অজিদের দম্ভ ভেঙে বিশ্বক্রিকেটকে বড় বার্তা টাইগারদের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মিথুন রায় : মাত্র ৪২ রানে অজিদের তিন উইকেট নেই। মনে হতেই পারে- টার্গেটের স্কোরে যদি মুশফিকরা আর একশো রান যোগ করতে পারতো তবে সিরিজের ট্রফিটাও একক দখলেই আসতো। তাতে আক্ষেপ থাকলেও ১৪০ বছর ধরে টেস্ট খেলে আসা ক্রিকেট আভিজাত্যের দেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ ড্র করাটাই বা কম কিসে! যেখানে টাইগারদের সাদা পোশাকের বয়স মাত্র ১৭ বছর। সদ্য শেষ হওয়া সিরিজটি ২০১৫ সালেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের সন্দেহের মুখে একাধিকবার তাতে বাধা পড়ে। শেষ পর্যন্ত অজিরা আসলো। আর এসে এটি অন্তত দেখে গেল হোম গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ কতটা কঠিন। তাতে বাংলাদেশ ইস্যুতে দম্ভের চূড়া ভাঙলো অস্ট্রেলিয়ার। বাধ্য হলো সমীহের বাণী শোনাতে, মাটিতে পা পড়লো অজিদের। চট্টগ্রাম টেস্ট শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসে সেকথা তো অপকটেই স্বীকার করে গেলেন অজি ক্যাপ্টেন স্টিভেন স্মিথ। বছরখানেক আগেও বাংলাদেশ যেখানে স্বপ্ন দেখতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ ড্র করা কিংবা জয় তুলে নেয়ার সেখানে মিরপুরে অজিদের বিপক্ষে জ্বলজ্বলে একটি জয় সত্যিই তো সোনার হরিণ হাতে পাওয়ার মতো। আর চট্টগ্রামেও একাধিকবার জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে লড়ে হারার মধ্যে থেকে অনুপ্রেরণা নিশ্চয় খুঁজে নেবে টিম বাংলাদেশ। টাইগারদের বিপক্ষে হেসেখেলে হেলায় জেতার দিন যে ফুরিয়ে গেছে সেটি তো স্মিথের কথাতেও পরিষ্কার। চট্টগ্রাম টেস্ট জেতার পর সংবাদ সম্মেলনে অজি অধিনায়ক সত্যিটাই স্বীকার করলেন- ‘২-০-তে সিরিজ জিতলে আমাদের জন্য ভালো হতো। তবে এখান থেকে ১-১-এ ড্র করে যেতে পারাটাও খারাপ নয়। প্রথম টেস্টে জিততে না পারাটা হতাশার ছিল। তবে বাংলাদেশকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। তারা ভালো ক্রিকেট খেলেছে। দারুণ এক সিরিজ ছিল।’ স্মিথের মুখেই যখন ড্র করে তৃপ্তি, তখন বাংলাদেশ অধিনায়ক কী বলবেন? মুশফিকুর রহিম ড্র সিরিজ থেকেও খুঁজে পাচ্ছেন প্রাপ্তি। তবে একটা আফসোসও আছে তাঁর, ‘অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে টেস্ট জিতেছি, এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। দ্বিতীয় ম্যাচে আরও ভালো করার সুযোগ আমরা হারিয়েছি দ্বিতীয় ইনিংসের কারণে। তবে সব মিলিয়ে ভালো একটা সিরিজ গেছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজ ড্র করা অনেক বড় অর্জন। একটু আক্ষেপও আছে। এই ম্যাচটা আরেকটু ভালো খেললে ফল হয়তো অন্য রকম হতে পারত।’ ব্রিফিং এ টাগার অধিনায়ক বলেন, ‘আমার মনে হয় এই টেস্ট হারায় দ্বিতীয় ইনিংসের চেয়ে প্রথম ইনিংসের ব্যর্থতাই বেশি দায়ী। সেখানে আমরা অনেকটা পিছিয়ে ছিলাম। প্রথম দিনে উইকেটটা এমন স্পিন সহায়ক ছিল না যে খেলা যাবে না।’ মুশফিকের বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজ ড্র করে বিশ্ব ক্রিকেটকেই দেওয়া গেছে বড় এক বার্তা। ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টির পর বাংলাদেশ এখন টেস্টেও বড় শক্তি হতে যাচ্ছে! অবশ্য বিশ্ব ক্রিকেটকে দেয়া এই বার্তা আরও জোরালো হতো বাংলাদেশ যদি সিরিজটি নিজেদের করে নিতে পারতো। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংস পর্যন্ত সে সম্ভাবনা ছিলও। অস্ট্রেলিয়ার ৭২ রানের লিড এমন বড় কিছু তো ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫৭ রানে অলআউট হয়ে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার সামনে দিতে পারল মাত্র ৮৬ রানের লক্ষ্য। সেটি দেড়শোর মতো হলেও ম্যাচ অন্য দিকে মোড় নিতে পারতো হয়তো। তাতেও খুব বেশি আক্ষেপের কিছু নেই। সময় বাংলাদেশকে কতটা সামনে নিয়ে এসেছে সেটি তো ক্রিকেট বিশ্ব ভালো করেই দেখছে। বছর দশেক আগেও যদি একটু ফিরে তাকাই দেখবো- বেশিরভাগ টেস্টেই বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে। প্রতিপক্ষ হয়তো একবার ব্যাট করে সাড়ে পাঁচশো করে দিতো। বাংলাদেশ তার পর ফলোঅনে পড়ে দুই ইনিংস মিলিয়ে করতো আড়াইশো কি তিনশো। দিন বদলেছে টাইগার শিবিরে। আর সেই পরিবর্তনের বড় শুরু গেল অক্টোবর থেকে। গত বছরের অক্টোবরে সফরকারী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে মাত্র ২২ রানে হেরে মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে ১০৮ রানের বড় জয়ের মধ্য দিয়ে টেস্টে প্রথমবারের মতো অভিজাত কোনো দলকে হারানোর যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। একই বছর ভারতের বিপক্ষে ধর্মশালা টেস্টেও ড্রয়ের দাঁড়প্রান্তে পৌঁছে টাইগাররা। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কার মাটিতে ১-০ তে পিছিয়ে পড়েও সমতায় টেস্ট সিরিজ শেষ করা। এগুলো গেল এক বছরে টেস্টেও টাইগারদের শক্তিশালী হয়ে ওঠারই বার্তা। ঘরের মাঠে অজিদের বিপক্ষে দলের জয়ের কথা আগেই বলেছিলেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। তার কথাই সত্যি হলো। চট্টগ্রাম টেস্ট নিয়েও একই কথা বলেছিলেন। হাথুরুর কথা যে আবেগী ছিল না মাঠের খেলায় সেটি বারবারই মনে হয়েছিল। অধিনায়ক মুশফিকও চট্টগ্রাম টেস্টে ‘জেতার সুযোগ আছে’ বলেছিলেন। তবে ম্যাচ শেষে পরাজয়ের কারণ হিসেবে বিশেষত চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটসম্যানদের চরম ব্যর্থতাকেই (৪৭ রানে ৫ উইকেট) দায়ী করেছেন মুশফিক। অবশ্য দ্বিতীয় টেস্টে মোস্তাফিজের কামব্যাক করাকে আসন্ন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে স্বস্তির বার্তা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে তামিমের ব্যাক টু ব্যাক হাফসেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসে তামিম-সাকিবের ১৫৫ রানের জুটি। দুই ইনিংসে সাকিবের ১০ উইকেট। এগুলোই ছিল বাংলাদেশের ম্যাচ জয়ের পাশাপাাশি বড় প্রাপ্তি। মিরপুরের উইকেট স্বাগতিকদের জন্য বাড়তি সহায়ক হয়ে উঠলেও চট্টগ্রামে সেটি তুলনামূলক অজি স্পিনাররাই বেশি কাজে লাগিয়েছে বলেও মনে করেন মুশফিক। স্মিথ তো ওয়ার্নার আর দুই টেস্টে ২০ উইকেটেরও বেশি নেয়া নাথান লায়নের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পেসার প্যাট কামিংসকে নিয়েও তার উচ্ছ্বাস ছিল বেশ। মুশফিকের আক্ষেপকে ‘ক্রিকেটীয় রোমাঞ্চ’ ধরে নিলে বলা যায়- চট্টগ্রাম টেস্টে নাইবা জিতলো টাইগাররা। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যেখানে টেস্ট ম্যাচ ড্র করা ছিল এতদিন স্বপ্নের মতো সেই স্বপ্ন আজ হাতের মুঠোয়। সাদা পোশাকে অজি বধ ও সিরিজে সমতা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় নতুন এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। যেখান থেকে মুশফিক বাহিনি নয়া রসদের সন্ধান করবে চলতি মাসের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় শুরু হওয়া পূর্ণাঙ্গ সফরে। টাইগারদের অভিনন্দন সিপিবি’র এদিকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ ড্র করায় উল্লাসে ভাসছে গোটা দেশ। টাইগারদের প্রশংসায় ভাসাচ্ছে জাতি। দেশের জন্য এমন গৌরব বয়ে আনায় টাইগার শিবিরকে ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সিপিবি সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক শাহ্ আলম স্বাক্ষরিক এক যৌথ বিবৃতিতে এ অভিনন্দন জানানো হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..