নাম তো লাগবে, ঠিকানা লাগবে, সেসব লিখে দাও, নইলে এই কাগজ তো ওড়ো খবর। সে-ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না, পত্রিকা অফিসে খবর নিয়ে ওই আমার প্রথম যাওয়া। নামধাম লেখা হলো, সেটা তিনি পড়লেন, পড়ে অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন করলেন, তুমি লেখো? হ্যাঁ বলায় বললেন, তোমার নামে বিল করা আছে, দিনের বেলায় এসে নিয়ে যেয়ো, ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে। গিয়েছিলাম পরের দিনেই। বেশ উত্তেজিতভাবে। লিখে সেই আমার প্রথম অর্থোপার্জন। স্মরণীয় ঘটনা বৈকি। ক্যাশিয়ার ভদ্রলোককে পাওয়া গেল। বেশ প্রতিনিধিত্বমূলক চেহারা, অবিশ্বাসের ভঙ্গি একটা সব কিছুতে, তিনি কাগজ পত্র ঘেঁটে ভাউচার বের করলেন, হ্যাঁ, পাঁচ টাকা পাবো আমি। কিন্তু আমি যে সেই ব্যক্তি, যার নামে বিল হয়েছে সেটার প্রমাণ কি? বেশ হকচকিয়ে গেছি আমি। তাইতো প্রমাণ কি? হাবীব ভাই তো আসবেন সেই বিকালে তখন ইনি থাকবেন না। আমার রাগ হচ্ছিল। খেয়াল হলো হাতে কলেজের বই আছে। এটি খুলে মালিকের নাম দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করলাম যে আমিই সেই। তারপরে দাপ্তরিক কাজ, এখানে সেখানে সই, ওঁর ওপর তলার অনুমতি, সবশেষ করে নগদ পাঁচ টাকা নিয়ে বের হয়ে এলাম আমি ‘সংবাদ’ অফিস থেকে। বেশ একটা দর্পিত ভঙ্গিতে। এ ঘটনারও তাৎপর্য আছে। মধ্যবিত্ত উঠেছে, তার সামনে সুযোগ আসছে। দ্বার খুলে যাচ্ছে সম্ভাবনার। এমনকি যে লেখালেখিকে আমার পিতা মনে করতেন সময় নষ্ট করা তারও যে একটি আর্থ-সামাজিক মূল্য আছে সেটি প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। ‘সংবাদ’ সেই বিকাশের সঙ্গে ছিল এবং তাকে উৎসাহিত করছিল। তারপর অনেক সময় গেছে চলে। গত ষাট দশক উত্থান-পতনের ধ্বনিতে মুখরিত। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের পাকিস্তানকালীন দ্বন্দ্ব আরো বিকশিত হয়েছে এবং সেই রাষ্ট্র ভেঙে গেছে। মধ্যবিত্তরই কাজ সেটি। জনগণ ছিল। কিন্তু সামনে ছিল মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব। মধ্যবিত্ত বেশ বড় একটা শ্রেণি। তার ভেতর অনেক স্রোত আছে, প্রবণতা রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের, উঁচু-নিচু স্তরও তো সত্য। কিন্তু একটা মূলধারা আছে, যেটি রুচি ও আকাক্সক্ষায় গণতান্ত্রিক ‘সংবাদ’ এখনো সেই ধারারই মুখপত্র, যেমনটি শুরুতেই হতে চেয়েছিল, কিন্তু হতে পারে নি মালিকানার কারণে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আজাদী’ও সেই মধ্যবিত্তের ধারায় বিকশিত। ইতোমধ্যে পেরিয়ে এসেছে অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল। আজাদী সেই ধারায় ছিল এবং থাকবে বলেই ভরসা করছি। এছাড়া ধারা আরো আছে, থাকবে, বাড়বে তবু মূলধারাটা অক্ষুণ্ন থাকুক, এ আমরা সবাই চাইবো। লেখক : ইমেরিটার্স অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..