জয়তু জসিম উদ্দিন মণ্ডল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কমরেড জসিম মণ্ডলের মৃত্যুতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক সূর্য অস্তমিত হলো। আজীবন বিপ্লবী কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল তরুণদের স্বপ্নের নায়ক। তিনি হাজার হাজার তরুণকে কমিউনিস্ট আদর্শ ও আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তার দেখানো আদর্শের পথ ধরেই শ্রমিক শ্রেণি বিপ্লবী আন্দোলনকে এগিয়ে নেবে। জসিম উদ্দীন মণ্ডল একটি ইতিহাসের নাম। জীবন ও যুদ্ধের যে ‘অংক’ তিনি শিখেছিলেন তরুণ বয়সে, তার চর্চা ও ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা শেষ বয়সেও এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে রাখেন নি। দুই দুইবার দেশ স্বাধীন করা বীরযোদ্ধা ছিলেন কমরেড জসিম মণ্ডল। ব্রিটিশ তাড়িয়েছেন যে হাতে, সে হাতেই তাড়িয়েছেন পাকিস্তানি হানাদার। জসিম উদ্দীন মণ্ডলের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা তেমন ছিল না। গরিবের ছেলে হওয়াতে মাত্র ক্লাস ফাইভ পাস করে শ্রমিক হতে হয়েছে। নিজ গুণে হয়েছিলেন রেল শ্রমিকদের প্রিয় মানুষ। ১০-১১ বছর বয়স থেকেই বেছে নিয়েছিলেন রেল শ্রমিকের জীবন। জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে হয়েছেন মার্কসবাদী, করেছেন কমিউনিস্ট পার্টি। সারা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন অমর গ্রন্থ ‘জীবনের রেলগাড়ি’। ১৯২৪ সালে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা ও তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার কালিদাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি রেলইঞ্জিনে কয়লা ফেলার চাকরি পান। সে সময় শ্রমিক শোষণের চিত্র দেখে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন কিশোর জসিম মণ্ডল। তিনি ব্রিটিশ রেল কোম্পানির শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ষাটের দশকে রেলওয়েতে চালের বদলে খুদ দেওয়ায় তিনি রেল শ্রমিকদের নিয়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তোলেন। এতে তাঁর চাকরি চলে যায়। তবুও আত্মপ্রতিষ্ঠাকে পায়ে ঠেলে তিনি শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন দৃঢ়তার সঙ্গে। জসীম মণ্ডল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে ছিলেন। আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার কারাবরণ ও ব্রিটিশ সরকারের নির্যাতনের শিকার হন। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি মোট ১৯ বছর কারাভোগ করেন। তিনি নিজের জীবন ও চারপাশের বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে উপলব্দি করেছেন সমাজের বৈষম্য। সেই বৈষম্য দূর করতে সংগঠনের, রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ায় আন্দোলনের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টি। এই সমাজ যে আমাদের ভাত দেয় না, আমাদের মধ্যে শোষক আর শোষিতের জন্ম দেয়- তিনি এটি ছোটবেলায়ই বুঝতে শিখেছিলেন। বুঝেছিলেন, এই সমাজকে টিকিয়ে রাখা মানেই শোষণকে টিকিয়ে রাখা। তিনি বিশ্বাস করতেন- সমাজ বদলের একমাত্র হাতিয়ার হলো রাজনীতি। বিপ্লব ছাড়া মুক্তির পথ নেই। তিনি জানতেন, সমাজ পাল্টাতে হলে একটি শক্তিশালী শ্রেণি-সংগ্রামের পার্টি দরকার। তিনি সেই পার্টি বেছে নিতে পেরেছিলেন। পার্টির প্রতি ছিল তাঁর পরম আস্থা ও ভালবাসা। সে জন্য ১৯৯৩ সালে পার্টির ভেতর থেকে যখন পার্টিকে বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল, তিনি তখন অবিচলভাবে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন, পরামর্শ দিয়েছিলেন। যে দেশের জন্য ত্যাগের যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সেই বাল্যকালে সেখান থেকে সরেননি। কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল মনেপ্রাণে জীবনভর সমাজ বদলের স্বপ্নকে ধারণ করতেন। জেলজীবন-আত্মগোপন-জেলে অনশন সবকিছু ছিল মানুষের জন্য। তিনি জানতেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একটা শক্তিশালী পার্টি দরকার। সে জন্য তিনি ছুটেছেন দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। জীবিত জসিম মণ্ডল শক্তিশালী ছিলেন, তাঁর আমৃত্যু লালিত স্বপ্নকে আরো শক্তিশালী করার দায়ভার আমাদের। ইচ্ছে করলেও সবার পক্ষে কমিউনিস্ট হওয়া সম্ভব না। কমিউনিস্ট হতে হলে তাকে সর্বক্ষেত্রে কমিউনিস্ট হতে হয়। তার চাল-চলন-কথাবার্তা-আচার-আচরণ-পোশাক-আশাক-ত্যাগ-তিতিক্ষা সবকিছুতে কমিউনিস্ট হতে হয়। তাকে দেশপ্রেমিক হতে হবে, কষ্ট করতে হবে, জেল খাটতে হবে। বিপ্লবের মৃত্যু নেই। বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। থামবেনা জীবনের রেলগাড়ি। তবে অবশ্যই একদিন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে। আর সেদিন থেমে যাবে সকল শোষণ, বৈষম্য, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ। এটাই সমাজের বিজ্ঞান, এটাই গণিত। এই স্বপ্ন বুকে ধারণ করেই জসিম উদ্দীন মণ্ডল চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তবে বর্তমান আর উত্তর প্রজন্মের জন্য রেখে গেলেন চিন্তা-আদর্শ আর পথ চলার পাথেয়। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মানবতাবাদী, সাম্যবাদী, আজীবন বিপ্লবী কমরেড জসিম মণ্ডল এই গণিত, এই বিজ্ঞান শিক্ষাই দিয়ে গেছেন অকৃত্রিম অকৃপণভাবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..