লাল সালাম কমরেড

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মোর্শেদ আলী : কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল গত ২ অক্টোবর ভোর ৬টায় ৯৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আমাদের পরিবার বিশেষ করে আমার পিতার সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। দু’জনের সুসম্পর্ক গড়ে উঠার কারণ হল আমরা এক সময় পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম এবং সকালে আব্বা এবং মণ্ডল হাঁটতে বের হতেন। দু’জনেরই গাছ লাগানোর শখ ছিল এবং উভয়ের বাগানে কোন গাছ কেমন আছে তার খবর আদান প্রদান হত। আমার আব্বাকে তিনি ‘মাস্টার সাহেব’ বলেই ডাকতেন। কারণ আমার পিতা ঈশ্বরদীতে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করতেন, পরে ১৯৪৮ সালে নানা কারণে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঈশ্বর এস.এম হাইস্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। আমার পিতা ১৯৮৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মণ্ডলের স্ত্রী, আমরা তাঁকে খালাম্মা বলে জানতাম। প্রায় প্রতিদিনই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন এবং আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করতেন। খালাম্মা দীর্ঘ সময় অস্বচ্ছলতায় কষ্টের জীবন কাটিয়েছেন এবং এক বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের ৫ কন্যা ও এক ছেলে। ছেলেটি ক’বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বড় জামাতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে আমৃত্যু অধ্যাপনা করেছেন। ইদ্রিস ভাইয়ের দুই সন্তান উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হন। অবশ্য বড় ছেলেটি লেখাপড়ায় খুব এগোতে পারে নাই। দীর্ঘদিন সাভারে বসবাস করার সুবাদে ইদ্রিস সাহেব সেখানে একটি বাড়ি করে বসবাস করেন। ইদ্রিস সাহেব অধ্যাপনা করার সাথে সাথে ন্যাপের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নতুন বাংলার’ সম্পাদনা করতেন। তার মেঝ ছেলে মিটু সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেন থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করে আসেন। বর্তমানে বিআইডিএসএ কর্মরত আছে বলেই জানি। মিটুর সাথে উদীচীর সাবেক সভাপতি কামাল লোহানীর কন্যার সাথে বিয়ে হয়। ছোট ছেলেটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ওসানোগ্রাফির’ অধ্যাপক ছিল। পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্যাংককে অবস্থানকালে সেখানে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়। জসিম মণ্ডলের জন্মস্থান বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানায় কালিদাসপুর গ্রামে। কমরেড মণ্ডল অল্প বয়সে রেলে ফায়ারম্যান হিসাবে চাকরিতে ঢোকেন এবং সেই সুবাধে কোলকাতার পার্টি নেতাদের সাথে যোগাযোগ হয় এবং কমরেড মোজাফ্ফর আহমদের সাথে (কাকাবাবু) যোগাযোগ হয়। এভাবে পার্টির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২০ সালের পর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে জোরদার হয় কমরেড মণ্ডল রেল শ্রমিক হিসাবে আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এক সময় আন্দোলনের কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। কঠিন জীবন যাপন করতে হয়। এভাবে জেল জুলুম সহ্য করে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। ঐ সময় থেকে তিনি পার্টির সার্বক্ষণিক ছিলেন। এই কঠিন পারিবারিক জীবন কাটানোর জন্য তার স্ত্রী কমরেড জাহানারা বেগমের অবদান কম নয়। পাকিস্তান আমলে ঐ বেকার অবস্থায় তাঁকে বাড়িতে-বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার জন্য চাল ও অর্থ সংগ্রহ করতে হতো। পাঁচ মেয়ে এবং এক ছেলেকে মানুষ করার পেছনে তার বড় অবদান ছিল। আমরা ছোটবেলা থেকে কমরেড মণ্ডলের এই কঠিন জীবন দেখেছি। তাঁর নেতৃত্বে ঈশ্বরদীতে রেল শ্রমিকদের মধ্যে পার্টির বিস্তার লাভ করে। তিনি লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে রেল শ্রমিকদের প্রিয় নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। ভারত ভেঙ্গে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামে এক কৃত্রিম রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। নেতৃত্বে ছিল মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান গঠন হওয়ার মূলে ছিল ব্রিটিশ শাসকরা। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন দুর্বার হয়ে ওঠে তখন ব্রিটিশরা ভারতকে ভাগ করার কৌশল হিসাবে মুসলিম লীগ গঠন করে মানুষকে বোঝানো হয় মুসলমানদের পাকিস্তান আর হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান হলে মানুষের সুখের সীমা থাকবে না। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান হিসাবে চিহ্নিত হয়। এই দেশ ভাগ করার জন্য ইংরেজরা সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেয়। তখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আওয়াজ তোলে ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়- লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’। ব্যাপক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সরকার ভারত বর্ষ ভাগ করে ফেলে। এবং ঐ সময়ের জাতীয়তাবাদী নেতারা যেমন কংগ্রেসের নেতা গান্ধী জি-নেহেরু-মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আর মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্রিটিশদের খপ্পরে পড়ে ’৪৭ সালে তথাকথিত স্বাধীনতা মেনে নেয়। একমাত্র সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি কমরেড রনজিতের নেতৃত্বে এ ধরনের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। তবে ঐ সময় মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চিন্তা পেয়ে বসে। বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে। যার ফলে ব্রিটিশদের সহযোগী সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক দাঙ্গা হয় বাঁধাতে সক্ষম হয়। এর ফলে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে ঐ সময় পার্টির এই আন্দোলনের বিষয়ে এবং সব নেতা একমত ছিলেন না। কুষ্টিয়া মোহিনী মিলের নেতা ও পার্টির নেতা কমরেড রওশন আলী ও কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল এ আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। পরে ’৪৮ সালে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন ভারত গঠিত হওয়ার পর, পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের উপর ব্যাপক হামলা চালায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন কমিউনিস্ট অত্যাচারের মুখে দলে দলে এলাকা থেকে ভারতে যেতে বাধ্য হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে নাচোল এলাকায় ইলামিত্র ও তার তেভাগা আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ব্যাপক মারধর, হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। পাকিস্তানের পুলিশ এই ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায়। ইলামিত্রের উপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে জেলে নেয়া হয় এবং সর্বশেষ বলপূর্বক ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একই কায়দায় সুসং দুর্গাপুরের টংকা আন্দোলনের এলাকায় ব্যাপক ধরপাকড়, অত্যাচার করা হয়। পার্টি ঐ সময় সারা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পাকিস্তানের এলাকায় পৃথক পার্টি কমিটি গঠন করে। কমরেড মণিসিংহ, কমরেড খোকা রায়, কমরেড বারিন দত্ত প্রমুখ নেতারা কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠন করেন এবং কমরেড জসিমউদ্দিন মণ্ডল, কমরেড রওশন আলী ও রাজশাহীর কমরেড আতাউর রহমান, ময়মনসিংহের আলতাফ আলীকে নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করেন। তাছাড়া ’৪৮ সালের ছাত্র যুবদের আন্দোলন পাকিস্তানি শাসকদের পিছে হটতে বাধ্য করেন। ঐ সময় গড়ে উঠে ভাষা আন্দোলনের নেতা হিসাবে দাঁড়িয়ে যায় অলি আহাদ, শহিদুল্লাহ কায়সার, ভাষা মতিন প্রমুখ। পার্টি নতুনভাবে আত্মগোপন অবস্থায় সারা বাংলায় আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়। কমরেড মণ্ডলদের অসীম সাহস এই অবস্থায় ব্যাপক অবদান রাখে। জেলায় জেলায় পার্টি গড়ে ওঠে। পাবনা জেলাতে কমরেড অমূল্য লাহড়ীর নেতৃত্বে কমরেড প্রসাদ রায়, কমরেড আমিনুল ইসলাম বাদশা, কমরেড জসিমউদ্দিন মণ্ডল, কমরেড সেলিম বাসুসহ সারা জেলায় পার্টি সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে ওঠে। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী আন্দোলন দমন করার জন্য রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়াওয়ার্ড গুলি করে ৭জন নেতাসহ অন্যদের হত্যা করে আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা করে। পরে কমরেড মণ্ডল, কমরেড আমিনুল ইসলাম বাদশা ও জসিম মণ্ডল দেহে বুলেটসহ আমৃত্যু বেঁচে থাকেন। কমরেড হেনা দাস, কমরেড অনিমা সিংহ চা বাগানের শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে পার্টি সংগঠন গড়ে তোলেন। উত্তর বঙ্গে কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন, কমরেড সাবের উদ্দিন আহমদ, জিতেন দত্ত, শংকর বোস (পরে বিলোপবাদী হন), দিনাজপুরের সুরন দাস তালুকদার এবং সঙ্গে জসিম মণ্ডলের খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। কমরেড মণ্ডল বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর এলাকায় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। জসিম উদ্দিন মণ্ডল গরিব শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় বক্তা ছিলেন। উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গের জেলায় শ্রমকি-কৃষকদের মধ্যে প্রচার হলে বক্তৃতা শুনতে জনতার ঢল ভেঙ্গে পড়তো। কমরেড মণ্ডল অসামান্য ভাল বক্তা ছিলেন। তার বক্তৃতায় শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার হয়ে উঠত। কমরেড মণ্ডল যেখানে যে বক্তব্য রাখা প্রয়োজন সেভাবে বক্তৃতা করতেন পারতেন। ফলে বুদ্ধিজীবীরাও মুগ্ধ হয়ে যেতেন । তার বই “জীবনের রেলগাড়ী” জনপ্রিয় বই হিসাবে পরিচিত। তার সঙ্গে যারা মিশেছে অনেক কিছু জানতে পারতেন। তবে তাকে বুঝতে হলে তেমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করতে হবে। তার জীবন ও কাজ থেকে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পেরেছিলাম আমি। আমি তাঁর সাথে বহু জনসভায় গিয়েছি। একটা ঘটনা না বললেই নয়, রংপুরের পীরগঞ্জে ষাটের দশকে এক জনসভায় বক্তৃতার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। বক্তব্যটি ছিল কৃষকদের নিয়ে। তখন মোনায়েম খাঁ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। সে কৃষকদের জন্য বলদ কেনার জন্য বিশ টাকা করে অনুদান ঘোষণা করে। সে সময়ের বাজারদর অনুসারে ২০ টাকায় বলদ পাওয়া যেতো না। তিনি জনতাকে জিজ্ঞাসা করতেন আপনারা বলেন ২০ টাকায় কি বলদ পাওয়া যায়? জনতা সমস্বরে বললেন, না, না। মন্ডল বললেন, না পাওয়া যায়– মোনায়েম খাঁনের মত বলদ পাওয়া যায়। জনতা বক্তব্য শুনে উচ্ছাসে ফেটে পড়ে। ওই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে সরকার রাজদ্রোহ মামলা দেয়। এই মামলা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাতিল হয়।এরপর তাঁর সাথে আমি ঐ মাঠে বক্তব্য দিয়েছি। তার বক্তৃতায় কৃষক-শ্রমিক খুবই উৎসাহিত হত। এমন একজন শক্তিশালী নেতাকে কমিউনিস্ট পার্টি হারাল– এটা পার্টির জন্য বিরাট ক্ষতি এবং এ শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়। কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডলকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও লাল সালাম। লেখক : সদস্য, কন্ট্রোল কমিশন, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..