সাম্প্রতিক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আহমদ সিরাজ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংকটজনক পরিস্থিতি হচ্ছে বন্যাজনিত দুর্যোগময় অবস্থা-যা মানুষের বিশেষত: নিম্ন আয়ের গরিব মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। লাগাতার এ সমস্যাটির মধ্যে ষোড়শ সংশোধনীর রায়, মুসলমানদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা, হিন্দুদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা- এই বিষয়গুলো চরিত্রের দিক থেকে ভিন্ন হলেও আমাদের জাতীয় জীবনে একই সময়ে উপস্থিত হওয়াতে কোনোটির গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। তন্মেধ্যে আবার রোহিঙ্গা পরিস্থিতি একটা গুরুত্বর অমানবিক অবস্থার সৃষ্টি করেছে, যা উপেক্ষা করা সহজ হচ্ছে না। এই অবস্থায় ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রের শাসকবর্গের মধ্যে বিশেষত: ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরে শাসক মহলে যে বিপদজনক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে তাতে এর মাত্রা নিয়ে যে বাতবিতণ্ডা শুরু হয়েছে, তা থেকে নাগরিকের মুক্ত থাকা ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রের সবচেয়ে উঁচু মাত্রার বিষয় হচ্ছে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের বিষয়আশয়- যা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে পরিচালিত হয়ে থাকে- সাধারণত জনজীবনে তেমন আলোড়ন-বিলোড়ন তুলে না। তেমন কিছু করে থাকলেও দেশের সুশীল এলিট বিদ্বানদের তর্কবিতর্ক আলোচনা ও সমালোচনায় সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ষোড়শ সংশোধনীর রায় এর পর তা ক্রমশ পল্লবিত হয়ে ক্ষমতাসীন দুটি দলে ক্ষমতার ভাবনার বিষয় হিসেবে বিবেচ্য হয়ে উঠলে তা দ্রুতই বি¯ৃÍত হয়ে উঠে। দেশের পত্রপত্রিকায়ও এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হতে থাকে। রায় এর বিষয়ে মর্ম গভীরতার দিক থেকে খুবই তাৎপর্য বহন করলেও সাধারণ নাগরিক এ রায় নিয়ে এভাবে আলোড়িত হতে পারে তা ভাবা যায়নি। রাজনৈতিক দলের বিশেষত: দুই শাসক দলের প্রতিনিয়ত বাগযুদ্ধের মাত্রা যেভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে মনে হয়েছে কোন না কোন পক্ষের ‘হার জিত’ এ রায়ে সংঘঠিত হয়ে যাচ্ছে কিনা। তাতে বুঝে বা না বুঝে হোক সাধারণ মানুষজনও কান পেতে রাখতে মজা পেয়েছে। ৭৯৯ পৃষ্টার জটিল রায়ের বিরাট পাণ্ডুলিপি সাধারণ জনগণের দেখা তো দূরের কথা, একটা রায় যে এত পৃষ্ঠা সম্বলিত হতে পারে, তা জানাবুঝার মধ্যেও ছিল না। কিন্তু এবারের রায় ঘোষণার মধ্যে দিয়ে জাতীয় জীবনে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কিত বিষয় এত বেশি নাড়া দিয়েছে যে প্রচারণার দিক থেকেও এ রায় অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলেই মনে হয়। জাতীয় পত্রপত্রিকায় এ রায় নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে, আইন ও সংবিধান এর বিশ্লেষণ হয়েছে, তা নজিরবিহীন। এ বিষয়ে পত্রপত্রিকায় বিশষত: জাতীয় পত্রপত্রিকায় উপসম্পাকীয়, প্রবন্ধ, নিবন্ধ যত লিখা হয়েছে, এখনো অব্যাহত আছে, তাও কিন্তু সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে। সাধারণ জনগণ সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে সাধারণত চালিত হয়ে এলেও এ রায়ের আলোচনা-সমালোচনার স্বভাব-প্রভাবও তাদের কাণ্ডজ্ঞানে জ্ঞান সঞ্চার ঘটিয়েছে। মানুষ এখন আড্ডায়, চায়ের দোকানে, পথে ঘাটে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে কথা উঠায়। এমন একটা উদাহরণও টানা যেতে পারে। এখনও গ্রাম দেশে পথঘাট দিয়ে অনেক সময় দল বেঁধে মানুষ বাড়ি ফিরে কথা বলতে বলতে- তেমন একটি কথা পেছন দিক থেকে শুনতে হয়- “অথবা চাচা বিচারপতি ত আমরার তিলকপুর মাস্টরের পুয়া। তাইন ঢাকাত গিয়া বড় বিচারপতি অইয়া রাষ্ট্রর হলাহলা বেটাইনতর যুদ্ধর অপরাধর ফাঁসির রায় দিলা। সরকার ত তান দুষ দেখলা না। এখন হুনি কিতা একটা রায় লইয়া সরকার তান দুষ দেখছন। সরকার যদি তান দুষ ধরইন, তা অইলে তান হক্কল বিচার বাদ অইয়া যাইব নিবা চাচা। কিতা কইতাম রে বাবা, বালামন্দ কুন্তা বুজরাম না। গাউঘর ত ছানি বিচার আছে। হিতাত মনে লয় ছানি বিচার নাই নি কিতা। ইতা মাত বাদ দিয়া বাড়িত যাইগি দে।” অর্থাৎ আমাদের তিলকপুর মাস্টারের ছেলে বিচারপতি। তিনি ঢাকায় গিয়ে প্রধান বিচারপতি হয়ে বড় বড় যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় দিলেন। সরকার তার কোনও দোষ দেখেননি, এখন সরকার তার দোষ ধরছেন, তাহলে তার সকল বিচার বাতিল হয়ে যাবে কিনা, চাচা। কি বলবরে বাবা ভালাবুরা কিছু বুঝতে ছিনা। গ্রাম দেশে ছানি বিচার (পুনঃবিচার) আছে। সেসব জায়গায় ছানি বিচার নাই কিনা। এসব কথা বাদ দিয়ে বাড়ি চলে যাই। এ রায় সাধারণ মানুষকে এভাবে তাড়িত করলেও আমাদের রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অনেক মন্ত্রিকে যেভাবে তাড়িত করেছে, তাতে জনতার আদালত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। এ রায় নিয়ে ব্যক্তিগতভাবেও কুৎসিত অরুচিকর কথা উঠে এসেছে, যা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের কর্ণধারদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। কিন্তু স্মরণ থাকা ভাল বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর কে কোথায় কিভাবে ছিলেন, কার কী প্রতিক্রিয়া ছিল তা অনেক কিছুই জাতি বিস্মিত হয়ে গেছে মনে করা হলেও গভীর পর্যবেক্ষণে এগুলির স্বরূপ বুঝে নিতে তেমন বেগ পেতে হবে না। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ভিশন-২০২১ থেকে ভিশন-২০৪১ পর্যন্ত কথামালার উপহার দিচ্ছেন, পাশাপাশি অন্য পক্ষও ভিশন-২০৩০ সাল পর্যন্ত কথামালা উপহার দিচ্ছেন- এই তারাই অতীত বর্তমান শাসকগোষ্ঠি হিসেবে চিহ্নিত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জাতি সোচ্চার হলেও এ বিচার নিয়ে বিব্রত হওয়ার পরিস্থিতিতে বিব্রত নয় দ্বিধাহীন চিত্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য সুউচ্চ আন্তর্জাতিক নীতিমালায় দায়িত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে, যা সমকালীন বিশ্বে একটি নজিরবিহীন উদাহরণ। এখন তার ঘোষিত একটি রায়কে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন অস্থিরতার জন্ম দেয়া হয়েছে তাতে দেশ জাতির জন্য একটা ভয়াবহ বিপদের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তা হলে কি আমাদের বুঝে নিতে হবে যে ’৭২ এর সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ‘রাষ্ট্রধর্ম’ যা আইনের প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসতে পারে। এখন জাতির অগ্রগতিতে ভিশন-২০২১ কিংবা ভিশন-২০৩০ নয় ভিশন-‘৭১’কে পুনর্জাগরিত করে একটা বিকল্প শক্তির উত্থান কাম্য হয়ে উঠতে পারে। লেখক : সিপিবি সদস্য, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..