স্বাধীনতা ঘোষণার পথে কাতালুনিয়া

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : স্পেন ও কাতালুনিয়ার রাজ্য সরকারের মধ্যে সংলাপ বন্ধ থাকায় সংকট কাটছে না। এই অবস্থায় ২ অক্টোবর একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চেয়েছিল কাতালুনিয়া রাজ্য বিধানসভা। মাদ্রিদ মধ্যস্থতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। গণভোটের পর স্পেনের কাতালুনিয়া রাজ্য ২ অক্টোবর একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়েছিল। এই অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সংকট মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু স্পেনের ফেডারেল সরকার এ নিয়ে কোনো রকম আপোস করতে নারাজ। কাটালুনিয়ার মুখ্যমন্ত্রী কারলেস পুজেমন মধ্যস্থতার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছে স্পেনের সরকার। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাখোই-এর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বেআইনি কোনো বিষয় নিয়ে সরকার আলোচনা করবে না, ব্ল্যাকমেল বা হুমকির মুখেও নয়। একমাত্র আইনের কাঠামোর মধ্যেই গণতন্ত্রের আলোচনা হতে পারে। আলোচনা চাইলে পুজেমনকে আবার আইনের পথে ফিরতে হবে। স্পেনের সরকার, সাংবিধানিক আদালত ও রাজা ফেলিপে স্বাধীনতার লক্ষ্যে কাতালুনিয়ার ‘বেআইনি’ একতরফা পদক্ষেপের জোরালো বিরোধিতা করে চলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও কাতালুনিয়াকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না। ইইউ স্পেনের সার্বভৌমত্বের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। এমন একঘরে অবস্থা সত্ত্বেও স্বাধীনতাকামী শক্তি ২ অক্টোবর কাতালুনিয়ার রাজ্য বিধানসভার পূর্ণ অধিবেশন ডেকেছে। সেখানে গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে বিতর্ক হবে। রাজ্য সরকারের এক প্রতিনিধি সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, অধিবেশনের গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করবে যে সেদিনই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে কিনা। কাতালুনিয়া রাজ্য সত্যি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করলে স্পেনের ফেডারেল সরকার তা মেনে নিতে অস্বীকার করে রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করতে পারে। উল্লেখ্য, স্পেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এমন হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়নি। সে ক্ষেত্রে অবশ্য চরম প্রতিবাদ-বিক্ষোভের আশঙ্কা রয়েছে। গণভোটের দিন থেকেই কাতালুনিয়ায় বিক্ষোভ চলছে। বিশেষ করে ফেডারেল পুলিশ বাহিনীর কড়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বন্ধ হচ্ছে না। শুধু স্পেনের সংবিধান ও আইন অমান্য করার কারণে নয়, কাতালুনিয়ার গণভোটের বৈধতা নিয়ে অন্য কারণেও বিতর্ক রয়েছে। মাত্র ৪২ শতাংশ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জানানোর ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করছেন সমালোচকরা। তাছাড়া এমন একতরফা স্বাধীনতার পরিণাম কাতালুনিয়ার জন্য আদৌ ইতিবাচক হবে কিনা, সেই প্রশ্নও উঠছে। এদিকে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে স্বয়ং কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে সংবিধান অনুযায়ী নিয়মকানুন প্রয়োগ করার ডাক দিয়েছেন। এতকাল দুই পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন তিনি। এবার স্বভাবসিদ্ধ সংযম বর্জন করে রাজা ফেলিপে স্বাধীনতাকামীদের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফেলিপে বলেন, দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের মাধ্যমে তারা কাতালুনিয়া ও স্পেনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন করছে। এই অবস্থায় বৈধ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। রাজার ভাষণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও বেড়ে গেছে। তাঁর এমন কড়া বার্তার কারণে বিশেষ করে কাতালুনিয়ার অনেক মানুষ ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। গণভোটের দিন স্পেনের ফেডারেল পুলিশের হিংসাত্মক পদক্ষেপের কোনো উল্লেখ না করায় ফেলিপের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে। ৩ অক্টোবরও বার্সেলোনা শহরে হাজার হাজার মানুষ ফেডারেল পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানিয়েছেন। ‘দখলদারী বাহিনী’ হিসেবে তাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যাবার দাবি করছেন তাঁরা। এই অবস্থায় অরাজকতার আশঙ্কা করছে স্পেনের কিছু পুলিশ ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ। ফেডারেল সরকার কোনো বোঝাপড়া ছাড়াই কাতালুনিয়া অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কাতালোনিয়ার গণভোট ঠেকাতে স্পেন কর্তৃপক্ষের শক্তি প্রদর্শন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি দেশটির প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ৪২ বছর আগেই দেশটির স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোর মৃত্যুর পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগোচ্ছিল স্পেন। সেটির ওপর আঘাত এল এ ঘটনায়।এই গণভোটের প্রভাব কেবল স্পেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে স্পেনের বাইরেও। জাতীয়তাবাদী বাস্ক গেরিলারা স্পেনে দীর্ঘদিন থেকে সক্রিয় ছিল। বহু দশকের সংগ্রামে কমপক্ষে ৮০০ লোক নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে কয়েক হাজার। তবে ২০১০ সালে অস্ত্রবিরতিতে যায় তারা। উত্তর আয়ারল্যান্ডের আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) সঙ্গে বাস্ক গেরিলাদের আগে থেকে গোপন যোগাযোগ ছিল। তারা অভিজ্ঞতা এবং বিশেষজ্ঞ বিনিময় করত। অস্ত্রবিরতিতে এই দুই সংগঠনের নিজেদের মধ্যেই দ্বিমত আছে। সীমিত স্বায়ত্তশাসন কিংবা ক্ষমতার অংশীদার হতে চায় না তারা। এসব কারণে নিউ আইআরএর সৃষ্টি, যারা ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন হামলার সঙ্গে জড়িত। কাতালোনিয়ার মতো ইউরোপে আরও কয়েকটি স্থান রয়েছে, যারা স্বাধীনতা চায়। ইতালির উত্তরাঞ্চলে নর্দান লিগ প্রভাবশালী দল। তবে স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা এখনো খুব সক্রিয় নয়। জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলের কনজারভেটিভ বাভারিয়ান ন্যাশনালিস্টরা এখনো স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐকান্তিক নয়। তবে ভিন্ন অবস্থা স্কটল্যান্ডে। সেখানে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি স্বাধীনতার প্রশ্নে সক্রিয়। গণভোটের আয়োজন করতে চান দলটির নেতা এবং স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজন। এই দলগুলোর সঙ্গে কাতালোনিয়ার একটি মিল রয়েছে। সবাই কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের আধিপত্য পছন্দ করে না। ফলে কাতালোনিয়ার গণভোটের প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..