দূষিত হচ্ছে হালদা নদী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
চট্টগ্রাম সংবাদদাতা : দূষণের ফলে রং বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশে রুই জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদীর পানি। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে নদীটির অবস্থা ঢাকার বুড়িগঙ্গার মতো হয়ে যাবে বলে এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ নদীতে এখন আর পাঙ্গাস, চেলা, গুলশা, গুজি আইড়, কাটা মাছ, গনি চাপিলা, নুনাবেলে ও চেউড়া মেনি মাছ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে আইড়, বোয়াল, চিতল, চিংড়ি, বাঁচা মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। এ নদীর তীরে কাগজ শিল্প, বিদ্যুৎ, ইটভাটা, পোল্ট্রি ফার্ম, আবাসন, ট্যানারির মতো শিল্প রয়েছে। তাছাড়া অবৈধভাবে মাঝে-মধ্যে ড্রেজারে বালু তোলা হয়। কর্ণফুলী পোপার মিলের গ্যাস নদীতে অপসারণ করার ফলে মা মাছের মৃত্যু হচ্ছে। নদীর জল প্রবাহে রাবার ড্যাম নির্মাণের প্রভাবে চর পড়ে নদীটি খাল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় হালদায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে যা রুই জাতীয় মাছের জন্য ক্ষতিকর। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, হালদা নদী বাংলাদেশে রুই জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। এ নদীর রুই জাতীয় মাছের আদি বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন আছে এবং বৃদ্ধির হার দেশের যেকোনো প্রাপ্ত পোনার চেয়ে গড়ে প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে এ নদীর প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রটি ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তর হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র পুনরুদ্ধার শীর্ষক প্রকল্পটি ২০০৭ সাল হতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করেছে। এ প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়নে এ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতে এ নদীর নিষিক্ত ডিম উৎপাদনের পরিমাণ বিগত পঞ্চাশের দশকের তুলনায় ৯৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে সরকার এটি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির মাধ্যমে হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, জলজ সম্পদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের জন্য মৎস্য অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা এবং মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ মৌসুমে সুফলভোগীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত ২০১১-১২ সালে হালদা নদীর মূল স্রোতধারা ভূজপুর এবং হারুয়ালছড়ি নামক স্থানে দুটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ড্যামের নিম্নাংশে পানি প্রবাহ এক কিউসেক এর নিচে নেমে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন পরবর্তী সময়ে হালদা নদীতে নিষিক্ত ডিম উৎপাদন হ্রাসের প্রধান কারণ উক্ত দুটি ড্যাম। নদীর গতিপথ সংরক্ষণ ও পলি নিয়ন্ত্রণের জন্য নদী খনন কার্যক্রম পরিকল্পনায় থাকলেও স্থানীয়ভাবে জনমত সৃষ্টি না হওয়ায় এ কাজ দুটি করা হয়নি। প্রকল্পের প্রধান প্রজনন এলাকায় প্রজনন মৌসুমে ডিম আহরণ উন্মুক্ত রেখে সারা বছর মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে অভয়াশ্রম ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান প্রজনন এলাকায় মা মাছের অভিপ্রয়ান ও মজুদ বৃদ্ধির জন্য নদীর নিম্নাংশ ও পার্শ্ববর্তী কর্ণফুলী, শিকলবাহা ও সাঙ্গু, চাঁদখালী নদী এবং হালদা নদীর ১৬টি ফিডার ক্যানেলে ফেব্রুয়ারি হতে জুলাই মাস পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু অভয়াশ্রম বাস্তবায়নের ফলে নদীতে জীববৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়নি বলে প্রকল্পের সুফলভোগীরা মতামত দিয়েছেন। প্রকল্পের অধীনে অনেক সফলতার উদাহরণও রয়েছে। বিশেষ করে ভাসমান হ্যাচারি উদ্ভাবনের ফলে ডিম পরস্ফূটনের হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। হালদা নদী চট্টগ্রাম জেলার অন্যতম প্রধান মিঠাপানির উৎস হওয়ায় এ নদী থেকে সবাই সুফল পাচ্ছে। কৃষি, শিল্প, চট্টগ্রাম ওয়াসা ইত্যাদি সকলেই এ নদীর পানি ব্যবহার করে। আর এ নদীর বহুমাত্রিক পানি ব্যবহারের ফলে স্লুইসগেইট, রাবার ড্যাম নির্মাণ, চা বাগান, শিল্প কারখানার জন্য পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। আবার শিল্প কারখানার বর্জ্য পরিশোধন না করেই নদীতে ফেলা হচ্ছে। পলি ভরাটের ফলে নদী অগভীর হওয়া ও পাড় ভাঙন, নদী হতে অপরিকল্পিতভাবে বালু, মাটি উত্তোলন, কর্ণফুলী নদীর দূষিত ও লবণাক্ত পানি প্রবেশ, জাহাজ ও যন্ত্রচালিত নৌকার তৈল/বর্জ্য নিঃস্বরণ ও শব্দ দূষণ এ সবের কারণে শুধু মৎস্য অধিদপ্তর এককভাবে হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণের প্রচেষ্টা টেকসই হবে না। এজন্য দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হালদা নদীর বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর ড. মো. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদা নিয়ে বিক্ষিপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এর থেকে সুফল খুব কমই আসছে। তিনি বলেন, একদিকে হালদা নদী পুনরুদ্ধারে মৎস্য অধিদপ্তর প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে আবার একই সময়ে এই রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সমন্বয় না থাকার কারণে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, অর্থেরও অপচয় হয়েছে। তিনি বলেন, হালদা নদীকে বাঁচাতে হলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, মৎস্য অধিদপ্তরসহ সকলকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আগাতে হবে। বিক্ষিপ্তভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না। মৎস্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কর্ণফুলী না বাঁচলে হালদা নদীও বাঁচবে না। কেননা কর্ণফুলী হয়ে মা মাছ হালদায় প্রবেশ করে। তাই কর্ণফুলীরও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। হালদা নদী পুনরুদ্ধারের প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। বর্তমানে হালদা নদীর পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে নতুন করে হালদা নদী রক্ষায় প্রকল্প নেওয়া হবে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান। আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে দেড় হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। এই জমিতে সেচ দেওয়ার ফলে বাড়তি উৎপাদন হচ্ছে ৩ হাজার মেট্রিক টন; যার বাজার মূল্য মাত্র সাড়ে ৪ কোটি টাকা। মাছের জন্য প্রয়োজন পানি আর ডিম উৎপাদনের জন্য পাহাড়ি ঢল। তা ছাড়া নদীতে চর পড়ছে তাই নৌকা চালাতে অসুবিধা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নদীটি শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই রাবার ড্যাম অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে নদীতে মুরগির বিষ্ঠা ফেলা হচ্ছে, এগুলো মাছের জন্য এক ধরনের বিষ। তা ছাড়া চিংড়ি ধরার জন্য নদীতে বিষ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এর প্রভাবে অন্য মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের শালদা গ্রামের টিলাভূমি বিধৌত শালদা নামের স্বচ্ছ জলাধার এবং আরো কয়েকটি ছোট ছোট ছড়া একত্রিত হয়েছে হালদা খাল নাম ধারণ করে রামগড় উপজেলার মানিকছড়ি হতে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলাতে প্রবেশ করেছে। হালদা খাল একই জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা হতে নেমে আসা কয়েকটি খাল ফটিকছড়ির বারমাসিয়া ও সুন্দরপুর গ্রামের মধ্যস্থলে মিলিত হয়ে হালদা নদী নাম ধারণ করেছে। নদীটি হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চান্দগাঁও থানাধীন মোহরার নিকট কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। এ নদীটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮ কিলোমিটার। ৪টি উপনদী ও ৩৪টি খাল এ নদীতে পতিত হয়েছে। এ নদী হতে প্রাপ্ত পোনার বৃদ্ধির হার হ্যাচারিতে উৎপাদতি পোনার চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের হ্যাচারি মালিকগণ তাদের মাছ উন্নয়ন এবং উন্নত জাতের রুই জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য হালদা নদীর ডিম ও পোনার প্রতি আগ্রহী।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..